ধনুর টঙ্কার সীমারের কর্ণে বজ্রধ্বনির ন্যায় বোধ হইতে লাগিল! প্রাণের মায়া কাহার না আছে? আজ সীমারের চক্ষে জল পড়িল, আজ পাষাণ গলিল! পূর্বকৃত প্রতি মুহূর্তের পাপকার্যের ভীষণ ছবি মনে উদয় হইল। পাপময় জীবনের নিদারুণ পাপছায়া ভীষণ দর্শনে সীমারের চক্ষের উপর ঘুরিতে লাগিল। জলবিন্দুর সহিত শরীরের রক্তবিন্দু ঝরিতে লাগিল। সীমার ঊর্ধ্বদৃষ্টিতে আকাশ পানে চাহিয়া হোসেনের প্রতিজ্ঞার কথা মনে করিয়া জীবন শেষের প্রতীক্ষা করিতে লাগিল। শরীরের মাংস সকল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র খণ্ডে দেহ স্খলিত হইয়া মৃত্তিকায় পড়িতেছে-তত্রাচ সীমারের প্রাণ দেহপিঞ্জরেই ঘুরিতেছে। মস্হাব কাক্কা প্রভৃতি দ্বিগুণ জোরে শর-নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন! শরীরের গ্রন্থি সকল ছিন্ন হইয়া পড়িতে আরম্ভ হইল, তবু প্রাণ বাহির হইল না! কী কঠিন প্রাণ! তখন সীমার ঊর্ধ্বদৃষ্টে চাহিয়া বলিতে লাগিল, “হে ঈশ্বর! আমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত নাই? আমার শরীরের মাংসখণ্ড প্রায় স্খলিত হইয়া পড়িল, অস্থি-সকল র্জর্জ হইয়া ভগ্ন হইয়া গেল, তবু প্রাণ বাহির হইল না। হে দয়াময়! আমিও তোমার সৃষ্ট জীব, আমার প্রতি কটাক্ষপাত কর, আমার প্রাণবায়ু শীঘ্রই হোসেনের পদপ্রান্তে নীত কর।”
মোহাম্মদ হানিফা এবং মস্হাব কাক্কা এই কাতরপূর্ণ প্রার্থনা শুনিয়া শরাসন-জ্যা শিথিল করিলেন, আর তূণীরে হস্তক্ষেপ করিলেন না। সকলেই দয়াময়ের নাম করিয়া শত সহস্র প্রকারে তাঁহার গুণানুবাদ করিলেন। ক্রমে সীমারের প্রাণবায়ু ইহজগৎ হইতে অনন্ত আকাশে মিশিয়া হোসেনের পদপ্রান্তে আশ্রয় গ্রহণ করিল।
বীরকেশরিগণ আর সীমারের প্রতি ভ্রূক্ষেপও করিলেন না, শিবিরে আসিয়া মদিনা যাইতে প্রস্তুত হইলেন। ওত্বে অলীদ বিষন্ন বদনে দামেস্কাভিমুখে যাত্রা করিল। যে আশা তাহার অন্তরে জাগিতেছিল, সে আশা আশা-মরীচিকাবৎ ঐ প্রান্তরের বালুকাকণা মধ্যে মিশিয়া গেল। মনে মনেই বুঝিল, সীমারের সৈন্যগণ মস্হাব কাক্কার অধীনতা স্বীকার করিয়াছে! আর আশা কী?-এ প্রান্তরে আর আশা কী?
