মারওয়ান মহাক্রোধে ওমর আলীকে পশ্চাদ্দিক হইতে সজোরে ধাক্কা দিয়া বলিল, “চল, তোকে পায় হাঁটাইয়া লইয়া শূলে চড়াইব।”
ওমর আলী নীরব। মারওয়ান অনেক চেষ্টা করিল, তিল-পরিমাণ স্থানও ওমর আলীকে সরাইতে পারিল না। লজ্জিত হইয়া বলিল, “সকলে একত্রে একযোগে ধরিয়া তোকে শূন্যে শূন্যে লইয়া যাইব।”
ওমর আলী হাস্য করিয়া বলিল, “মারওয়ান তুমি তো পারিলে না। সকলে একত্র হইয়া আমাকে শূলদণ্ডের নিকট লইয়া যাইবে, ইহাতে তোমার গৌরব কি? তুমি সুখী হও কোন্ মুখে?”
“আমি সুখী হই বা না হই, তোকে শূলে চড়াই?”
“এখান হইতে লইয়া যাইতে পারিলে তো শূল?”
মারওয়ান প্রহরিগণকে বলিল, “তোমরা অস্ত্রশস্ত্র রাখিয়া সকলে ইহাকে ধর, শূন্যে শূন্যে লইয়া আমার সঙ্গে আইস।”
প্রহরিগণ প্রভু-আজ্ঞা পালন করিল বটে, কিন্তু ওমর আলী সেই পাষাণ, সেই পাষাণময়-অচল। তিনি যে পদ যেখানে রাখিয়াছিলেন, সে পদ সেই খানেই রহিয়া গেল। প্রহরিগণ লজ্জিত-মারওয়ান রোষে অধীর।
মারওয়ান পুনরায় বলিতে লাগিল, “মহা বিপদ! এখান হইতে বধ্যভূমি পর্যন্ত লইতেই এত কষ্ট, শূলের উপর চড়ান তো সহজ কথা নহে।”
ওমর আলী বলিলেন, “মারওয়ান! চিন্তা কি? তুমি যদি আমাকে বধ্যভূমি পর্যন্ত লইয়া যাইতে পার, তাহা হইলে আমি ইচ্ছা করিয়া শূলে চড়িব। তুমি চিন্তা করিও না। যতক্ষণ থাকি, জগতে হাসি তামাসা করিয়া চলিয়া যাই। মরণ কাহার না আছে? আজ আমার এই প্রকার মরণ হইতেছে; কাল না হউক, কালে তোমাকেও অন্য প্রকারে মরিতে হইবে।”
মারওয়ান মনে মনে বলিতে লাগিল, “এখান হইতে ধরাধরি করিয়া লইয়া গেলেও তো শূলে চড়ান মহাবিপদ দেখিতেছি। আবদুল্লাহ্ জেয়াদকে ডাকি।” এই স্থির করিয়া প্রকাশ্যভাবে বলিল, “আবদুল্লাহ্ জেয়াদকে ডাকিয়া আন, আর তাহার অধীনে কয়েকজন বলবান্ সৈন্য গতকল্য সৈন্যদলে নাম লিখাইয়াছে, তাহাদিগকেও এখানে আসিতে বল।”
ওমর আলী বলিলেন, “ওহে মন্ত্রী! কোন্ আবদুল্লাহ্ জেয়াদ? কুফানগরের জেয়াদ?-সেই নিমকহারাম জেয়াদ? বিশ্বাসঘাতক জেয়াদ? না অন্য কেহ?”
“তাহাতে তোমার প্রয়োজন কি?”
“প্রয়োজন কিছুই নাই-তবে পাপাত্মার মুখখানা চক্ষে দেখিবার ইচ্ছা অনেক দিন হইতে আছে। শীঘ্র আসিতে বল, মরণকালে দেখিয়া যাই।”
“তোমার অন্তিমকাল উপস্থিত-এ সময়েও তোমার হাসি তামাসা-এ সময়েও আমাদিগকে ঘৃণা!”
