মস্হাব কাক্কা অলীদকে ধিক্কার দিয়া, ঘৃণা জন্মাইয়া, যুদ্ধে আহ্বান করিতেছেন, কিন্তু অলীদ গুপ্তভাবে থাকিয়া কী দেখিতেছে, কী চিন্তা করিতেছে, তাহা সেই জানে! তাহার সৈন্যগণের হাবভাবে তাহাকে আরো ব্যতিব্যস্ত হইতে হইল, চতুর্দিকে ভীষণ বিভীষিকাময় মূর্তি দেখিতে লাগিল। যুদ্ধে পরাস্ত হইতে হইবে, মদিনার পথ ছাড়িয়া দিতে হইবে, এখনই ছাড়িয়া দিতে হইবে,-না হয় বন্দিভাবে হানিফার পদানত হইতে হইবে, ইহাতে দুঃখ নাই,-অপমানের কথা নাই। কিন্তু আপন সৈন্য দ্বারা অপমানিত হওয়া বড়ই ঘৃণার কথা ও লজ্জার কারণ মনে করিয়া অলীদ বাধ্য হইয়া সশস্ত্রে মস্হাব কাক্কার সমুখীন হইল।
মস্হাব কাক্কা বলিলেন, “অলীদ! শত্রুসম্মুখে আসিতে, যুদ্ধার্থে রণক্ষেত্রে পদনিক্ষেপ করিতে, তোমার আর কী এত বিলম্ব শোভা পায়? যাহা হউক, আইস, অগ্রে তোমার বাহুবল পরীক্ষা করি। আমি তোমাকে অস্ত্রাঘাতে মারিব না-নিশ্চয় বলিতেছি, তোমার প্রতি মস্হাব কাক্কা কখনোই অস্ত্র নিক্ষেপ করিবে না।”
অলীদ দুটি চক্ষু পাকল করিয়া বলিল, “মহাবীরের দর্প দেখ! অস্ত্রাঘাতে মারিবেন না, কথার আঘাতে মারিবেন।”
“আরে পামর! কথা রাখ্, অস্ত্র র্ধ!”
“মস্হাব! তুমি এইমাত্র আসিয়াছ-এখনই যুদ্ধ? কে না বলিবে-যে দেখিবে সেই বলিবে, যে শুনিবে সেই বলিবে যে, দুর্গম পথশ্রান্তিতে কাতর ছিল, ক্ষণকালও বিশ্রাম করে নাই, যেমনই দেখা অমনই যুদ্ধ, কাজেই পরাস্ত। সেই আমার বিলম্বের কারণ। কিন্তু তুমি তাহা বুঝিলে না-তোমার ভালর জন্যই আমি এতক্ষণ আসি নাই।”
মস্হাব কাক্কা রোষে অধীর হইয়া, সিংহনাদে অলীদের দুই হস্ত দুই হস্তে ধরিয়া সজোরে অলীদ-অশ্বকে পদাঘাত করিলেন, অশ্ব বহু দূরে ছুঁড়িয়া পড়িল। অলীদ কাক্কার হস্তে রহিয়া গেল। মস্হাব অলীদকে লইয়া এক লম্ফে অশ্ব হইতে অবতরণ করিয়া মৃত্তিকায় দণ্ডায়মান হইলেন। বীরবর অলীদ যথাসাধ্য চেষ্টা করিয়াও কাক্কার হস্ত হইতে হস্ত ছাড়াইতে পারিল না।
মস্হাব বলিলেন, “এই তো প্রথম পরীক্ষা, দ্বিতীয় পরীক্ষাও দেখ।”
এই কথা বলিয়াই অলীদকে শূন্যে উঠাইয়া বলিতে লাগিলেন, “দেখ্ কাফের দেখ্ কাহার কথা সত্য,-আমি কথার আঘাতে মারিতে পারি, কি আছাড় মারিয়া মারিতে পারি!” চতুর্দিক হইতে তখন মহা গোলযোগ হইয়া উঠিল। সৈন্যাধ্যক্ষের প্রাণ যায়, দামেস্করাজ এজিদের সেনাপতি শূন্যে চক্রাকারে ঘুরিয়া ঘুরিয়া প্রাণ হারায়,-বড়ই লজ্জার কথা! অলীদসৈন্য মসহাবের দিকে র্মা র্মা শব্দে মহারোষে অসি নিষ্কোষিত করিয়া আসিতে লাগিল। এদিকে মোহাম্মদ হানিফা ঐ গোলযোগের কারণ জানিতে আসিয়া দেখিলেন, অলীদ কাক্কার হস্তে উত্তোলিত হইয়া চক্রাকারে ঘুরিতেছে, আর রক্ষা নাই।
