আগন্তুক সৈন্যদল ক্রমেই নিকটে আসিতে লাগিল। অলীদের মনে ধ্রুব বিশ্বাস যে দামেস্ক হইতে মারওয়ান তাহার সাহায্যে আসিতেছে।
অলীদ সদর্পে বলিতে লাগিল, “বন্দি! বন্দি! মোহাম্মদ হানিফা আজ সৈন্যসহ নিশ্চয় বন্দি। আর কী সন্দেহ আছে? আমারই নির্বাচিত চিহ্ন সংযুক্ত নূতন সাজ। দামেস্কের সৈন্য না হইয়া যায় না। বাজাও ডঙ্কা। বাজাও ভেরী! কিসের ভয়? সহস্র হানিফা হইলেও আজ অলীদ হস্তে পরাস্ত! সম্মুখে অস্ত্র, পশ্চাতে অস্ত্র, এতে কি রক্ষা আছে? কার সাধ্য? জগতে এমন কোন বীর নাই যে, সম্মুখ-পশ্চাৎ উভয় দিক্ রক্ষা করিয়া সমানভাবে শত্রু-সম্মুখীন হইতে পারে।”
মনের উল্লাসে উচ্চৈঃস্বরে বলিতে লাগিল, “মোহাম্মদ হানিফা! তুমি কোথায়? তোমার চক্ষু কোন্ দিকে? তুমি কায়মনে যে ঈশ্বরের বল করিয়া যুদ্ধে অগ্রসর হইয়াছ, সেই ঈশ্বরের দোহাই,-একবার পশ্চাৎ দিকে চাহিয়া দেখ। এখনো অলীদ-সম্মুখে অস্ত্র রাখিলে না? এখনো যুদ্ধে বিরত হইলে না? একবার পশ্চাতে চাহিয়া দেখ। তোমার জীবন প্রদীপ এখনই নির্বাণ হইবে। তোমার বুদ্ধিমান মন্ত্রী গাজী রহমানের জীবন এখনই শেষ হইবে। সম্মুখে অলীদ, পশ্চাতে মারওয়ান। এখনো যুদ্ধ? রাখ তরবারি-কর পরাজয় স্বীকার-মঙ্গল হইবে। ক্ষান্ত হও,-ক্ষান্ত হও; আত্মসমর্পণের এ-ই উপযুক্ত সময়। বীরের মান বীরেই রক্ষা করিয়া থাকে। আমি দিব্যচক্ষে দেখিতেছি, তোমাদের সকলের পরমায়ু শেষ হইয়াছে, আর অধিক বিলম্ব নাই। আবার বলি, পশ্চাতে চাহিয়া দেখ,-মহারাজ এজিদের কারুকার্যখচিত উড্ডীয়মান নিশান প্রতি চাহিয়া দেখ।”
গাজী রহমান এ পর্যন্ত নিশান প্রতি লক্ষ্য করেন নাই। অলীদের কথায় নিশান প্রতি চাহিয়াই ঈশ্বরকে শতশত ধন্যবাদ দিলেন। এদিকে অলীদও ভয়ে বিহ্বলপ্রায় হইয়া, বেগে অশ্ব ছুটাইয়া শিবিরাভিমুখে চলিয়া গেল।
মোহাম্মদ হানিফা গাজী রহমানকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “ইহার কারণ কী? নিশান দেখিয়া অলীদের মুখ ভারি হইল কেন? ওরূপ দ্রুতবেগে হঠাৎ শিবিরেই-বা চলিয়া গেল কেন?”
