মারওয়ান বিশেষ চিন্তা করিয়া আদেশ করিল, “বধ্যভূমি পর্যন্ত যাইবার সুপ্রশস্ত পথ মধ্যে রাখিয়া উভয়পার্শ্বে সৈন্যশ্রেণী দণ্ডায়মান করা হইবে। প্রহরী এবং প্রধান প্রধান সৈন্যাধ্যক্ষ ব্যতীত সামান্য সৈন্য কি কোন প্রাণী আমার বিনানুমতিতে এ পথে বধ্যভূমিতে যাইতে পারিবে না।”
আদেশ মাত্র নিষ্কোষিত অসি হস্তে সৈন্যগণ গায় গায় মিশিয়া বধ্যভূমি পর্যন্ত গমনোপযোগী প্রশস্ত স্থান রাখিয়া দুই শ্রেণীতে পরস্পর সম্মুখে দণ্ডায়মান হইল। তখন শিবির-দ্বার হইতে শূলদণ্ডের অগ্রভাগ স্পষ্টভাবে দেখা যাইতে লাগিল। মারওয়ান পুনরায় আজ্ঞা করিল, “শূলদণ্ডের চতুষ্পার্শ্বে চক্রাকার কতক স্থান রাখিয়া শূলদণ্ডসহ ঐ চক্রাকার স্থান সজ্জিত সৈন্য দ্বারা পরিবেষ্টিত হইবে। একশ্রেণীতে চক্রাকারে ঐ স্থান বেষ্টন করিলে শঙ্কা দূর হইবে না। সপ্তচক্র সৈন্য দ্বারা ঐ স্থান বেষ্টন করিতে হইবে। চতুর্দিকে প্রহরী নিযুক্ত থাকিবে! বিপক্ষদল হইতে সামান্য একটি প্রাণীও আমাদের নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করিয়া না আসিতে পারে-সে বিষয়ে বিশেষ লক্ষ্য রাখিতে হইবে। আবার এদিকেও শিবিরদ্বার চতুষ্টয়ে এবং সীমান্ত স্থানে রক্ষীদিগের উপরেও সজ্জিত সৈন্য দ্বারা বিশেষ সতর্কে শিবির রক্ষা করিতে হইবে।”
মারওয়ান সৈন্যাধ্যক্ষগণকে আহ্বান করিয়া আরো আজ্ঞা করিল “যে সকল সৈন্য বিশেষ শিক্ষিত ও পুরাতন, তাহাদের দ্বারা শিবির এবং শিবিরদ্বার চতুষ্টয় রক্ষা করিতে হইবে। উত্তর, পূর্ব ও দক্ষিণ সীমার প্রত্যেক সীমায় সহস্র সহস্র সৈন্য তীর, বর্শা ও তরবারিহস্তে রক্ষীরূপে দণ্ডায়মান থাকিবে। শিবিরের মধ্যে যেখানে যেখানে প্রহরী নিযুক্ত আছে, সেই সেই স্থানে দ্বিগুণিত প্রহরী ও সম্ভব মত সৈন্য নিয়োজিত করিয়া শিবির রক্ষা করিতে হইবে। সৈন্যাধ্যক্ষগণ আপন আপন সৈন্যদলের প্রতি বিশেষ সতর্কিতভাবে দৃষ্টি রাখিবেন।”
“ওমর আলীর বধসাধন হইতে কল্য প্রভাত পর্যন্ত সাধ্যাতীত সতর্কতার সহিত থাকিতে হইবে। সৈন্যাধ্যক্ষগণ অশ্বারোহী হইয়া মুহূর্তে মুহূর্তে শিবিরের চতুষ্পার্শ পরিবেষ্টন করিবেন। ওমর আলীর বধসাধনে হর্ষ, বিপদ, বিষাদ সকলই রহিয়াছে, সকল দিকেই দৃষ্টি রাখিতে হইবে। সাবধান, আমার এই আজ্ঞার অণুমাত্রও যেন অন্যথা না হয়। যে সকল সৈন্য নূতন গ্রহণ করা হইয়াছে, তাহাদিগকে কখনোই শিবির রক্ষার কার্যে, কি সীমা রক্ষার কার্য, কি প্রহরীর কার্যে, কোনরূপ কার্যে নিযুক্ত করা হইবে না। এমন কি আমার দ্বিতীয় আদেশ পর্যন্ত তাহারা শিবির মধ্যে প্রবেশ করিতে পারিবে না। প্রকাশ্যভাবে তাহাদিগকে এ সকল কথা না বলিয়া বাহিরের অন্য