মোহাম্মদ হানিফা উচ্চৈঃস্বরে বলিতে লাগিলেন, “ভাই মস্হাব, আমার কথা রাখ। ভাই! আমার দিকে একবার চাহিয়া দেখ, কথা রাখ। ভাই, ক্ষান্ত হও। অলীদকে প্রাণে মারিয়ো না, মারিয়ো না। আমি বারণ করিতেছি, উহাকে প্রাণে মারিয়ো না।”
মস্হাব বলিলেন, “আপনার আজ্ঞা শিরোধার্য, কিন্তু আমি ইহাকে একটি আছাড় না মারিয়া ছাড়িব না-তাহাতেই যদি উহার প্রাণ দেহপিঞ্জরে আর না থাকে, কি করিব? উহার প্রতি আমি অস্ত্রের আঘাত করিব না, একথা পূর্বেই বলিয়াছি। এজিদের সেনাপতির বীরত্ব দেখুন, অলীদের বাহুবল দেখুন।”
এই কথা বলিয়াই মস্হাব কাক্কা অলীদকে সজোরে বহুদূর শূন্য হইতে মাটিতে ফেলিয়া দিলেন। অলীদ চতুর্দিক অন্ধকার দেখিতে দেখিতে বিংশতি হস্ত ব্যবধানে ছুটিয়া ছিট্কিয়া পড়িল। ক্ষণকাল অচৈতন্য রহিয়া জগৎ অন্ধকার দেখিল। একটু চমক ভাঙ্গিলেই দক্ষিণ বামে পশ্চাতে চাহিয়া দেখিয়াই, উঠিতে উঠিতে, পড়িতে পড়িতে রণপ্রাঙ্গণ হইতে সভয়ে ফিরিয়া ফিরিয়া চাহিতে চাহিতে শিবিরাভিমুখে মহাবেগে প্রস্থান করিল। অলীদের সৈন্য এখন কাক্কার হস্ত হইতে প্রাণ বাঁচাইবার উপায় খুঁজিতে লাগিল। আর কি করিবে? শেষ পন্থা-পলায়ন।
মস্হাব কাক্কা বীরদর্পে বলিতে লাগিলেন, “আয় রে কাফেরগণ! আয়, মদিনার পথে বাধা দিতে আয়! এই মস্হাব চলিল।”
মস্হাব সমুদয় সৈন্য লইয়া অলীদের শিবির পশ্চাৎ করিয়া যাইতে লাগিলেন। কার সাধ্য মস্হাবকে বাধা দেয়? সে বীরকেশরী সম্মুখে আসিয়া দাঁড়ায়?
গাজী রহমান বলিলেন, “আজ মদিনায় প্রবেশ করিব না, এই যুদ্ধক্ষেত্রের প্রান্ত সীমাতেই থাকিব। সৈন্যগণ মহাক্লান্ত হইয়াছে! আরো কথা আছে; মদিনা প্রবেশের পূর্বে আমাদের কতক সৈন্য নগরের বহির্ভাগে, নগর-প্রবেশ-দ্বারে সর্বদা সজ্জিতভাবে অবস্থিতি করিব। দামেস্কের মন্ত্রী, সৈন্যাধ্যক্ষ, কাহাকেও বিশ্বাস করিতে নাই। ছল, চাতুরী, অধর্ম, প্রবঞ্চনা, প্রতারণা তাহাদের আয়ত্তাধীন-জাতিগত স্বভাব।”
মস্হাব কাক্কা সম্মত হইলেন, মোহাম্মদ হানিফাও গাজী রহমানের কথা গ্রাহ্য করিলেন। সৈন্যগণ অলীদের শিবির লুটপাট করিয়া, খাদ্যসামগ্রী অস্ত্রশস্ত্র যাহা পাইল লইয়া জয় জয় রবে প্রান্তর কাঁপাইয়া, বীরমদে পদনিক্ষেপ করিতে করিতে চলিল!
মস্হাব কাক্কা মোহাম্মদ হানিফাকে বলিলেন, “হজরত! আর একটি কথা। তুরস্ক ও তোগান রাজ্যের ভূপতিদ্বয় আমার সঙ্গে আছেন, তাঁহারা পথে সীমারহস্তে যেরূপ বিধ্বস্ত ও বিপদগ্রস্ত হইয়াছিলেন, তাহার বিস্তারিত বিবরণ পরে বলিব। এক্ষণে একটি শুভ সংবাদ অগ্রে না দিয়া আমি স্থির থাকিতে পারিতেছি না। সেই পাপাত্মা সীমারকে আমি বন্দি করিয়া আনিয়াছি।”
