ওদিকে মোহাম্মদ হানিফার প্রাণ ওষ্ঠাগত, বন্ধুবান্ধব আত্মীয়স্বজনের কণ্ঠ শুষ্ক, সৈনিক দলে মহা আন্দোলন। “হায়! হায়! এমন বীর বিপাকে মারা পড়িল! ভ্রাতৃ-আজ্ঞা প্রতিপালন করিতে অকাল কালের হস্তে নিপতিত হইল! কি সর্বনাশ! এজিদের প্রতি অস্ত্র নিক্ষেপ করিও না, এই কথাতেই আজ ওমর আলী কিশোর বয়সে শত্রুহস্তে শূলে বিদ্ধ হইতে চলিল! ধন্য রে ভ্রাতৃভক্তি! ধন্য রে স্থির প্রতিজ্ঞা! ধন্য আজ্ঞা পালন! ধন্য ওমর আলী!”
সমরক্ষেত্রে প্রবেশ করিয়া সৈন্য সংগ্রহ করা বড় বিষম ব্যাপার। বিপদকালেই দূরদর্শিতার পরিচয়, ভবিষ্যৎ জ্ঞানের পরিচয়ের পরীক্ষা হয়। সুখের সময় দুশ্চিন্তা, ভবিষ্যৎ ভাবনা, প্রায় কোন মস্তকই বহন করিতে ইচ্ছা করে না।
মোহাম্মদ হানিফা শুধু আক্ষেপ করিয়া ক্ষান্ত হন নাই! গাজী রহমানও কেবল বিলাপ বাক্য শুনিয়াই নিশ্চিন্ত হন নাই। তাঁহাদের মস্তিষ্কসিন্ধু আজ বিশেষরূপে আলোড়িত হইয়াছে। সহসা এজিদ্ শিবির আক্রমণ করিবেন না অথচ ওমর আলীকে উদ্ধার করিবার আশা অন্তরের এক কোণে বিশেষ গোপনভাবে রহিয়াছে। বিনা বেতনের চাকরে গৃহকার্যের সুবিধা নাই, তাহাতে আবার যুদ্ধকাণ্ডে! অবৈতনিক সৈন্য কি ভয়ানক কথা। কি সাংঘাতিক ভ্রম! এ ভ্রম কাহার?
এজিদ্ বস্ত্রমণ্ডপে দরবার আহ্বান করিয়া, স্বর্ণময় আসনে মহাগর্বিতভাবে বসিয়াছে। রাজমুকুট শিরে শোভা পাইতেছে। মন্ত্রীপ্রবর মারওয়ান দক্ষিণপার্শ্বে দণ্ডায়মান। সৈন্যশ্রেণী দরবারসীমা ঘিরিয়া গায় গায় মিশিয়া, অসি হস্তে খাড়া হইয়াছে। পঞ্চবিংশতি রথী নিষ্কোষিত কৃপণ হস্তে ঘিরিয়া বন্ধনদশায় ওমর আলীকে দরবারে উপস্থিত করিল।
মারওয়ান ওমর আলীকে বলিল, “ওমর আলী! তুমি যে বন্দি, সে কথা তোমার জ্ঞান আছে?”
ওমর আলী বলিলেন, “এইক্ষণে তোমাদের হস্তে বন্দি-সে কথা আমার বেশ জ্ঞান আছে।”
“বন্দির এত অহঙ্কার কেন? নতশিরে যোড়করে রাজ সমীপে দণ্ডায়মান হওয়া কি তোমার এ সময়ে উচিত নহে? রাজাকে অভিবাদন করা কি এ অবস্থায় কর্তব্য নহে? মুহূর্ত পরে তোমার কি দশা ঘটিবে তাহা কি তুমি মনে কর না?”
“আমি সকলই মনে করিতেছি। তোমাদের যাহা ইচ্ছা হয় কর, অনর্থক বাক্বিতণ্ডায় প্রয়োজন নাই। আমি কোনরূপ অনুগ্রহের প্রত্যাশা করি না যে, নতশিরে ন্যূনতা স্বীকারে দরবারে খাড়া হইব!”
“সাবধান! সর্তক হইয়া জিহ্বা চালনা করিও। নম্রভাবে কথা কহা কি তোমাদের কাহারো অভ্যাস নাই? এ রাজ-দরবার-সমর-প্রাঙ্গণ নহে।”
“আমি প্রথমেই তোমাকে বলিয়াছি, বাক্বিতণ্ডার প্রয়োজন নাই। আমাকে জ্বালাতন করিও না! আমি তোমার সহিত কথা কহিতে ইচ্ছা করি না।”
এজিদ্ হাসিয়া বলিল, “আচ্ছা আমার সহিত কথা বল।”
ওমর আলী বলিলেন, “তুমিই এমন পবিত্র শরীর ভবধামে অধিষ্ঠান করিয়াছ যে, নিজের গৌরব নিজেই প্রকাশ করিতেছ। তোমার সহিত কথা বলিলে কি আমার গৌরব বৃদ্ধি হইবে?”
