মহাবীর ওমর আলী পুনরায় ঈশ্বরের নাম করিয়া অশ্বারোহণ করিলেন। নক্ষত্রবেগে যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হইতেই, এজিদ্-পক্ষীয় বীর সোহরাব জঙ্গ অশ্বদাপটের সহিত অসি চালনা করিতে করিতে উপস্থিত হইল। স্থিরভাবে ক্ষণকাল ওমর আলীর আপাদমস্তক দৃষ্টি করিয়া বলিল, “তোমার নাম কি মোহাম্মদ হানিফা?”
ওমর আলী বলিলেন, “সে কথায় তোমার কাজ কি? তোমার কাজ তুমি কর।”
“কাহার সঙ্গে যুদ্ধ করিব? সিংহ কি কখনো শৃগালের সহিত যুঝিয়া থাকে? শুনিয়াছি মোহাম্মদ হানিফা সর্বশ্রেষ্ঠ বীর! তুমি কি সেই হানিফা?”
“আমার সহিত যুদ্ধ করিতে তোমার হৃদয়ে ভয়ের সঞ্চার হইয়া থাকে, ফিরিয়া যাও।”
সোহরাব হাসিয়া বলিল, “এত দিন পরে আজ নূতন কথা শুনিলাম! সোহরাব জঙ্গের হৃদয়ে ভয়ের সঞ্চার! তুমি যদি মোহাম্মদ হানিফা হও বীরত্বের সহিত পরিচয় দাও। পরিচয় দিতে ভয় হয়, তুমিই ফিরিয়া যাও।”
“আমি ফিরিয়া যাইব?”
“তবে তুমি কি যথার্থই মোহাম্মদ হানিফা?”
“এত পরিচয়ের আবশ্যক কি? তোমাকে আমি কি জিজ্ঞাসা করিতেছি, তুমি কি পাপাত্মা এজিদ্?”
“সাবধান দামেস্ক অধিপতির অবমাননা করিও না।”
“আমি তোমার সঙ্গে কথা কহিতে ইচ্ছা করি না, তরবারির ক্ষমতা দেখিতে চাহি।”
“জানিলাম তুমিই মোহাম্মদ হানিফা।”
“শোন কাফের নারকি! তুই তোর অস্ত্রের আঘাত ভিন্ন যদি পুনরায় কথা বলিস্, তবে তুই যে পাথর পূজিয়া থাকিস্ সেই পাথরের শপথ।”
“আমি পাথর পূজা করি; তুই তো তাহাও করিস্ না। অনশ্চিত ভাবে নিরাকারের উপাসনায় কি মনের তৃপ্তি হয় রে বর্বর?”
“জাহান্নামী কাফের! আবার বাক্চাতুরী? জাতীয় নীতির বহির্ভূত বলিয়া কথা কহিতে সময় পাইতেছিস!”
“আমি তোর পরিচয় না পাইলে কখনোই অপাত্রে অস্ত্রনিক্ষেপ করিব না। ভাল মুখে বলিতেছি, তুমি যদি মোহাম্মদ হানিফা না হও, তবে তোমার সঙ্গে আমার যুদ্ধ নাই-যুদ্ধ নাই। তুমি আমার পরম বন্ধু, প্রিয় সুহৃদ।”
“বিধর্মীদিগের বাক্চাতুরীই এই প্রকার-প্রস্তর পূজকদিগের স্বভাবই এই।”
“ওরে নিরেট বর্বর! প্রস্তরে কি ঈশ্বরের মাহাত্ম্য নাই? দেখ দেখ লৌহেতে কি আছে।” আঘাত-অমনি প্রতিঘাত!
সোহরাব বলিল, “রে আম্বাজী! তুই মোহাম্মদ হানিফা; কেন আমাকে বঞ্চনা করিতেছিস্? আমার আঘাত সহ্য করিবার লোক জগতে নাই। সোহরাবের অস্ত্র এক অঙ্গে দুইবার স্পর্শ করে না।”
এ কথাটা কেবল ওমর আলী শুনিলেন মাত্র। আর যদি কেহ দেখিয়া থাকেন, তবে তিনি দেখিয়াছেন, সোহরাবের দেহ অশ্ব হইতে ভূতলে পড়িয়া গেল। কার আঘাত? আর কার, ওমর আলীর?
সোহরাব নিধন এজিদের সহ হইল না! মহা ক্রোধে নিষ্কোষিত অসিহস্তে সমরপ্রাঙ্গণে আসিয়া বলিল, “তুই কে? আমার প্রাণের বন্ধু সোহরাবকে বিনাশ করিলি? বল তো আম্বাজী তুই কে?”
“আবার পরিচয়? বল তো কাফের তুই কে?”
“আমি দামেস্কের অধিপতি। আরো বলিব, আমার নাম এজিদ্।”
ওমর আলীর হৃদয় কাঁপিয়া গেল, ভয়শূন্য হৃদয়ে মহা ভয়ের সঞ্চার হইল। ভ্রাতৃ-আজ্ঞা বার বার মনে পড়িতে লাগিল। প্রকাশ্যে বলিলেন, “তুই কি যথার্থই এজিদ্?”
