অলীদ্ মনোযোগের সহিত দেখিয়া বলিলেন, “মহারাজ! ইনিই মোহাম্মদ হানিফা।”
এজিদ্ চমকিয়া উঠিলেন, কিন্তু সাহসে নির্ভর করিয়া উচ্চৈঃস্বরে বলিতে লাগিলেন, “সৈন্যগণ! অসি নিষ্কোষিত কর, বর্শা উত্তোলন কর, যদি দামেস্কের স্বাধীনতা রক্ষা করিতে চাও, মহাবেগে হানিফাকে আক্রমণ কর। এমন সুযোগ আর হইবে না। তোমাদের বল বিক্রমের ভালরূপে পরিচয় পাইতে হানিফা যুদ্ধক্ষেত্রে আর আসিবে না! নিশ্চয় পলাইয়া প্রাণরক্ষা করিবে। যাও, শীঘ্র যাও, শীঘ্র হানিফার মস্তকচ্ছেদন করিয়া আন। তোমরাই আমার দক্ষিণ বাহু, তোমরাই আমার বল বিক্রম, তোমরাই আমার সাহস, তোমরাই আমার প্রাণ। ঘোর বিক্রমে হানিফাকে আক্রমণ কর। হয় বন্ধন-নয় শিরচ্ছেদ, এই দুইটি কার্যের একটি কার্য করিতে আজ জীবন পণ কর। বীরগণ! বীরদর্পে চলিয়া যাও। তোমাদের পারিতোষিক আমার প্রাণ, মন, দেহ-মণিমুক্তা হীরক আদি অতি তুচ্ছ কথা।”
সৈন্যগণ অসিহস্তে মার মার শব্দে সমরাঙ্গণে যাইয়া হানিফাকে আক্রমণ করিল। এজিদের চক্ষু হানিফার দিকে। এজিদ্ দেখিলেন হানিফার তরবারি ক্ষণস্থায়ী বিদ্যুতের ন্যায় চাক্চিক্য দেখাইয়া ঊর্ধ্বে, নিন্মে, বামে, দক্ষিণে ঘুরিল এবং লোহিত রেখায় তাহার পূর্ব চাক্চিক্য কিঞ্চিৎ মলিন ভাব ধারণ করিল। সম্মুখের একটি প্রাণীও নাই। চক্ষুর পলকে যেন স্থির বায়ুর সহিত মিশিয়া অশ্ব হইতে অন্তর্ধান হইল।
মারওয়ান বলিল, “বাদশা নামদার! দেখিলেন অলীদ সহজে মদিনার পথ ছাড়িয়া দেয় নাই। এই যে হানিফার অস্ত্র চলিল, আমরা পরাজয় স্বীকার না করিলে এ অস্ত্র আর থাকিবে না, দিবারাত্র সমান ভাবে চলিবে, হানিফার মন কিছুতেই টলিবে না, রক্তের স্রোত বহিয়া দামেস্ক প্রান্তর ডুবিয়া গেলেও সে বিশাল হস্তের বল কমিবে না,-অবশ হইবে না;-তরবারির তেজ কমিবে না, ক্লান্ত হইয়া শিবিরেও যাইবে না।”
এজিদ্ রোষে জ্বলিতেছে। পুনরায় পূর্বপ্রেরিত সৈন্যের দ্বিগুণ সৈন্য হানিফা বধে প্রেরণ করিল। সৈন্যগণ মহাবীরের সম্মুখে যাইয়া একযোগে নানাবিধ অস্ত্র নিক্ষেপ করিতে লাগিল। যে যেরূপ অস্ত্র নিক্ষেপ করিল, ঈশ্বরেচ্ছায় হানিফা তাহাকে সেই অস্ত্রেই যমপুরী পাঠাইয়া দিলেন। এজিদের ক্রোধের সীমা রহিল না। পুনরায় চতুর্গুণ সেনা পাঠাইল। সেবার এজিদ্ হানিফাকে তরবারি হস্তে তাঁহার সৈন্যগণের নিকট যাইতে দেখিল মাত্র। পরক্ষণেই দেখিল যে, প্রেরিত সৈন্যের অশ্বসকল দিগ্বিদিক্ ছুটিয়া বেড়াইতেছে, একটি অশ্বপৃষ্ঠেও আরোহী নাই।
এজিদ্ যুদ্ধক্ষেত্রে স্বয়ং যাইতে প্রস্তুত হইল। মারওয়ান করযোড়ে বলিল, “মহারাজ! এমন কার্য করিবেন না, আজ মোহাম্মদ হানিফার সম্মুখে কখনোই যাইবেন না। এখনও দামেস্কের অসংখ্য সৈন্য রহিয়াছে, আমরা জীবিত আছি; আমাদের প্রাণ শেষে যাহা ইচ্ছা করিলেন। আমরা জীবিত থাকিতে মহারাজকে হানিফার সম্মুখীন হইতে দেব না।”
