এইরূপ কথা হইতেছে, এমন সময় জয়নাব আসিয়া বলিলেন, “আমি গবাক্ষদ্বারে দণ্ডায়মান হইয়া দেখিলাম, নগরের বহুসংখ্যক লোক দামেস্ক প্রান্তরে যাইতেছে। সকলের মুখে এই কথা যে, আজ ওমর আলীর প্রাণবধ দেখিব, কাল মোহাম্মদ হানিফার খণ্ডিত শির দামেস্ক প্রান্তরে লুটাইতে দেখিব। জয়নাল আবেদীন কারাগার সম্মুখে দণ্ডায়মান ছিল; প্রহরিগণ কে কোথায় আছে দেখিতে পাইলাম না। জয়নাল ঐ জনতার মধ্যে মিশিয়া তাহাদের সঙ্গে চলিয়া গেল। আমি সঙ্কেতে অনেক নিষেধ করিলাম-শুনিল না। একবার ফিরিয়া তাকাইয়া ঊর্ধ্বশ্বাসে বেগে চলিয়া গেল! কেবলমাত্র একটি কথা শুনিলাম-“হায় রে অদৃষ্ট! কার্বালার ঘটনা এখানেও ঘটিতে আরম্ভ হইল। এক একটি করিয়া এজিদ্ হস্তে-‘ এই কথার পর আর কিছুই শুনিতে পাইলাম না দেখিতে দেখিতে চক্ষুর অন্তরাল হইয়া পড়িল-এ আবার কি ঘটনা ঘটিল!”
সাহরেবানু জয়নাবের মুখপানে একদৃষ্টে চাহিয়া কথাগুলি শুনিলেন। তাঁহার মুখের ভাব সে সময় যে প্রকার হইয়াছিল, তাহা কবির কল্পনার অতীত,-চিন্তার বহির্ভূত। জয়নাল আবেদীনই তাঁহাদের একমাত্র ভরসা। সাহরেবানুর প্রাণপাখী সে সময় দেহপি রে ছিল কিনা, তাহা কে বলিতে পারে? চক্ষু স্থির! কণ্ঠ রোধ! সে একপ্রকার ভাব-স্পন্দনহীন।
সালেমা বিবি বুদ্ধিমতী, সহ্যগুণও তাঁহার বিস্তর। কিন্তু সাহরেবানুর অবস্থা দেখিয়া তিনিও বিহ্বল হইলেন। নাম ধরিয়া অনেকবার ডাকিলেন। চৈতন্য নাই। বুকে মুখে হস্ত দিয়া সান্ত্বনার অনেক চেষ্টা করিলেন কিন্তু সাহরেবানুর মোহভঙ্গ হইল না, তিনি মৃত্তিকায় পড়িয়া গেলেন। অনেকক্ষণ পরে দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া বলিলেন, “জয়নাল! বাবা জয়নাল। নিরাশ্রয়া দুঃখিনীর সন্তান! কোথা গেলি বাপ? তোর পায় পায় শত্রু, পায় পাপ বিপদ, আমরা চিরবন্দি। দুঃখের ভার বহন করিতে জগতে আমাদের সৃষ্টি হইয়াছিল। তুই দুঃখিনীর সন্তান, কি কথা মনে করিয়া কোথা গেলি? তুই কি তোর পিতৃব্য ওমর আলীর প্রাণবধ দেখিতে গিয়াছিস্? তুই সেই বধ্যভূমিতে গিয়া কি করিবি? তোকে যে চিনিবে, সেই এজিদের নিকট লইয়া গিয়া তোকেও ওমর আলীর সঙ্গী করিবে। এজিদ্ এখন হানিফার প্রাণ লইতেই অগ্রসর হইয়াছে। তোকে কয়েকবার মারিতে গিয়াও কৃতকার্য হয় নাই; আজ তোকে দেখিলে তা’র ক্রোদের কি সীমা থাকিবে? বন্দি পলাইলে কা’র না রোষের ভাব দ্বিগুণ হয়? জয়নাল, তোর এ বুদ্ধি কেন হইল?”
