“উপযুক্ত লোক হইলে অবশ্যই পরাভব স্বীকার করিব। সে যাহা বলিবে, বিনা বাক্যব্যয়ে শুনিব। কিন্তু মরা বাঁচা ঈশ্বরের হাত।”
“আরে মূর্খ! এখনও মরা বাঁচা ঈশ্বরের হাত? তোমার ঈশ্বর এখনও তোমাকে বাঁচাইবেন,-ভরসা আছে? ইচ্ছা করিলে কেবল মহারাজ এজিদ্ বাঁচাইলে বাঁচাইতে পারেন।”
“রে বর্বর জেয়াদ! তুই ঈশ্বরের মহিমা কি বুঝিবি-পামর?”
“তোমার হিতোপদেশ আর শুনিতে ইচ্ছা করি না। এখন গাত্রোত্থান করুন, যমদূত শিয়রে দণ্ডায়মান।”
ওমর আলী জেয়াদের কথায় কোন উত্তর করিলেন না, সেই পূর্ববৎ দণ্ডায়মান, সেই অটল-অচল।
জেয়াদ বাহরামকে পুনরায় বলিল, “আর দেখ কি? উহাকে বধ্যভূমিতে লইয়া চল।”
বাহরাম সিংহ বিক্রমে ওমর আলীকে ধরিল এবং ‘জয় মহারাজ এজিদ্’ শব্দ করিয়া একেবারে শূন্যে উঠাইয়া বলিল, “হুকুম হয়ত এই স্থানে ইহার বধ-ক্রিয়া সমাধা করিয়া দেই। এক আছাড়েই অস্থি চূর্ণ করিয়া মজ্জা বাহির করি।”
বাহরামের বাহুবল দেখিয়া মারওয়ান জেয়াদ শত মুখে প্রশংসা করিতে লাগিল। মারওয়ান উচ্চৈঃস্বরে বলিতে লাগিল, “বাহরাম! ওমর আলীকে মারিয়া ফেলিও না। রাজাজ্ঞা তাহা নহে। শূলে চড়াইয়া মারিতে হইবে। শিবিরের মধ্যে প্রাণ বধের ইচ্ছা থাকিলে অনেক উপায় ছিল। শূলদণ্ড পর্যন্ত ইহাকে শূন্যভাবে লইয়া যাইতে হইবে।”
“যো হুকুম” বলিয়া বাহরাম এজিদের জয় ঘোষণা করিতে করিতে ওমর আলীকে তৃণবৎ লইয়া চলিল। মারওয়ান ও জেয়াদ হাসিতে হাসিতে আর আর সঙ্গীসহ চলিল। কি ভয়ানক! সকলের চক্ষেই ভীম-দর্শন। শূলদণ্ডের চতুষ্পার্শ্বে চক্রাকারে সৈন্যশ্রেণী দণ্ডায়মান। দর্শকগণের চক্ষু,-শূলের অগ্রভাগে। কাহারো মুখে কথা নাই। সকলেই নীরব। প্রান্তর নীরব।
বাহরাম ওমর আলীকে শূলদণ্ডের নিকট লইয়া ছাড়িয়া দিলেন, জেয়াদ ও মারওয়ান পুনঃ পুনঃ বাহরামের প্রশংসাবাদ করিতে লাগিল, অবশেষে বলিল, “বীরবর বাহরাম! তুমি ওমর আলীকে শূলদণ্ডে চড়াইয়া রাজাজ্ঞা প্রতিপালন কর।”
জেয়াদ মারওয়ানকে বলিল, “আমার ইচ্ছা, যে পর্যন্ত যুদ্ধ শেষ না হয়, সে পর্যন্ত ওমর আলী শূলদণ্ডেই বিদ্ধ থাক্!”
