এজিদের কর্ণে কথা কয়টি বিষসংযুক্ত সূচিকার ন্যায় বিদ্ধ হইল; তাহার মনের পূর্বভাব কে যেন হরণ করিয়া অন্তরময় মহাবিষ ঢালিয়া দিল। সিংহগর্জনে গর্জিয়া উঠিল, “কি আমি বাঁচিয়া থাকিতে দামেস্কের সৌভাগ্য-শশী চির-রাহুগ্রস্ত হইবে? এ কথা তুমি আজ কোথায় পাইলে? কে তোমার কর্ণে এ মূলমন্ত্র টিপিয়া দিয়াছে? মারওয়ান বুঝিলাম, হানিফার তরবারির তেজের কথা শুনিয়া তোমারও হৃৎপিণ্ডের শোণিতসার শুকাইয়া গিয়াছে। তুমি নিশ্চয় জানিয়ো, এজিদ্ বর্তমান থাকিতে এ রাজ্যে সৌভাগ্য-শশীর অল্প পরিমাণ অংশ রাহুর গ্রাসে পতিত হইবে না। আমি তোমাকে এইক্ষণে কয়েকটি কথা জিজ্ঞাসা করিব, তুমি তাহারই উত্তর দাও। জয়নাল আবেদীন, হাসান পরিবার-ইহারা কী এখন জীবিত থাকিবে? মোহাম্মদ হানিফা যদি সীমারের প্রাণবিনাশ করিয়া থাকে, তবে নিশ্চয়ই আমি জয়নালের শিরচ্ছেদ স্বহস্তে করিব।”
“মহারাজ! এ সময় জয়নাল আবেদীনের প্রাণবিনাশ করিলে আর নিস্তার নাই। এ জ্বলন্ত আগুন এখন নির্বাণের উপায় আছে-এখনো রক্ষার উপায় আছে-এখনো সন্ধির আশা আছে। কিন্তু জয়নালের কোন অনিষ্ট ঘটাইলে ধন, জন, রাজ্য, প্রাণ সমূলে বিনাশের সুপ্রশস্ত পথ পরিষ্কার করিয়া দেওয়া হইবে। দামেস্করাজ্যের আশা, প্রাণের আশা পরিত্যাগ করিয়া জয়নাল আবেদীনকে যাহা ইচ্ছা হয় করিতে পারেন। এখন পরাজয় স্বীকারপূর্বক জয়নালকে ছাড়িয়া দিলে দামেস্কনগর রক্ষার আশা করিলেও করা যাইতে পারে। দেখুন হাসানের বধসাধন হইলে, বৃদ্ধ মন্ত্রী হামান প্রকাশ্য সভায় যে সারগর্ভ রাজনৈতিক উপদেশচ্ছলে নিজমত প্রকাশ করিয়াছিলেন, সে সময় আমি তাঁহার মতের পোষকতা করি নাই। যদি জানিতাম যে, হোসেন ব্যতীত মোহাম্মদ হানিফা নামে প্রবল পরাক্রান্ত আরো একজন বীর আছে, তাহা হইলে বৃদ্ধ সচিবের কথা কখনো অবহেলা করিতাম না; আপনার মত প্রবল করিয়া কোনকালেই অগ্রসর হইতাম না; যদি হইতাম তবে অগ্রে হানিফার বধসাধন না করিয়া হোসেনের বিরুদ্ধে কিছুতেই অস্ত্র ধরিতাম না। ভ্রমই লোকের সর্বনাশের মূল। ভ্রমই মনুষ্যের অমঙ্গলের কারণ।”
“মারওয়ান! তোমার এ দুর্বুদ্ধি আজি কেন হইল! আমি পরাজয় স্বীকারে সন্ধি করিব? প্রাণের ভয়ে হানিফার সহিত সন্ধি করিব? জয়নালকে, হোসেন-পরিজনকে ছাড়িয়া দিব? জয়নালকে ছাড়িয়া দিব? ধিক্ তোমার কথায়! আর শত ধিক এজিদের প্রাণে! মারওয়ান! বল তো, এ মহাসংগ্রামের কারণ কি? এ ঘটনার মূল কি? তুমি কি সকলই বিস্মৃত হইয়াছ? মনে হয় তুমিই না বলিয়াছিলে, স্ত্রী-জাতি বাহ্যিক সুখপ্রিয়; কই, এতদিনেও তো তোমার কথার সত্যতা প্রমাণ বা উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত পাইলাম না। জগতে সুখী হইতে কে না ইচ্ছা করে?-এও তোমারই কথা। কই, বন্দিগৃহে মহাকেশে থাকিয়াও তো সুখী হইতে ইচ্ছা করে না, পাটরাণী হইতেও চাহে না? মারওয়ান! তোমার পদে পদে ভ্রম! আমি তো উন্মাদ। গত বিষয় আলোচনা বৃথা! আমার আজ্ঞা এই যে, তোমাকে এখনই অলীদ-সাহায্যে এবং সীমার-উদ্ধারে যাইতে হইবে।”
“আমি যাইতে প্রস্তুত আছি, অলীদের সাহায্য ব্যতীত এ সময়ে হানিফাকে আক্রমণ করিতে আমি পারিব না।”
“সুযোগ পাইলেও আক্রমণ করিবে না?”