সাহরেবানু বিস্তর দুঃখ প্রকাশ করিলেন। সালেমা বিবিও অনেক প্রকারে বুঝাইলেন। শেষে সালেমা বিবি বলিলেন, “সাহরেবানু, স্থির হও। জয়নাল অবোধ নহে। তাহার পিতার সমস্ত গুণই তাহাতে রহিয়াছে। ঈশ্বর তাহাকে বীরপুরুষ করিয়াছেন। এজিদের অত্যাচার তাহার হৃদয়ে আঁকা রহিয়াছে। সে একা কিছুই করিতে পারিবে না। আবার আমাদিগকে বন্দিখানায় রাখিয়া এমন কোনও কার্যে হঠাৎ হস্তক্ষেপ করিবে না যে তাহাতে মারা পড়ে কি ধরা পড়ে। তাহার আশা অনেক। ঈশ্বরে নির্ভর কর, এ সকল তাঁহারই লীলা। তুমি স্থির হও, ঈশ্বরের নাম করিয়া জয়নালকে আশীর্বাদ কর,-তাহার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হউক। তুমি নিশ্চয় জানিও এজিদ্ হস্তে তাহার মৃত্যু নাই। সেই মদিনার রাজা, সেই দামেস্কের রাজা। আমি মাননীয় নূরনবীমুখে শুনিয়াছি, জয়নাল আবেদীন দ্বারা মদিনার সিংহাসন রক্ষা হইবে, ইমাম বংশ জীবিত থাকিবে, রোজকেয়ামত পর্যন্ত জয়নাল আবেদীনের বংশধরগণ জগতে সকলের নিকট পূজনীয় হইয়া থাকিবে। নূরনবীর বাণী কি কখন মিথ্যা হয়? ঈশ্বরের নিকট প্রার্থনা কর, জয়নালের মনোবাঞ্ছা নির্বিঘ্নে পরিপূর্ণ হউক।”
উদ্ধার পর্ব ২৫ প্রবাহ
মানবের ভাগ্যবিমানে দুঃখময় কালমেঘ দেখা দিলে, সে দিকে কাহারো দৃষ্টি পড়ে না, ভ্রমেও কেহ ফিরিয়া দেখে না। ভাল মুখে দু’টি ভাল কথা বলিয়া তাহার তাপিত প্রাণ শীতল করা দূরে থাকুক, মুখ ফুটিয়া কথা কহিতেও ঘৃণা জন্মে, সে দিকে চক্ষু তুলিয়া চাহিতেও অপমান জ্ঞান হয়। সে উপযাচক হইয়া মিশিতে আসিলেও নানা কৌশলে তাড়াইতে ইচ্ছা করে। আত্মীয়-স্বজন, পরিজন ও জ্ঞাতি কুটুম্বের চক্ষেও দুর্ভাগার আকৃতি চক্ষুশূল বোধ হয়। একপ্রাণ, একআত্মা, হৃদয়ের বন্ধুও সে সময় সহস্র দোষ দেকাইয়া ক্রমে সরিতে থাকেন। দুঃখের সময় জীবন কাহার না ভারবোধ হয়? শনি-গ্রস্ত জীবের কোথায় না অনাদর? রাহু-গ্রস্ত বিধুর অপবাদই বা কত? ভবের ভাব বড়ই চমৎকার। কালে আবার সেই আকাশে,-সেই মানবের ভাগ্য আকাশে, মৃদু মৃদু ভাবে সুবাতাস বহিয়া কাল মেঘগুলি ক্রমে সরাইয়া সৌভাগ্য-শশীর পুনরুদয় হইলে, আর কথা নাই। কত হৃদয় হইতে প্রেম, প্রণয়, ভালবাসা, আদর, স্নেহ, যত্ন এবং মায়ার স্রোত প্রবাহ ধারা,-যাহা বল ছুটিতে থাকে, বহিতে থাকে। কত মনে দয়ার সঞ্চার, মিলনের বাসনা এবং ভক্তির উদয় হইতে থাকে। কত চক্ষু সরলে, বঙ্কিমে, দেখিতে ইচ্ছা করে। কত মুখে সুযশ সুখ্যাতি গাহিতে ইচ্ছা করে, শতমুখে সুকীর্তির গুণ বর্ণিত হইতে থাকে। আর যাচিয়া প্রেম বাড়াইতে হয় না, ডাকিয়াও কাছে বসাইতে হয় না। পরিচয় না থাকিলেও পরিচয়ের পরিচয় দিয়া, দাপিয়া চাপিয়া বসিয়া থাকে। আজ এজিদের ভাগ্য-বিমান হইতে কালমেঘ সরিয়া সৌভাগ্য-শশীর উদয় হইয়াছে-ওমর আলী বন্দি। শত শত ঘোষণা দিয়া, দ্বিগুণ বেতনের আশা দেখাইয়াও আশার অনুরূপ সৈন্যসংগ্রহ করিতে সক্ষম হয় নাই। ওমর আলী বন্দি, শূলদণ্ডে তাঁহার প্রাণবধের ঘোষণা শুনিয়া দলে দলে সৈন্যদলে নাম লিখাইতেছে; স্বার্থের আশায়, অর্থের লালসায়, কত লোক বিনা বেতনে এজিদপক্ষে মিশিতেছে। অপরিচিত বিদেশী বোধে যাহাদিগকে গ্রহণ করিতে মারওয়ানের অমত হইতেছে, তাহাদের কেহ কেহ স্ব স্ব গুণ দেখাইয়া, কেহবা, বাহুবলের পরিচয় দিয়া সৈন্যশ্রেণীতে প্রবেশ করিতেছে। কেহবা কোন সৈন্যাধ্যক্ষকে অর্থে বশীভূত করিয়া তাহার উপরোধে প্রবেশপথ পরিষ্কার করিয়া লইতেছে। সকলেই যে সমরক্ষেত্রে শত্রুর সম্মুখীন হইবে তাহা নহে। জয়ের ভাগ, যশের অংশ গ্রহণ করাই অনেকের অন্তরের নিগূঢ় আশা। আজ ওমর আলীর জীবন শেষ, কাল হানিফার পরমায়ু শেষ, যুদ্ধের শেষ-এই বিশেষ তত্ত্বেই স্বদেশী বিদেশী বহুলোকের সৈন্যদলে প্রবেশ। আবার ইহাও অনেকের মনে,-যদি বিপদ সম্ভব বিবেচনা হয়, পরাজয়ের লক্ষণ দেখা যায়, তবে ভবের ভাব, প্রকৃতির স্বভাব, সময়ের তাৎপর্য দেখাইয়া ক্রমে সরিতে থাকিব। কিন্তু জয়ের সম্ভাবনাই অধিক। ওমর আলীর প্রাণবধ-হানিফার দক্ষিণ বাহু ভগ্ম, একই কথা। একা হানিফার এক হস্তে কি করিবে? জয়ের আশাই অধিক। এজিদের ভাগ্যবিমানে সুবায়ু প্রতিঘাতে কালমেঘের অন্তর্ধান অতি নিকট। এজিদ্-শিবিরের চতুষ্পার্শ্বে বিষম জনতা-সকলের দৃষ্টিই শূলদণ্ডের সূক্ষ্ম অগ্রভাগে।