মারওয়ান বলিল, এ “কথাটা বড় গুরুতর! মহারাজের অভিপ্রায় জানা আবশ্যক। শত্রুর মনে কষ্ট দিতে, তোমার এ যুক্তি সর্বপ্রধান বটে-কিন্তু রাজাজ্ঞা তাহা নহে। আমার মতে মৃত দেহে শত্রুতা নাই, কিন্তু হানিফার বিশেষ মনোকষ্টের কারণ হইবে তাহাতেও সন্দেহ নাই। শত্রুকে জব্দ করাই তো কথা। তোমার মত প্রকাশ করিয়া মহারাজের নিকট হইতে ইহার মীমাংসা করিয়া আসিতেছি। তুমি এদিকের কার্য শেষ কর। আমার প্রতি যে ভার অর্পিত হইয়াছিল, আমি সে ভার তোমাকে অর্পণ করিলাম। তুমি ওমর আলীকে মহারাজের আজ্ঞামত বধ কর। আমি মহারাজের নিকট হইতে ঐ কথার মীমাংসা করিয়া এখনি আসিতেছি।”
জেয়াদ বাহরামকে বলিল, “বাহরাম! বন্দিকে জিজ্ঞাসা কর, এখন তার আর কথা কি? এখনও মহারাজ এজিদ্ দয়া করিলে করিতে পারেন।”
বাহরাম জিজ্ঞাসা করিল, “ওমর আলী! তোমার অন্তিমকাল উপস্থিত! কোন কথা বলিবার থাকে বল,-আর বিলম্ব নাই।”
ওমর আলী বলিলেন, “এতক্ষণ অনেকবার বলিয়াছি, আর কোন কথা নাই। তবে ইচ্ছা যে, যাইবার সময় একবার ঈশ্বরের উপাসনা করিয়া যাই। কিন্তু আমার হস্ত পদ যে কঠিন বন্ধনে বাঁধা আছে, ইহাতে সম্পূর্ণরূপে উপাসনার ব্যাঘাত হইতেছে। যদি তোমাদের সাহস হয়, তবে আমার হস্তের বন্ধন খুলিয়া দাও। আমি অন্তিম সময়ে একবার পরম কারুণিক পরমেশ্বরের যথার্থ নাম উচ্চারণ করিয়া আমার জাতীয় উপাসনায় অন্তরকে পরিতৃপ্ত করি।”
জেয়াদ বলিল, “ওমর! আমি তোমার হস্তের বন্ধন খুলিয়া দিতেছি। তুমি স্বচ্ছন্দে তোমার ইষ্ট-দেবতার নাম কর, তোমার ঈশ্বরকে যথাবিধি পূজা কর, মৃত্যুকালে ঈশ্বরের নাম করিতে আমি কখনোই বাধা দিব না। ঈশ্বর তোমাকে যে এখনও রক্ষা করিতে পারেন এ ভ্রমও পরীক্ষা কর। আমি তোমাকে তোমার ইষ্ট-দেবতার শপথ দিয়া বলিতেছি তোমার উদ্ধারের জন্য কায়মনে তোমার নিরাকার নির্বিকার দয়াল প্রভুর নিকট আরাধনা কর।” এই বলিয়া জেয়াদ স্বহস্তে ওমর আলীর বন্ধন মোচন করিয়া দিল!
ওমর আলী, মৃত্তিকা দ্বারা (জলাভাবে মৃত্তিকাদ্বারাও শরীর পবিত্র করিবার বিধি আছে, তাহার নাম “তয়ন্মুখ।”) “আজু” ক্রিয়া সমাপন করিয়া যথারীতি ঈশ্বরের উপাসনা করিলেন। উপাসনার পর দুই হস্ত তুলিয়া মহাপ্রভুর গুণানুবাদ করিতে করিতে শূলদণ্ডের চতুর্দিকে চাহিয়া দেখিলেন এবং বীরত্বের সহিত ঈশ্বরের নাম উচ্চারণ করিয়া দণ্ডায়মান হইলেন। ওমর আলীর সঙ্গে সঙ্গে বাহরাম বলিয়া উঠিলেন, “জেয়াদ! বিশ্বাসঘাতকতার ফল গ্রহণ কর। মোসলেমের প্রতিশোধ গ্রহণ কর! ওমর আলীকে উদ্ধার করিতে আসিয়া তোমাকে সুযোগমতে পাইয়াছি-ছাড়িব না।” এই বলিয়া সজোর আঘাতে জেয়াদ-শির দেহবিচ্ছিন্ন হইলে, শিরসংযুক্ত কেশগুচ্ছ ধরিয়া, শিরহস্তে বাহরাম বলিতে লাগিলেন, “রে বিধর্মী এজিদ্! দেখ, কি কৌশলে বাহরাম ওমর আলীকে লইয়া চলিল। কেবল ওমর আলীকে উদ্ধার করিবার জন্যই বাহরাম ছদ্মবেশে তোমার প্রিয় সেনাপতি জেয়াদের আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিল। আমি মোহাম্মদ হানিফার দাস। যুদ্ধ সময়ে আগন্তুক সৈন্য গ্রহণ করার এই প্রতিফল! সৈন্য বৃদ্ধি লালসায় ভবিষ্যৎ চিন্তা ভুলিয়া যাওয়ার এই ফল। দেখ্-এই দেখ্ আজ কি ঘটিল। আগন্তুক সেনায় বিশ্বাস নাই বলিয়া তোমার মন্ত্রীপ্রবর শূলদণ্ডের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় চক্রে নূতন সেনা সন্নিবেশিত করিয়াছেন। ইহারা বাহির চক্রে থাকিলে কি জানি কি বিপদ ঘটায় তাঁহার এই দুশ্চিন্তায় ঈশ্বর আমাদেরই মঙ্গল করিয়াছেন। এখন দেখ্! বাহরাম জেয়াদের শির লইয়া বীরত্ব প্রকাশে ওমর আলীকে সঙ্গে লইয়া চলিল।”
