গাজী রহমান বলিলেন, “যদি জয়নাল আবেদীনের প্রতি কোনরূপ অত্যাচার না হয় এবং তাহার প্রাণের প্রতিভূ মহারাজ এজিদ্ হউন, তবে আমরা আজকার মত কেন-যত দিন যুদ্ধ ক্ষান্ত রাখিতে ইচ্ছা করেন-সম্মত আছি। বিনা যুদ্ধে, কী দৈববিপাকে, কী অপ্রস্তুতজনিত, কী অপারগতা হেতু, পরাভব স্বীকার করিলে আমরা তাহাতে জয় মনে করি না। যে সময় তোমাদের তরবারির তেজ কম হইবে, সমর-প্রাঙ্গণ হইতে প্রাণভয়ে পলাইতে থাকিবে, শৃগাল-কুক্কুরের ন্যায় তাড়াইতে থাকিব, কোথায় নিশান, কোথায় ব্যূহ, কোথায় কে, কে স্বপক্ষ, কে বিপক্ষ জ্ঞান থাকিবে না, রক্তস্রোতে রঞ্জিত দেহ সকল ভাসিয়া যাইবে, কোন স্থানে তোমাদের সৈন্য দেহখণ্ড খণ্ডিত অশ্বদেহে শোণিত-সংযোগ জমাট বাঁধিয়া গড়াইতে থাকিবে, কোন স্থানে দ্বীপাকার ধারণ করিবে, শিরশূন্য কবন্ধ সকল রক্তের ফোয়ারা ছুটাইয়া নাচিতে নাচিতে হেলিয়া-দুলিয়া শবদেহের উপর পড়িয়া হাত-পা আছড়াইতে থাকিবে, আমরা বীরদর্পে বিজয় নিশান উড়াইয়া দামেস্ক রাজপাটে জয়নাল আবেদীনকে বসাইয়া রক্তমাখা শরীরে র িত তরবারি সকল মহারাজ জয়নাল আবেদীনের সম্মুখে রাখিয়া মহারাজাধিরাজ সম্ভাষণে নতশিরে দণ্ডায়মান হইব,-তোমাদের মধ্যে যদি কেহ জীবিত থাকে, তবে সেও আমাদের সহিত ঐ অভিষেক-ক্রিয়ায় যোগদান করিবে, নগরময় যখন অর্ধচন্দ্র আর পূর্ণ তারা চিহ্নিত পতাকা সকল উড়িতে থাকিবে, দূতবর! সেই দিন যথার্থ জয়ী হইলাম, মনে করিব। অন্য প্রকার জয়ের আশা আমাদের অন্তরে নাই। যাও দূতবর, তোমার রাজাকে গিয়া বল-আমরা যুদ্ধে ক্ষান্ত দিলাম। যেদিন তোমাদের সমর-নিশান শিবিরশিরে উড়িতে দেখিব, ভেরীর বাজনা স্বকর্ণে শুনিব, সেইদিন আমাদের তরবারির চাক্চিক্য, তীরের গতি, বর্শার চাল, অশ্বের দাপট, নিশানের ক্রীড়া সকলই দেখিতে পাইবে। আজ ক্ষান্ত দিলাম। কিন্তু পুনরায় বলিতেছি, জয়নালের প্রাণ তোমাদের রাজার প্রতিভূতে রহিল। যাও দূতবর, শিবিরে যাও। আমরা শিবিরে চলিলাম।”
উদ্ধার পর্ব ২৭ প্রবাহ
রজনী দ্বিপ্রহর। তিথির পরিভাগে বিধুর অনুদয়, কিন্তু আকাশ নক্ষত্রমালায় পরিশোভিত। মহা কোলাহলপূর্ণ সমর-প্রাঙ্গণ এক্ষণে সম্পূর্ণভাবে নিস্তব্ধ। দামেস্ক প্রান্তরে প্রাণীর অভাব নাই। কিন্তু প্রায় সকলেই নিদ্রার কোলে অচেতন। জাগে কে?-প্রহরীদল, সন্ধানী দল, আর উভয় পক্ষের মন্ত্রীদল! মন্ত্রীদল মধ্যেও কেহ কেহ আলস্যের পরিভোগে চক্ষু মুদিয়া চিন্তায় নিমগ্ন হইতেছেন, কেহ দিবাভাগে সেই অভাবনীয় ঘটনার কোন কোন অংশ ভাবিয়া উপবেশন স্থানেই গড়াইয়া পড়িয়াছেন, কেহ শয়ন-শয্যার এক পার্শ্বে পড়িয়া আধ-জাগরণে আধ-স্বপনে জেয়াদের শির শূন্য দেহ দেখিয়া চমকিয়া উঠিতেছেন। যথার্থ জাগরিত কে? এক পক্ষে মারওয়ান, অন্য পক্ষে গাজী রহমান।
মারওয়ান আপন নির্দিষ্ট বস্ত্রাবাসের বহির্দ্বারে সামান্য কাষ্ঠাসনোপরি উপবেশন করিয়া বলিতেছে, “ভাবিলাম কী? ঘটিল কী? এখনই-বা উপায় কী? রাজ্য রক্ষা, রাজজীবন রক্ষা, নিজের প্রাণরক্ষার উপায় কী? কী ভ্রম! কী ভয়ানক ভ্রম! আশা ছিল, শত্রুকে শূলে দিয়া জগতে নাম জাঁকাইব,-যুদ্ধে জয়লাভ করিব,-সেই আশাবারিধি গাজী রহমানের মস্তিষ্কতেজে ছদ্মবেশী বাহরামের বাহুবলে এবং ওমর আলীর কৌশলে একেবারে পরিশুষ্ক হইয়া গিয়াছে। এখন জীবনের আশঙ্কা, রাজ-জীবনে