উদ্ধার পর্ব ১৭ প্রবাহ
মন্ত্রণাগৃহে এজিদ্ একা। দেখিলেই বোধ হয় যেন কোন বৃহৎ চিন্তায় এখন তাহার মস্তিষ্ক-সিন্ধু উথলিয়া উঠিয়াছে। দুঃখের সহিত চিন্তা,-এ চিন্তার কারণ কী? কিছুক্ষণ নীরব থাকিয়া গৃহের চতুষ্পার্শে দৃষ্টি করিল;-দেখিল কেহ নাই! পূর্ব নির্দিষ্ট সময়ে মারওয়ান মন্ত্রণাগৃহে উপস্থিত থাকিবে; সময় উত্তীর্ণ হইয়াছে, তথাচ মন্ত্রীবর আসিতেছে না। এজিদের চিন্তাকুল অন্তর ক্রমেই অস্থির হইতেছে। দীর্ঘ নিঃশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া মৃদুমৃদু স্বরে বলিল, “সীমার বন্দি! এতদিন পরে সীমার শত্রুহস্তে বন্দি! অলীদেরও প্রাণের আশঙ্কা! আমারই সৈন্য, আমারই চির-অনুগত সৈন্য যখন বিপক্ষ দলে মিশিয়াছে, তখন আর কল্যাণ নাই! হা! কী কুক্ষণেই জয়নাব রূপ নয়নে পড়িয়াছিল! সে বিশালাক্ষির দোলায়মান কর্ণাভরণের দোলায় কি মহা অনর্থই ঘটিল। অকালে কত প্রাণীর প্রাণপাখি দেহপিঞ্জর হইতে একেবারে উড়িয়া চলিয়া গেল। শত শত নারী পতিহারা হইয়া মনের দুঃখে আত্মবিসর্জন করিল! কত মাতা সন্তান বিয়োগে অধীরা হইয়া অস্ত্রের সহায়ে দৈহিক মায়া হইতে-শোক-তাপের যন্ত্রণা হইতে-আত্মাকে রক্ষা করিল। কত দুগ্ধপোষ্য শিশু সন্তান এক বিন্দু জলের জন্য শুষ্ককণ্ঠ হইয়া মাতার ক্রোড়ে চিরনিদ্রায় নিদ্রিত হইল! ছি ছি! সামান্য প্রেমের দায়ে, দুরাশার কুহকে, মহাপাপী হইতে হইল! হায়! হায়! রূপজ মোহে মোহিত হইয়া, আত্মহারা, বন্ধুহারা শেষে সর্বস্বহারা হইতে হইল? বিনা দোষে, বিনা কারণে, কত পুণ্যাত্মার জীবন প্রদীপ নিবিয়া গেল! এত হইল, এত ঘটিল, তবু আগুন নিবিল না,-সে রত্ন হস্তগত হইয়াও আশা পূর্ণ হইল না, স্ববশে আসিল না।-হোসেনকে বধ করিয়াও সে চিন্তার ইতি হইল না। ক্রমেই আগুন দ্বিগুণ ত্রিগুণরূপে জ্বলিয়া উঠিল। সৈন্যহারা, মিত্রহারা, রাজ্যহারা, ক্রমে সর্বস্বহারা হইবার উপক্রম হইয়া উঠিল! ধিক্ প্রণয়ে! ধিক্ রমণীর রূপে! শত ধিক্ কুপ্রেমাভিলাষী পুরুষে! সহস্র ধিক্ পরস্ত্রী-অপহারক রাজায়!”
এই পর্যন্ত বলিতেই মারওয়ান উপস্থিত হইয়া যথাবিধি সম্ভাষণ করিল। এজিদ্ অন্যমনস্কভাবে জিজ্ঞাসা করিল, “সীমারের কি হইল!”
“মহারাজ! সীমার যখন বিপক্ষদলের হস্তগত হইলেন, তখন তাঁহার আশা একপ্রকার পরিত্যাগ করিতে হইবে। এখন ওত্বে অলীদের রক্ষা, রাজ্যরক্ষা, প্রাণরক্ষা, এই সকল রক্ষার উপায় চিন্তা করাই অগ্রে কর্তব্য। সীমার-উদ্ধার, সীমারের আশা আর করিবেন না। কারণ, সীমার মোহাম্মদ হানিফার হস্তগত হইলে তাঁহার রক্ষা কিছুতেই নাই।”
“তবে কি সীমার নাই?”
“সীমার নাই, এ-কথা বলিতে পারি না। তবে অনুমানে বোধ হয় যে, সীমার মোহাম্মদ হানিফার হস্তে ধরা পড়িয়াছেন। সুতরাং সীমার-উদ্ধারের চিন্তা না করিয়া অলীদ-উদ্ধারের চিন্তাই এইক্ষণে আবশ্যক হইয়াছে। তার পর ও কয়েক দিনে যদি অলীদ বন্দি হইয়া থাকেন, কি যুদ্ধে পরাস্ত হইয়া যদি আত্মসমর্পণ করিয়া থাকেন, তবে প্রথম চিন্তা দামেস্করাজ্য রক্ষা, আপনার প্রাণরক্ষা। আপন সৈন্য যখন বিপক্ষদলে মিশিয়াছে, তখন দুঃসময়ের পূর্ব চিহ্ন, দুরবস্থার পূর্বলক্ষণ, সম্পূর্ণ বিপদের সূচনা দৃশ্য দেখাইয়া, অমঙ্গলকে আহ্বান করিতেছে। আমাদের সৌভাগ্য শশী চির-রাহুগ্রস্ত হইবে বলিয়াই জগতের অন্ধকার ছায়ার দিকে ক্রমশঃই সরিতেছে।”