“আমি তো আর তোমার মত মূর্খ নহি যে, কারণ, কার্য ও যুক্তি অবহেলা করিয়া কেবল ঈশ্বরের প্রতি চাহিয়া থাকিব? তুমি মনে করিয়াছ যে আমরা তোমার প্রাণবধ করিতে পারিব না,-আমাদের হস্তে মরিবে না। ওমর! অঙ্গারও যদি হরিদ্রার কান্তি পায়, মশকও যদি সমুদ্র শুষিয়া ফেলে, অচল যদি সচলভাব ধারণ করে, সূর্যদেবও যদি পশ্চিমে উদিত হয়, তথাচ তোমার জীবন কখনোই রক্ষা হইতে পারে না। মারওয়ানের হস্ত হইতে বাঁচিয়া প্রাণ বাঁচাইতে পারিবে না। মুহূর্ত পরেই তোমার চক্ষের পাতা ইহকালের জন্য বন্ধ হইবে। শূলদণ্ড তোমার মস্তক ভেদ করিয়া বহির্গত হইবে। এখনও বাঁচিবার আশা-জেয়াদকে দেখিবার আশা?”
“অত বক্তৃতা করিও না, অত অদৃষ্ট দিয়াও আমাকে বুঝাইও না। ঈশ্বরের মহিমার পার নাই। তিনি হজরত ইব্রাহিমকে অগ্নি হইতে, ইউসুফকে কূপ হইতে, নুহ্কে তুফান হইতে রক্ষা করিয়াছিলেন! কত জনকে কত বিপদ, কত কষ্ট, কত দুঃখ হইতে উদ্ধার করিয়াছেন, করিতেছেন এবং করিবেন। আর আমাকে এই সামান্য বন্ধন হইতে এজিদের আদেশ হইতে, আর নিতান্ত আহম্মক! মন্ত্রী মারওয়ানের হস্ত হইতে উদ্ধার করা তাঁহার কতক্ষণের কার্য!”
“তোমার ঈশ্বর, যুক্তি ও কারণের নিকট পরাস্ত। আমি যদি তোমার এ বন্ধন না খুলিয়া দেই, তোমার ঈশ্বর অদৃশ্যভাবে খুলিয়া দিন্ দেখি? কারণ ব্যতীত কোন্ কালে কোন্ কার্য হইয়াছে? দৈব কথা দৈবশক্তি ছাড়িয়া দাও,-না হয় তোমার বস্ত্রাঞ্চলে বাঁধিয়া রাখ, ও কথায় মারওয়ানের মন টলিবে না।”
“মন টলিবে না বটে, টলিতে পারে।”
“পূর্বেই বলিয়াছি-মারওয়ান তোমার মত পাগল নহে।”
এদিকে বীরবর আবদুল্লাহ্ জেয়াদ কয়েকজন সজ্জিত সৈন্যসহ মারওয়ানের নিকট উপস্থিত হইয়া উপস্থিত ঘটনা দেখিল-শুনিয়া আরো চমৎকৃত হইল। ক্ষণকাল পরে জেয়াদ গম্ভীর স্বরে বলিল, “আমি ওমর আলীকে বধ্যভূমিতে লইতেছি। কি আশ্চর্য, ওমর আলীকে মৃত্তিকা হইতে শূন্যে উত্তোলন করা যায় না, এ কি কথা! অস্ত্রের সাহায্যে সকলেই সকল করিতে পারে।”
জেয়াদ ওমর আলীর নিকট যাইয়া তাঁহাকে মৃত্তিকা হইতে শূন্যে তুলিতে অনেক চেষ্টা করিল,-পারিল না। লজ্জা রাখিবার আর স্থান কোথায়? বিরক্ত ভাবে বলিল, “বাহরাম! তুমি তো আপন বাহুবলের ক্ষমতা অনেক দেখাইয়াছ-উঠাও।”
মারওয়ান বলিল, “বাহরামের বাহুবল দেখিয়া আমি চমৎকৃত হইয়াছি। সত্য কথা বলিতে কি ঐ গুণেই আমি বাহরামকে সৈন্যদলে আদরে গ্রহণ করিয়াছে। এখন পদোন্নতি-পুরস্কার সকলই যদি ওমর আলীকে-”
বাহরাম মারওয়ান এবং জেয়াদকে অভিবাদন করিয়া বলিল, “গোলাম এখনই হুকুম তামিল করিতেছে।”
ওমর আলী আড়নয়নে বাহরামকে দেখিয়া বলিলেন, “জেয়াদ! কত জনকে ঠকাইতে চাও? স্বপ্ন-বিবরণে প্রভু হোসেনকে ঠকাইয়াছ, মদিনার বিখ্যাত বীর মোসলেমকে ঠকাইয়াছ, আজ আবার কাহাকে ঠকাইবে?”
জেয়াদ বলিল, “তোমার অস্ত্রের ধার বদ্ধ হইয়াছে, কিন্তু কথার ধারটুকু এখনও আছে। এখনই সে ধার বদ্ধ হইবে! উপযুক্ত লোক আনিয়াছি।”