“সুযোগ পাইলে মারওয়ান ছাড়িয়া দিবে তাহা মনে করিবেন না। তবে অগ্রেই বলিতেছি যে, অলীদকে রক্ষা করাই আমার প্রধান কার্য। সীমারের দেখা পাইলে, কি জীবিত থাকিলে, অবশ্য উদ্ধারের চেষ্টা করিব।”
“চেষ্টা করিবে,-কী কথা! উদ্ধার করিতেই হইবে।”
“মহারাজ! যে কঠিন সময় উপস্থিত হইয়াছে, নিশ্চিতরূপে আর কিছুই বলিতে পারি না। সময় মন্দ হইলে চতুর্দিক হইতে বিপদ চাপিয়া পড়ে! এখন ভবিষ্যৎ ভাবিয়া কার্য না করিলে, পরিণাম রক্ষা হইবে না। একা মোহাম্মদ হানিফা আপনার শত্রু নহে! নানা দেশের, নানা রাজ্যের ভূপতি ও বীরপুরুষগণ আপনার বিরুদ্ধে দণ্ডায়মান হইয়াছে; বলিতে গেলে, মোহাম্মদভক্ত মাত্রেই আপনার প্রাণ লইতে দুই হস্ত বিস্তার করিয়া রহিয়াছে।”
“আমি কী এতই হীনবল হইয়া পড়িয়াছি যে, তোমার বর্ণিত রাজগণ সহিত যুদ্ধ করিয়া পরাস্ত হইব?”
“মহারাজ! জয়-পরাজয় ভবিষ্যতের গর্ভে!”
“তবে কী হানিফার খণ্ডিত মস্তক আমি দেখিব না?”
“অবশ্যই দেখিতে পারেন-বিলম্বে।”
“কথা অনেক শুনিলাম, তুমি অদ্যই পঞ্চদশ সহস্র সৈন্য লইয়া অলীদের সাহায্যে এবং সীমারের উদ্ধারে গমন কর, এই আমার আজ্ঞা।”
এই আজ্ঞা করিয়া এজিদ্ রোষভরে মন্ত্রণাগৃহ হইতে উঠিয়া চলিয়া গেল।
মারওয়ান বলিতে লাগিল, “দুর্মতির লক্ষণই এই, যেখানে উচিত সেইখানেই রোষ। যাহা হউক আমি এখনই যাত্রা করিব, সীমারের উদ্ধার যাহা হইবার বোধ হয় এতদিনে হইয়া গিয়াছে, অলীদের উদ্ধার হয় কি-না, তাহাই সন্দেহ।”
উদ্ধার পর্ব ১৮ প্রবাহ
কী মর্মভেদী দৃশ্য! কী হৃদয়বিদারক বিষাদ ভাব! কাহারো মুখে কথা নাই, হর্ষের চিহ্ন নাই, যুদ্ধজয়ের নাম নাই, সীমারবধের প্রসঙ্গ নাই, অলীদ পরাজয়ের আলোচনা নাই। রাজা রাজবেশশূন্য, শির শিরস্ত্রাণশূন্য, পদ পাদুকাশূন্য, পরিধেয় নীলবাস,-বিষাদ-চিহ্ন নীলবাস। সৈন্যদলে বাজনা বাজিতেছে না, তুরি-ডঙ্কার আর শব্দ হইতেছে না। “নকীব” উষ্ট্রপৃষ্ঠে বসিয়া ভেরীরবে ভূপতিগণের শুভাগমনবার্তা আর ঘোষণা করিতেছে না। সকলেই পদব্রজে-সকলেই ম্লানমুখে-নীরবে। তীর তূণীরে, তরবারি কোষে, খ র পিধানে, সকল চক্ষুই জলে পরিপূর্ণ। কারুকার্যখচিত সুন্দর নিশান-স্থান আজ নীল নিশান। হানিফা সসৈন্যে রাজপথে-পুণ্যভূমি মদিনা নগরের রাজপথে। নগরের উচ্চ উচ্চ প্রাসাদে, অত্যুচ্চ মঞ্চে, সিংহদ্বারে, নানা স্থানে, অনন্ত শোক-প্রকাশক নীল পতাকা-সকল অনিল সহকারে অনন্ত নীলাকাশে মিশিয়া হোসেনের অনন্ত শোক কাঁপিয়া কাঁপিয়া প্রকাশ করিতেছে। যে দিকে দৃষ্টিপাত কর, সেই দিকেই শোকের চিহ্ন-বিষাদের রেখা। হোসেন-শোকে মদিনার এই দশা। এ দশা কে করিল? এ অন্তর্ভেদী দুর্দশা কে ঘটাইল? মর্ত্যে, শূন্যে, আকাশে, নীলিমা-রেখা কে অঙ্কিত করিল? হায়! হায়! হোসেন-শোকের অন্ত নাই। এ বিষাদ-সিন্ধুর শেষ নাই। বিমানে সূর্যদেবের অধিকার, রজনীদেবী, তারকামালার অধিকার থাকা পর্যন্ত মোহাম্মদীয়গণের অন্তরাকাশ হইতে এ মহাবিষাদ-নীলিমারেখা কখনোই বিলীন হইবে না-কখনোই সরিবে না।