কোন কার্যে, কি শূলদণ্ড যে প্রণালীতে রক্ষা করার আদেশ হইয়াছে, তাহাতেই নিযুক্ত করিতে হইবে। কিন্তু সে সপ্তচক্রের সীমাচক্রে, কি ষষ্ঠ বা পঞ্চম চক্রে তাহাদিগকে নিযুক্ত করা হইবে না। প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় চক্রেই তাহাদের স্থান,-শূলদণ্ডের নিকট হইতে উপরোক্ত চক্রত্রয় ভিন্ন অন্য কোন চক্রে তাহারা না যাইতে পারে-সে বিষয়ে বিশেষ সাবধান হইতে হইবে।”
মারওয়ান এই সকল আদেশ করিয়া, বন্দিসহ বধ্যভূমিতে যাইতে উদ্যত হইল। বন্দি ওমর আলী চতুর্দিকে চাহিয়া বধ্যভূমিতে যাইতে অসম্মত হইলেন।
মারওয়ান বলিল, “ওমর আলী! তুমি জানিয়া শুনিয়া কেন বিহ্বল হইতেছ? বন্দিভাবে রাজ আজ্ঞা অবহেলা! তুমি স্বেচ্ছাপূর্বক বধ্যভূমিতে না গেলে আমি কি তোমাকে শূলে চড়াইয়া মারিতে পারিব না? তুমি এখনও যদি মহারাজ এজিদের বশ্যতা স্বীকার কর, প্রভু বলিয়া মান্য কর, অপরাধ মার্জনাহেতু যোড়করে ক্ষমা প্রার্থনা কর, তবে এখনও তোমার প্রাণ রক্ষা হইতে পারে। আমি মহারাজের রোষাগ্মি করিতে করিতে চেষ্টা করিব। বধ্যভূমিতে যাইব না,-এ কি কথা? সাধ্য কি যে তুমি না যাইয়া পার? তোমাকে নিশ্চয়ই ঐ শূলদণ্ডের নিকট যাইতে হইবে,-নিশ্চয়ই ঐ শূলে আরোহণ করিতে হইবে,-বিদ্ধ হইতে হইবে,-মরিতে হইবে। মহারাজ এজিদের আজ্ঞা অলঙ্ঘনীয়।”
ওমর আলী বলিলেন, “তুমি যদি আমাকে লইয়া যাইতে পার, লইয়া যাও-শূলে দাও। কিন্তু আমি ইচ্ছাপূর্বক শূলদণ্ডের নিকট যাইব না,-শূলে আরোহণ করা তো শেষের কথা। আমার প্রাণবধ করাই তো তোমাদের ইচ্ছা; তরবারি আছে আঘাত কর,-তীর আছে, বক্ষ’পরি লক্ষ্য কর,-বর্শা আছে, বিদ্ধ কর,-গদা আছে, মস্তক চূর্ণ কর,-ফাঁস আছে, গলায় দিয়া শ্বাস বন্ধ কর, যে প্রকারে ইচ্ছা হয় প্রাণ বাহির কর। আমি শূলে চড়িব না।”
“আমি তোমাকে শূলে চড়াইব। মহারাজ এজিদের আজ্ঞা প্রতিপালন করিব। তুমি তোমার প্রাণ বাহির করিবার দশটি উপায় বাহির করিলেও তাহা গ্রাহ্য হইবে না। ঐ একমাত্র শূলদণ্ডেই তোমার জীবন শেষ-কেন আমাকে বিরক্ত কর?”
“তোমার ক্ষমতা থাকে, আমাকে লইয়া যাও।”
“কেন? শূলে চড়িয়া প্রাণ দিতে কি লজ্জা বোধ হয়? হায় রে লজ্জা! এমন অমূল্য জীবনই যদি গেল তবে সে লজ্জায় ফল কি?”
“আমি তোমার কথা শুনিতে ইচ্ছা করি না। তোমার কার্য তুমি কর, আমি আর এক পদও অগ্রসর হইব না।”
“মুহূর্ত পরে যাহার জীবনকাণ্ড শেষ অভিনয় হইয়া, জীবনের মত যবনিকা পত্তন হইবে, তাহার আবার আস্পর্ধা?”
“দেখ্ মারওয়ান! সাবধান হইয়া কথা বলিস্! আমার হস্ত কঠিন বন্ধনে বাঁধা আছে, নতুবা তোর মুখের শাস্তি করিতে ওমর আলীকে বেশি দূর যাইতে হইত না!”