এজিদ্ মারওয়ানের কথায় ক্ষান্ত হইল। সে দিন আর যুদ্ধ করিল না। সে দিনের মত শেষ বাজনা বাজাইয়া, নিশান উড়াইয়া মারওয়ান সহ শিবিরে আসিল। মোহাম্মদ হানিফাও তরবারি কোষে আবদ্ধ করিয়া অশ্ববল্গা ফিরাইয়া শিবিরে গমন করিলেন।
উদ্ধার পর্ব ২৩ প্রবাহ
প্রভাত হইল। পাখীরা ঈশ-গান গাহিতে গাহিতে জগৎ জাগাইয়া তুলিল। অরুণোদয়ের সহিত যুদ্ধ-নিশান দামেস্ক-প্রান্তরে উড়িতে লাগিল। যে মস্তক জয়নাবের কর্ণাভরণের দোলায় দুলিয়াছিল ঘুরিয়াছিল, এখনও দুলিতেছে, ঘুরিতেছে), আজ সেই মস্তক হানিফার অস্ত্র চালনার কথা মনে করিয়া মহাবিপাকে ঘুরিতে লাগিল। সঙ্গে সঙ্গে মারওয়ান, অলীদ, জেয়াদ, ওমরের মস্তিষ্ক পরিশুষ্ক; সৈন্যগণের হৃদয়ে ভয়ের সঞ্চার-না জানি আবার কি ঘটে!
উভয় পক্ষই প্রস্তুত। হানিফার বৈমাত্র এবং কনিষ্ঠ ভ্রাতা ওমর আলী করযোড়ে হানিফার নিকট বলিলেন, “আর্য! আজিকার যুদ্ধভার দাসের প্রতি অর্পিত হউক।”
হানিফা সস্নেহে বলিলেন, “ভ্রাতঃ! গত কল্য যে উদ্দেশ্যে তরবারি ধরিয়াছিলাম, যে আশায় দুল্দুলকে কশাঘাত করিয়াছিলাম, তাহা আমার সফল হয় নাই। বিপক্ষদল আমাকে বড়ই অপ্রস্তুত করিয়াছে। আমি মনে করিয়াছিলাম, যুদ্ধ শেষ না করিয়া আর তরবারি কোষে আবদ্ধ করিব না, শিবির হইতে বাহির হইয়াছি, আর শিবিরে যাইব না, আজি প্রথম-আজি শেষ। শুনিয়াছি বিশেষ সন্ধানেও জানিয়াছি, এজিদ্ স্বয়ং যুদ্ধে আসিয়াছে! যুদ্ধ-সময়েই হউক, কি শেষেই হউক, অবশ্যই এজিদ্কে হাতে পাইতাম! আমার চক্ষে পড়িলে তাহার জীবন কালই শেষ হইত। হোসেনের মস্তক এজিদ্ র্কাবালা হইতে দামেস্কে আনিয়াছিল। আমি তাহার মস্তক হাতে করিয়া দামেস্কবাসীদিগকে দেখাইতে দেখাইতে বন্দিগৃহে যাইয়া জয়নালের সম্মুখে ধরিতাম, আমার মনের আশা মনেই রহিল। কি করি, বাধ্য হইয়া গতকল্য যুদ্ধে ক্ষান্ত দিয়াছি। আজ তুমি যাইবে, যাও। ভাই! তোমাকে ঈশ্বরে সঁপিলাম। দয়াময়ের নাম করিয়া নূরনবী মোহাম্মদের নাম করিয়া ভক্তিভাবে পিতার চরণ উদ্দেশ্যে নমস্কার করিয়া, তরবারি হস্তে কর। শত সহস্র বিধর্মী বধ করিয়া জয়নাল উদ্ধারের উপায় কর। তোমার তরবারির তীক্ষ্ণধার আজ শত্রুশোণিতে রঞ্জিত হউক, সেই আশীর্বাদ করি। কিন্তু ভাই, এজিদের প্রতি অস্ত্র নিক্ষেপ করিও না। ক্রোধবশতঃ ভ্রাতৃ-আজ্ঞা উপেক্ষা করিয়া মহাপাপ-কূপে ডুবিও না; সাবধান, আমার আজ্ঞা লঙ্ঘন করিও না।”
ওমর আলী ভ্রাতৃ-আজ্ঞা শিরোধার্য করিয়া ভক্তিভাবে ভ্রাতৃ-পদ পূজা করিয়া হানিফার উপদেশ মত তরবারি হস্তে করিলেন। রণবাদ্য বাজিয়া উঠিল। সৈন্যগণ সমস্বরে ঈশ্বরের নাম ঘোষণা করিয়া ওমর আলীর জয় ঘোষণা করিল।