“গৌরব বৃদ্ধি হউক বা না হউক, অতি অল্প সময়ও যদি জগতের মুখ দেখিতে পাওয়া যায় তাহাতে ক্ষতি কি? তুমি আমার বশ্যতা স্বীকার কর, প্রভু বলিয়া মান্য কর, আমি তোমাকে প্রাণদণ্ড হইতে মুক্ত করিতেছি।”
“কি ঘৃণা! কি লজ্জা! এজিদের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা! এজিদের আশ্রয় গ্রহণ! মারিয়ার পুত্রের বশ্যতা স্বীকার! ছি ছি, তুমি আমার প্রভু হইতে ইচ্ছা কর? তোমার বংশাবলীর কথা, তোমার পিতার কথা একবার মনে কর। ছি! ছি! বড় ঘৃণার কণা! এজিদ্, এত আশা তোমার-তুমি আবার মহারাজ!”
এজিদ্ রোষে অধীর হইয়া বলিল, “তোমার গর্দান লইতে পারি, তোমাকে খণ্ড খণ্ড করিয়া শৃগাল কুকুরের উদরস্থ করিতে পারি। তুমি আমার নিকট প্রার্থনা জানাও যে, ‘মহারাজ! মহাকষ্টে যেন আমাকে বধ করা না হয়’।”
ওমর আলী ক্রোধে বলিলেন, “ধিক্ তোমার কথায়! আর শতাধিক্ আমার জীবনে! সহজে প্রাণ বধ করা হয় ইহাই আমার প্রার্থনা! তোমার যাহা করিবার ক্ষমতা থাকে কর, আমি প্রস্তুত আছি।”
“মরণের পূর্বে যে লোকে বিকারগ্রস্ত হয়, এ কথা সত্য! তোমার কপাল নিতান্ত মন্দ, আমি কি করিব?”
“তুমি আর কি করিবে? যাহা করিবে তাহার দ্বিগুণ ফল ভোগ করিবে।”
এজিদ্ সক্রোধে বলিল, “মারওয়ান, ইহার কথা আমার সহ্য হয় না! প্রকাশ্য স্থানে যাহাতে সর্বসাধারণে দেখিতে পায়, বিপক্ষগণ দেখিতে পায়, এমন স্থানে শূলে চড়াইয়া এখনই ইহার প্রাণবধ কর। কার্যশেষে আমাকে সংবাদ দিও!”
ওমর আলী বলিলেন, “কার্য শেষ করিলে তোমাকে আর সংবাদ শুনিতে হইবে না। তোমারই সংবাদ অনেকে শুনিবে।”
মহাক্রোধে এজিদ্ বলিল, “আর সহ্য হয় না। মারওয়ান! শীঘ্র ইহাকে শূলে চড়াও।” মারওয়ান নতশিরে সম্ভাষণ করিয়া বন্দিসহ দরবার হইতে বহির্গত হইল।
শিবিরের বাহিরে লোকে লোকারণ্য। নির্দিষ্ট বধ্যভূমিতে বন্দিসহ গমন করা বড়ই কঠিন। মারওয়ান শিবিরের দ্বারে দণ্ডায়মান হইয়া চিন্তা করিতে লাগিল, ‘দর্শকগণের মনে কোন প্রকার কষ্ট না হয়, রাজাজ্ঞাও প্রতিপালন হয়। আবার শত্রুপক্ষ অতি নিকট। তাহারাই বা কি কাণ্ড করিয়া বসে, তাহারই বা বিচিত্র কি? প্রকাশ্য স্থানে শূলে চড়াইয়া প্রাণবধ করিতে হইবে, এ কথাও তাহারা শুনিয়াছে। শূলদণ্ড যে দণ্ডায়মান হইয়াছে, তাহাও স্পষ্টভাবেই দেখিতেছে। ইহাতে যে তাহারা একেবারে নিশ্চিন্ত থাকিবে, নির্বাকে দণ্ডায়মান হইয়া ওমর আলীর বধক্রিয়া স্বচক্ষে দেখিবে, এ ও কখনোই বিশ্বাস হয় না। হয় তো কোন নূতন কাণ্ড করিয়া তুলিবে।’