সন্দেহ। জয়নাল আবেদীনের বন্দিগৃহ হইতে পলায়নে আরো সর্বনাশ ঘটিল। দ্বারে দ্বারে প্রহরী, নগরে প্রবেশের দ্বারে প্রহরী, বহির্দ্বারে প্রহরী, সকল প্রহরীর চক্ষে ধুলা দিয়া আপন মুক্তি আপনিই করিল। কী আশ্চর্য কাণ্ড! এখন আর কার জন্য যুদ্ধ? আর কি কারণে হানিফার সহিত শত্রুতা? কেন প্রাণী ক্ষয়? জয়নালকে হানিফার হস্তে না দিতে পারিলে আর রক্ষা নাই। সন্ধির প্রস্তাব মুখে আনিতেও আমার আর ক্ষমতা নাই-আর তাহাতে ভুলিবে না। সন্ধির নিশানে আর পড়িবে না। শত সহস্র দূতের প্রস্তাবেও আর কর্ণপাত করিবে না। পরাজয় স্বীকারে মৃত্তিকায় তরবারি রাখিয়া দিলেও আর ছাড়িবে না। যদি জয়নালের মুক্তির কথা গোপনেই থাকে, তাহা হইলে যুদ্ধে আমাদের লাভ কি? জয়নালই যদি আমাদের হাত ছাড়া হইল, তবে হানিফা পরাজয়ে ফল কি? ফল আছে। মহারাজের প্রাণ, স্বদেশের স্বাধীনতা, সঙ্গে সঙ্গে আমার প্রাণ রক্ষা করা ভিন্ন আর কি আশা? কিন্তু ইহাতেও আমার বিশেষ সন্দেহ আছে। হোসেনপুত্র জয়নাল-সিংহশাবক সিংহ। আজই হউক, কালই হউক, দু’দিন পরেই হউক, তাহার বলবিক্রম সে প্রকাশ করিবে-নিশ্চয় করিবে। সে নব-কেশরীর নবগর্জনে দামেস্ক নগর কাঁপিবেই কাঁপিবে। আর পিতৃ-প্রতিশোধ সে কালে লইবেই লইবে।”
মারওয়ানের চিন্তার ইতি নাই। দামেস্কের এ দুর্দশা কেন ঘটিল, এও এক প্রশ্ন আছে। এজিদের দোষ, কি তাহার দোষ-সে কথারও মীমাংসা হইতেছে। সর্বোপরি প্রাণের ভয়-মহাভয়। যদি আবদুল্লাহ্ জেয়াদকে ওমর আলীর বধসাধন-ভার অর্পণ করিয়া রাজসমীপে না যাইত, তাহা হইলে এই নিশীথ সময়ে প্রান্তরে বসিয়া আর চিন্তার ভার বহন করিতে হইত না। এ কথাটা বিশেষ করিয়া আলোচনা করিতেছে।
মারওয়ান যে স্থানে বসিয়াছিলেন, সে স্থান হইতে হানিফার শিবিরে প্রজ্বলিত দীপমালা সমুজ্জ্বল নক্ষত্রমালার ন্যায় তাঁহার চক্ষে দৃষ্ট হইতেছিল। প্রদীপ্ত দীপরাশির উজ্জ্বলাভা মনঃসংযোগে দেখিতে দেখিতে তাঁহার মনে নূতন একটি কথার সঞ্চার হইল। কথাটা কিছু গুরুতর-অথচ নীচ। কিন্তু মারওয়ানের হৃদয়ে সে-কথার সঞ্চার আজ নূতন নহে। বিশেষ আসন্নকালে বিপরীত বুদ্ধিবলে মারওয়ান মনের কথা মুখে আনিলেন। গুপ্তভাবে হানিফার শিবিরে যাইয়া জয়নালের কোন সন্ধান জানিতে পারা যায় কি? যদি জয়নাল হানিফার হস্তগত হইয়া থাকে, তবে সকলই বৃথা। কোন উপায়ে, কী কোন কৌশলে, কোন সুযোগে জয়নালের কোন সন্ধান করিতে পারিলে, এখনো রক্ষার অনেক উপায় করা যায়। মদিনায় মায়মুনার আবাসে কত নিশীথ সময়ে ছদ্মবেশে যাইয়া কত গুপ্ত সন্ধান করিয়াছি, কত অসাধ্য সাধনা সহজে সাধন করিয়াছি, আর এ দামেস্কনগর আপন দেশ, নিজের অধিকার, এখানে কী কিছুই করিতে পারিব না? তবে একটি কথা,-পাত্রভেদে কিছু লঘু-গুরু আছে। আবার একেবারে নিঃসন্দেহের কথাও নহে। মোহাম্মদ হানিফা বুদ্ধিমান্। প্রধানমন্ত্রী গাজী রহমান অদ্বিতীয় রাজনীতিজ্ঞ, চিন্তাশীল ও চতুর,-তাঁহাদের নিকট মারওয়ান পরাস্ত। কি জানি কী কৌশল করিয়া শিবির রক্ষার কী উপায় করিয়াছে, হঠাৎ বিপদগ্রস্ত হইলেও হইতে পারি। অদ্বিতীয় ভালবাসার প্রাণপাখিটাই যে দেহপি র হইতে একেবারে দূর না হইতে পারে, তাহাই বা কে বলিবে? এও সন্দেহ; নতুবা দামেস্ক প্রান্তরে এই নিশীথ সময়ে একা একা ভ্রমণ করিতে মারওয়ান সন্দিহান্ নহে, দামেস্ক-রাজমন্ত্রী ভীত নহে।”
