মোহাম্মদ হানিফা শিবিরেই বসিয়া যুদ্ধের সংবাদ লইতেছেন মাত্র। এ পর্যন্ত কেহই পরাস্ত হয় নাই। এজিদ্ স্বয়ং যুদ্ধে আসিয়াছে, আর হানিফা বোধে ওমর আলীকে যথাসাধ্য আক্রমণ করিয়াছে, একথার তত্ত্ব কেহই সন্ধান করেন নাই হানিফাও শুনিতে পান নাই। এজিদ্ স্বয়ং যুদ্ধক্ষেত্রে আসিবে, ইহা কেহ মনে করেন নাই।
এজিদ্ নিশ্চয় জানিয়াছে যে, এই মোহাম্মদ হানিফা। উভয় ভ্রাতার আকৃতি প্রায় এক; তবে যে প্রভেদ, তাহা জগৎকর্তার সৃষ্টির মহিমা ও কৌশল! এজিদ্ একদিন মাত্র দেখিয়া সে ভেদ বিশেষরূপে নির্ণয় করিতে পারে নাই। আবার এ পর্যন্ত অস্ত্রনিক্ষেপ করিল না, এ কি কথা? মল্লযুদ্ধ করিয়া বান্ধিয়া ফেলিব-মল্লযুদ্ধে নিশ্চয় ধরিব-ইহাই এজিদের মনের ভাব।
উভয়ের মনের আশাই উভয় সফল করিবেন। প্রকৃতি কাহার অনুকূল, তাহা কে বলিতে পারে? উভয় বীর অশ্ব পরিত্যাগ করিলেন,-মল্লযুদ্ধ আরম্ভ হইল। বীর-পদ-দলনে পদতলস্থ মৃত্তিকা স্বাভাবিক ছিদ্রে অঙ্গ মিশাইয়া ক্রমে সরিতে লাগিল।
মারওয়ান আবদুল্লাহ্ জেয়াদ্ প্রভৃতি এই অলৌকিক যুদ্ধে এজিদকে লিপ্ত দেখিয়া মহাবেগে অশ্ব চালাইল। হানিফাপক্ষীয় কয়েকজন যোদ্ধাও ওমর আলীকে হঠাৎ মল্লযুদ্ধে রত দেখিয়া যুদ্ধস্থলে উপস্থিত হইলেন।
এজিদ্ কতবার ওমর আলীকে ধরিতেছে, ধরিয়া রাখিতে পারিতেছেন না। ওমর আলীও এজিদকে ধরিতেছেন, কিন্তু স্ববশে আনিতে পারিতেছেন না।
মোহাম্মদ হানিফাপক্ষীয় বীরগণ এজিদকে চিনিয়া চতুর্দিকে অন্ধকার দেখিতে লাগিলেন এবং বুঝিলেন ওমর আলীর মল্লযুদ্ধের কারণ। এজিদের প্রতি কাহারো অস্ত্রনিক্ষেপ করিবার অনুমতি নাই। কাজেই ওমর আলীরও নিস্তার নাই। হায়! হায়! একি হইল, মনে মনে এই আন্দোলন করিয়া মোহাম্মদ হানিফার নিকট এ কথা বলিতে, কেহ কাহারো অপেক্ষা না করিয়া সকলেই শিবিরাভিমুখে ছুটিলেন।
এদিকে এজিদ্ মল্লযুদ্ধের পেঁচাওবন্দে গ্রীবা এবং ঊরু সাপটিয়া ধরিয়াছে। ওমর আলী সে বন্ধন কাটিয়া এজিদকে ধরিলেন। সেই সময় মারওয়ান, জেয়াদ প্রভৃতি সকলে ত্রস্তে অশ্ব হইতে নামিয়া মহাবীর ওমর আলীকে ধরিল এবং ফাঁস দ্বারা তাঁহার হস্ত পদ, গ্রীবা বাঁধিয়া জয় জয় রব করিতে করিতে আপন শিবিরাভিমুখে আসিতে লাগিল।
মোহাম্মদ হানিফা এজিদের সংবাদ পাইয়া সজ্জিত বেশে শিবির হইতে বহির্গত হইয়া দেখিলেন, সমরাঙ্গণে জন-প্রাণী মাত্র নাই। এজিদের শিবিরের নিকট মহা কোলাহল-জয় জয় রব-তুমুল বাজনা। আর বৃথা সাজ-বৃথা গমন। ভ্রাতৃ-আজ্ঞা প্রতিপালন করিতে গিয়া আজ ওমর আলী বন্দি।
মোহাম্মদ হানিফা কি করিবেন, কিছুই স্থির করিতে পারিলেন না। অশ্ব হইতে অবতরণ করিয়া মহা চিন্তায় বসিয়া পড়িলেন।
