ওমর আলী জেয়াদের কটিবন্ধ হইতে তরবারি সজোরে টানিয়া লইয়া বলিতে লাগিলেন, “মোহাম্মদীয় ভ্রাতাগণ! আর কেন? প্রভুর নাম ঘোষণা করিয়া ঈশ্বরের গুণগান করিতে করিতে শিবিরে চল। ওমর আলী সহজেই উদ্ধার হইলেন। আর আত্মগোপনে প্রয়োজন কি?” প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় চক্রের সেনাগণ সমস্বরে, “আল্লাহ আকবর, জয় মোহাম্মদ হানিফা! জয় মোহাম্মদ হানিফা!” বলিয়া ফিরিয়া দাঁড়াইল। দেখিতে দেখিতে চতুর্থ এবং পঞ্চম চক্র ভেদ করিয়া ষষ্ঠ চক্রে গিয়া পড়িল। ঘোর সংগ্রাম-অবিশ্রান্ত অসি চলিতে লাগিল। এজিদের বিশ্বাসী সৈন্যগণ, যাহারা ষষ্ঠ এবং সপ্তম চক্রে ছিল, হঠাৎ স্বপক্ষীয় সৈন্যদিগের বিদ্রোহিতা দেখিয়া মহা ভীত হইল! বাহিরের শত্রু ওমর আলীকে না লইতে পারে, ইহাই তাহাদের মনের ধারণা, তাহাতেই মনঃসংযোগ ও সতর্কতা। হঠাৎ বিপরীত ভাব দেখিয়া কিছুই স্থির করিতে পারিল না। কোথা হইতে কি ঘটিল, কি কারণে সৈন্যগণ বিদ্রোহী হইল, কিছুই সন্ধান করিতে পারিল না। জেয়াদের খণ্ডিত শির অপরিচিত সৈন্যহস্তে দেখিয়া মহারাজ এজিদ্ বাঁচিয়া আছেন কি না, ইহাই সমধিক শঙ্কার কারণ হইল। চক্র টিকিল না, মুহূর্তমধ্যে চক্র ভগ্ন করিয়া ওমর আলী এবং বাহরাম সঙ্গিগণসহ বাহিরে আসিলেন। যাহারা সম্মুখে পড়িল তাহারাই রক্তমাখা হইয়া মৃত্তিকাশায়ী হইল।
আশা ছিল কি?-ঘটিল কি? কোথায় ওমর আলীর শূলবিদ্ধ শরীর সকলের চক্ষে পড়িবে,-না জেয়াদের খণ্ডিত দেহ দেখিতে হইল। মারওয়ানের দুঃখের সীমা নাই। ওদিকে হানিফা শিবিরে শত সহস্র বিজয় নিশান উড়িতেছে, সন্তোষসূচক বাজনায় দামেস্ক প্রান্তর কাঁপাইয়া তুলিতেছে। এজিদ্ এ সংবাদে ক্ষিপ্ত প্রায় হইয়া বধ্যভূমিতে আগমন করিল এবং বলিতে লাগিল “হায় হায়! কার বধ কে করিল? যাহা হউক হানিফার উচ্চ চিন্তার বলে ওমর আলী কৌশল করিয়া প্রাণ বাঁচাইল। আমাদেরও শিক্ষা হইল। সমরক্ষেত্রে আগন্তুক সৈন্যকে বিশ্বাস করিয়া সৈন্যশ্রেণীতে গ্রহণ করার ফল, প্রত্যক্ষ প্রমাণসহ স্পষ্টভাবে দেখাইয়া দিল। আমাদের অজ্ঞতা, অদূর শিক্ষার কার্যফল, হাতে হাতে প্রাপ্ত হইতে লাগিল। আমার ইহাতে দুঃখ নাই। কিন্তু জেয়াদের শিরশূন্য দেহ দেখিয়া কিছুতেই স্থির থাকিতে পারিতেছি না। জেয়াদের শির আজ হানিফার শিবিরে যাইবে, একথা কাহার মনে ছিল?-কে ভাবিয়াছিল?-কিন্তু চিন্তা কি? এখনই প্রতিশোধ, এখনই ইহার প্রতিশোধ লইব। এ শূলদণ্ড যে ভাবে আছে, সেই ভাবেই রাখিব। ভবিষ্যৎ বিপদ গণনা করিয়া আর বিরত হইব না। আর কাহারো কথা শুনিব না। যাও-এখনই দামেস্কে যাও। জয়নাল আবেদীনকে বাঁধিয়া আন। ঐ শূলদণ্ডে তাহাকে চড়াইয়া প্রিয় বন্ধু জেয়াদের শোক নিবারণ করিব,-মনের দুঃখ নিবারণ করিব। জয়নাল বধে শত শত বাধা দিলেও এজিদ্ আজ ক্ষান্ত হইবে না। শূলে চড়াইয়া শত্রুবধ করিতে পারি কি না হানিফাকে দেখাইতে এজিদ্ কখনোই ভুলিবে না! বন্দিকে ধরিয়া আনিয়া শূলে চড়াইব, ইহাতে আর আশঙ্কা কি? শঙ্কা থাকিলেও আজ এজিদ্ কিছুতেই সঙ্কুচিত হইবে না। এখনই যাও। মারওয়ান এখনই যাও, জয়নালকে করিয়া আন-এজিদ্ এই বধ্যভূমিতেই রহিল। ভেরীর বাজনার সহিত, ডঙ্কার ধ্বনির সহিত, নগরে, প্রান্তরে, সমরক্ষেত্রে, হানিফার শিবিরের নিকটে ঘোষণা করিয়া দাও যে, ওমর আলীর জন্য যে শূলদণ্ড স্থাপন করা হইয়াছিল, সেই শূলদণ্ডে জয়নালকে চড়াইয়া জেয়াদের প্রতিশোধ লওয়া যাইবে।”
মারওয়ান আর দ্বিরুক্তি করিল না। রাজাদেশ মত ঘোষণা প্রচারের আজ্ঞা করিয়া সপ্তবিংশতি অশ্বারোহী সৈন্যসহ অশ্বরোহণে তখনই নগরাভিমুখে ছুটিল।
উদ্ধার পর্ব ২৬ প্রবাহ
এক দুঃখের কথা শেষ না-হইতেই আর একটি কথা শুনিতে হইল। জয়নাল আবেদীনকে অদ্যই শূলে চড়াইয়া জেয়াদের প্রতিশোধ লইব, এজিদের এই প্রতিজ্ঞা।
জয়নাল বন্দিগৃহে নাই, একথা এজিদ্পক্ষীয় একটি প্রাণীও অবগত নহে। মারওয়ান কারাগারের বহির্দ্বারে উপস্থিত হইয়া প্রহরীকে অনুমতি করিল, “তোমরা কয়েকজন জয়নালকে ধরিয়া আন! সাবধান, আর কাহাকেও কিছু বলিয়ো না।”
মন্ত্রীবরের আজ্ঞায় প্রহরিগণ কারাগারমধ্যে প্রবেশ করিল। ক্ষণকাল পরে ফিরিয়া আসিয়া বলিল, “জয়নাল আবেদীন এ গৃহে নাই।”
মারওয়ানের মস্তক ঘুরিয়া গেল, অশ্বপৃষ্ঠে আর থাকিতে পারিল না। উদ্বিগ্নচিত্তে স্বয়ং অনুসন্ধান করিতে চলিল, কারাগৃহের প্রত্যেক কক্ষ তন্নতন্ন করিয়া দেখিল, কোন সন্ধান পাইল না। হোসেন-পরিজনের চিত্তবিকার এবং হাব-ভাব দেখিয়া নিশ্চয় বুঝিল, জয়নাল বিষয়ে ইঁহারাও অজ্ঞাত। বিলম্ব না করিয়া নগরমধ্যে অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হইল।
ওদিকে মোহাম্মদ হানিফা এক বিপদ হইতে উত্তীর্ণ হইয়া দ্বিতীয় বিপদ সম্মুখে করিয়া বসিলেন। তিনি বলিতে লাগিলেন,-“যাহার জন্য মহাসংগ্রাম, যাহার উদ্ধার জন্য মদিনা হইতে দামেস্ক পর্যন্ত স্থানে স্থানে শোণিতপ্রবাহ, শত শত বীরবরের আত্মবিসর্জন, মদিনার সিংহাসন শূন্য,-হায়! হায়! সেই জয়নালের প্রাণবধ! ইহা অপেক্ষা দুঃখের কথা আর কী আছে? ওমর আলীকে ঈশ্বর রক্ষা করিয়াছেন, সেই ক্রোধে এজিদ্ জয়নালকে শূলে চড়াইয়া সংহার করিবে। হায়! হায়! যাহার উদ্ধার জন্য এতদূর আসিলাম, যাহার উদ্ধার জন্য এত আত্মীয়-বন্ধু হারাইলাম,-হায়! হায়! আজ স্বচক্ষে তাহার বধক্রিয়া দেখিতে হইল! কোন্ পথে কোন্ কৌশলে আনিয়া শূলে চড়াইবে, তাহার সন্ধান কী প্রকারে করি-উদ্ধারের উপায়ই-বা করি কি প্রকারে? সন্ধান করিয়া কোন ফল দেখি না। সামান্য সুযোগ পাইলে যে নিজের উদ্ধার নিজে করিতে পারিবে, সে ক্ষমতা কি তাহার মস্তকে আছে?”