“বাদশাহ নামদার! অলীদের বাজনার ধুমে আমি আমার চিন্তাকে ভ্রমপূর্ণ বিপথে চালনা করিয়াছিলাম। অনিশ্চিত, সন্দিহান অনুমানের প্রতি নির্ভর করিয়া যে কার্য করে, তাহাকে বাতুল ভিন্ন আর কী বলিব? আরো অধিক আশ্চর্য যে, একজন সেনাপতি এইরূপ করিয়াছেন! অলীদ যে কি প্রকৃতির সেনাপতি, তাহা আমি এখনো বুঝিতে পারি নাই। কী গুণে এতাধিক সৈন্যের অধিনায়ক হইয়া প্রকাশ্য যুদ্ধে অগ্রসর হইয়াছে তাহাও এক্ষণে বুঝিতে পারিতেছি না। অলীদের প্রতি আমার কিছুমাত্র ভক্তি নাই। আমি আরো আশ্চর্য হইতেছি যে, ইহারা কী প্রকারে মহাবীর হাসান-হোসেনের সহিত যুদ্ধ করিয়াছে, একটু অপেক্ষা করুন, সকলই দেখিতে পাইবেন।”
“আমারও সন্দেহ হইতেছে। ঐ সকল চিহ্নিত পতাকা কখনোই এজিদের নহে।”
“বাদশাহ নামদার! অলীদ আমাকে ভ্রম-কূপে ডুবাইয়াছে; এখন আর কিছুই বলিব না,-সকলই ঈশ্বরের মহিমা।”
এদিকে রণপ্রাঙ্গণে অলীদপক্ষীয় সৈন্য আর তিষ্ঠিতে পারিতেছে না। বাতাহত কদলীবৃক্ষের ন্যায় ভূমিসাৎ হইতেছে। এক দল হত হইলেই যে অন্য দল আসিয়া শূন্য স্থান পূর্ণ করিতেছিল, তাহা আর হইতেছে না। যাহারা সমরে লিপ্ত ছিল, তাহারাই ক্রমে ক্ষয় পাইতে লাগিল।
সন্দেহ দূর হইল। মোহাম্মদ হানিফার সৈন্যগণ জাতীয় পতাকা স্পষ্টভাবে দেখিয়া, সজোরে ঈশ্বরের নাম উচ্চারণ করিয়া, প্রান্তর সহিত রণস্থল কাঁপাইয়া তুলিল। দেখিতে দেখিতে মস্হাব কাক্কা সৈন্যসহ আসিয়া হানিফার সহিত যোগ দিলেন। মস্হাব কাক্কা হানিফার পদচুম্বন করিয়া বলিলেন-
“বিলম্বের কারণ পরে বলিব, এখন কী আজ্ঞা?”
মোহাম্মদ হানিফা বলিলেন, “ভাই! পরে শুনিব,-কথা পরে শুনিব। এখন ধর তরবারি-মার কাফের-তাড়াও অলীদ! মনের কথা কহিতে, দুঃখের কান্না কান্দিতে অনেক সময় পাইব। সে সকল কথা মনেই গাঁথা আছে। এখন প্রথম কার্য,-মদিনায় প্রবেশ। তোমার তরবারি এদিকে চলিতে থাকুক, আমি অন্যদিকে চলিলাম।”
হানিফা অসি উঠাইলেন। মস্হাব কাক্কাও ঈশ্বরের নাম করিয়া শত্রুনিপাতে অসি নিষ্কোষিত করিলেন। উভয়ের সম্মিলনে এক অপূর্ব নবভাবের আবির্ভাব হইল। উভয় দলের বাজনা একত্র বাজিতে লাগিল, উভয় দলের সৈন্য মিলিয়া এক হইয়া চলিল,-অলীদের মনেও নানারূপ চিন্তার লহরী খেলিতে লাগিল; ‘মোহাম্মদ হানিফার সঙ্গেই জয়ের আশা ছিল না, তাহার উপর তত্তুল্য আর একটি বীর হঠাৎ উপস্থিত হইল-অস্ত্রও ধারণ করিল-আর রক্ষা নাই। কিছুতেই আজ রক্ষা নাই।’
অলীদ মহাসঙ্কটে পড়িল। কী করিবে, কিছুই স্থির করিতে পারিতেছে না। অনেকক্ষণ চিন্তার পর মনে মনে সাব্যস্ত করিল, ভাগ্যে যাহা থাকে হইবে, সহসা মস্হাব কাক্কার সম্মুখে যুদ্ধে যাইব না। দেখি মস্হাব কাক্কা কী করেন!
অলীদ গুপ্ত স্থানে বসিয়া দেখিতে লাগিল যে, হানিফা দক্ষিণ পার্শ্বে যাইয়া মদিনাগমন-পথ পরিষ্কার করিতেছেন, মস্হাব কাক্কা বাম পার্শ্বে (তাঁহারই দিকে) অস্ত্রচালনা করিয়া অগ্রসর হইতেছেন, আর বারবার অলীদ-নাম উচ্চারণ করিয়া তাঁহাকে যুদ্ধে আহ্বান করিতেছেন-এবং বলিতেছেন, “অলীদ! শীঘ্র বাহির হও,-শিবির হইতে শীঘ্র বাহির হও! তোমার বীরপণা দেখিতেই আজ ক্লান্ত, পথশ্রান্তভাবেই অস্ত্র ধরিয়াছি। আইস, আর বিলম্ব কি? অলীদ! অলীদ! আইস, আজ তোমাকে দেখিব! ঈশ্বরের দোহাই, তোমাকে আজ ভাল করিয়া দেখিব। তোমার বল, বিক্রম, সাহস সকলই দেখিব। যদি সময় পাই, তবে তোমার তরবারির তেজ, বর্শার ধার, তীরের লক্ষ্য, খঞ্জরের হাত, গদার আঘাত, সকলই দেখিব, ভয় কী? শত্রু যুদ্ধার্থী, তুমি শিবিরে? ছি ছি, বড় ঘৃণার কথা! ছি ছি অলীদ! তুমি না সেনাপতি? এজিদের বিশ্বাসী সেনাপতি!”