বিপক্ষদলে বাদ্যের তুফান উঠিল, দামেস্ক প্রান্তর হর্ষে ও বিষাদে কাঁপিয়া উঠিল। এজিদ্দলে প্রথমে কথা-মোহাম্মদ হানিফা বন্দি শেষে সাব্যস্ত হইল, মোহাম্মদ হানিফা নহে, এ তাঁহার কনিষ্ঠ ভ্রাতা-নাম ওমর আলী। যাহা হউক, হানিফার দক্ষিণ হস্ত ভগ্ম, সিংহের এক অঙ্গ হীন-এজিদেরই জয়।
এজিদ্ আজ্ঞা করিল, “আগামী কল্য যুদ্ধ বন্ধ থাকিবে, কারণ ওমর আলীর প্রাণবধ। শত্রুকে যখন হাতে পাইয়াছি, তখন ছাড়িব না, নিশ্চয় প্রাণদণ্ড করিব। কিসে প্রাণদণ্ড? তরবারিতে নহে, অন্য কোন প্রকারে নহে,-শূলে প্রাণদণ্ড। হানিফা দেখিবে, তাহার সৈন্য সামন্ত দেখিবে,-প্রকাশ্য স্থানে শূলে ওমর আলীর প্রাণবিনাশ করিতে হইবে। এখনই ঘোষণা করিয়া দাও যে, হানিফার ভ্রাতা মহারাজ হস্তে বন্দি, আগামী কল্য তাহার প্রাণবধ।”
মারওয়ান তখনই রাজাজ্ঞা প্রতিপালনে প্রস্তুত হইল। মুহূর্ত মধ্যে যুদ্ধক্ষেত্রে ও নগরে ঘোষণা হইল, “মোহাম্মদ হানিফার কনিষ্ঠ ভ্রাতা ওমর আজ এজিদের বিরুদ্ধে অগ্রসর হইয়াছিল, রাজকৌশলে সে পাপী আজ বন্দি। আগামী কল্য দামেস্ক নগরের পূর্বপ্রান্তরে সমর ক্ষেত্রের নিকট শূলে চড়াইয়া তাহার প্রাণবধ করা হইবে।”
মোহাম্মদ হানিফার কর্ণেও এ নিদারুণ ঘোষণা প্রবেশ করিল। শিবিরস্থ সকলেই এই মর্মভেদী ঘোষণায় মহা আকুল হইলেন। গাজী রহমানের বিশাল মস্তক ঘুরিয়া গেল, মস্তিষ্কের মজ্জা আলোড়িত হইয়া তড়িৎবেগে চালিত হইতে লাগিল।
উদ্ধার পর্ব ২৪ প্রবাহ
আজ ওমর আলীর প্রাণবধ। এ সংবাদে কেহ দুঃখী, কেহ সুখী। নগরবাসীরা কেহ ম্লান মুখে বধ্যভূমিতে যাইতেছে-কেহ মনের আনন্দে হাসি রহস্যে নানা কথার প্রসঙ্গে বধ্যভূমিতে উপস্থিত হইতেছে। শূলদণ্ড দণ্ডায়মান হইয়াছে। স্বপক্ষ বিপক্ষ সৈন্যদল ওমর আলীর বধক্রিয়া স্পষ্টভাবে দেখিতে পায়, মন্ত্রী মারওয়ান সে উপায় বিশেষ বিবেচনা করিয়া করিয়াছে। দিনমণির আগমনসহ নাগরিকদল দলে দলে দামেস্ক-প্রান্তরে আসিয়া একত্রিত হইতে লাগিল। প্রায় সকল লোকের মুখেই এই কথা-“আজ শূল-দণ্ডের অগ্রভাগ রক্তমাখা হইয়া ওমর আলীর মজ্জা ভেদ করিবে। কাল মস্হাব কাক্কার খণ্ডিত শির ধরায় লুণ্ঠিত হইবে; তাহার পর হানিফার দশা যাহা ঘটিবে, তাহা বুঝিতেই পারা যায়।”
কথা গোপন থাকিবার নহে। বিশেষ মন্দ কথা বায়ুর অগ্রে অগ্রে অতি গুপ্তস্থানেও প্রবেশ করে। বন্দিগৃহেও ঐ কথা শেষে প্রাণবধের কথা শুনিয়া সাহরেবানু ও হাসনেবানুর কথা বন্ধ হইয়াছে, অন্তরে ব্যথা লাগিয়াছে। ক্রন্দন ভিন্ন তাঁহাদের আর উপায় কি? হোসেন-পরিজনের দুঃখের অন্ত নাই। রক্ত, মাংস, অস্থি ও চর্মসংযুক্ত শরীর বলিয়াই এত সহ্য হইতেছে,-পাষাণে গঠিত হইলে এতদিন বিদীর্ণ হইত,-লৌহ-নির্মিত হইলে কোন্ দিন গলিয়া যাইত!