“কেন, এজিদ্ নামে এত ভয় কেন?”
“সহস্র এজিদে আমার ভয় নাই, কিন্তু-”
“ও সকল ‘কিন্তু’ কিছু নহে। ধর এজিদের আঘাত!”
“আমি প্রস্তুত আছি।”
এজিদ্ মহাক্রোধে তরবারির আঘাত করিল। ওমর আলী বর্মে উড়াইয়া বলিলেন, “তুই যদি যথার্থই এজিদ্ তবে তোর আজ পরম ভাগ্য।”
“আমার সৌভাগ্য চিরকাল।”
“তা বটে-কি বলিব ভ্রাতৃ-আজ্ঞা।”
এজিদ্ পুনরায় আঘাত করিল। ওমর আলী সে আঘাত উড়াইয়া দিয়া বলিলেন, “আর কেন? তোমার বাহুবল, অস্ত্রবল সকলই দেখিলাম।”
এজিদ্ মহাক্রোধে পুনরায় আঘাত করিল। ওমর আলী সে আঘাত অসিতে উড়াইয়া দিলেন। ক্রমাগত এজিদের আঘাত ও ওমর আলীর আত্মরক্ষা।
এজিদ্ বলিল, “ওহে! তুমি যদি মোহাম্মদ হানিফা না হও, তবে যথার্থ বল, তুমি কে?”
“এখন পরিচয়ে প্রয়োজন নাই। তোমার আর কি ক্ষমতা আছে, দেখাও।”
“ক্ষমতা তো দেখাইব; কিন্তু দেখিবে কে? আমার একটু সন্দেহ হইতেছে, তাহাতেই বিলম্ব!”
“রণক্ষেত্রে সন্দেহ কি? হাতে অস্ত্র থাকিতে মুখে কেন?”
“তোমার অস্ত্রে ধার আছে কি না, দেখিলাম না। কিন্তু কথার ধারে গায়ে আগুন জ্বালিয়া দিয়াছে।”
“বাকচাতুরী ছাড়, এখন আঘাত কর।”
এজিদ্ ক্রমে তরবারি, তীর, বর্শা, যাহা কিছু তাহার আয়ত্ত ছিল আঘাত করিল। কিন্তু ওমর আলী সেই অচল পাষাণ প্রতিমাবৎ দণ্ডায়মান-এজিদ্ মহা লজ্জিত।
এজিদ্ বলিল, “আমার সন্দেহ ঘুচিল, তুমিই মোহাম্মদ হানিফা। হানিফা! গতকল্য তোমার যুদ্ধ দেখিয়াছি, আজিও দেখিলাম। ধন্য তোমার বাহুবল! এত অস্ত্র নিক্ষেপ করিলাম, কিছুই করিতে পারিলাম না। তোমার সহ্যগুণ-”
ওমর আলী হাসিয়া বলিলেন, “এজিদ্! তোমার আর কি ক্ষমতা আছে, দেখাও। অস্ত্র থাকিতে আজ আমি নিরস্ত্র, বল থাকিতে দুর্বল। কি পরিতাপ! আমার হাতে পড়িয়া আজ বাঁচিয়া গেলে।”
“ওরে পাষণ্ড! সাধ্য থাকিতে অসাধ্য কি? ভেকে কি কখনো অহি-মস্তকে আঘাত করিতে পারে? শৃগালের কি ক্ষমতা যে শার্দূলের গায়ে অঙ্গুলি স্পর্শ করে? তুই যাহাই মনে করিয়া থাকিস্, নিশ্চয় জানিস, আজ তোর জীবনের শেষ।”
“কথাটা মিছে বোধ হইতেছে না। তাহা যাহা হউক, হয় অস্ত্রত্যাগ কর, না হয় পলাও।”
“আমি পলাইব! তোর জীবন শেষ না করিয়া!”
এজিদ্ পুনরায় তরবারি আঘাত করিল,-বৃথা হইল। পরিশেষে ফাঁস হস্তে তিন চারি বার ওমর আলীকে প্রদক্ষিণ করিয়া ওমর আলীর গলায় ফাঁস নিক্ষেপ করিতে লাগিল, কিন্তু ফাঁসিতে আট্কে কই? ওমর আলী ভ্রাতার নিকট প্রতিজ্ঞা করিয়াছেন যে, আজ এজিদের প্রতি অস্ত্র নিক্ষেপ করিবেন না। এজিদ্ এখন অস্ত্র ছাড়িল, মল্ল যুদ্ধ আরম্ভ করিলেই ওমর আলীর মনের সাধ পূর্ণ হয়। তিনি সেই চিন্তায় আছেন, সময় খুঁজিতেছেন-কার্যেও তাহাই ঘটিল।
