এজিদ্ হাতের অস্ত্র ফেলিয়া বলিল, “সীমার বন্দি!!!”
মারওয়ান ক্ষণকাল অধোবদনে থাকিয়া বলিল, “মহারাজ! আমি বারবার বলিতেছি, সময় অতিসঙ্কট, মহাসঙ্কট! চারিদিকে বিপদ! যে আগুন জ্বলিয়া উঠিল, ইহা নির্বাণ করিয়া রক্ষা পাওয়া সহজ কথা নহে।” এজিদ্ বলিল, “জয়নাল! যাও, কয়েক দিনের জন্য জগতের মুখ দেখ। মারওয়ানের কথায় আরো কয়েক দিন বন্দিগৃহে বাস কর।”
জয়নাল আবেদীন বলিলেন, “ঈশ্বর রক্ষা না করিলে তোমার কী সাধ্য? মারওয়ানেরই-বা কী ক্ষমতা? আমি বলি, তুমি যাও। আজ হইতে তুমিও তোমার প্রাণের চিন্তা করিতে ভুলিয়ো না! তোমার সময় অতি নিকট। আমি কিছুদিন জগতের মুখ দেখিব, কি তুমি কিছুদিন দেখিবে, তাহার নিশ্চয় কী?”
এজিদ্ মহারোষে জয়নাল আবেদীনকে লক্ষ্য করিতে করিতে চলিয়া গেল। বন্দিগৃহে বন্দি আনীত হইলেন।
জয়নাল আবেদীনের চির-বিরহে আর আমাদিগকে কাঁদিতে হইল না। ঈশ্বরের মহিমা।
উদ্ধার পর্ব ১৫ প্রবাহ
এই তো সেই মদিনার নিকটবর্তী প্রান্তর। উভয় শিবিরে উচ্চ মঞ্চে রঞ্জিত মহানিশান উড়িতেছে, সমরাঙ্গণে সামরিক নিশান গগন ভেদ করিয়া বায়ুর সহিত ক্রীড়া করিতেছে-অস্ত্র অবিশ্রান্ত চলিতেছে-র্মা র্মা শব্দ হইতেছে। আজ ব্যূহ নাই-সৈন্যশ্রেণীর শ্রেণীভেদ নাই-অস্ত্র চালনায় পারিপাট্য নাই, আত্মপর ভাবিয়া আঘাত নাই,-মরিতেছে, মারিতেছে, আহত হইয়া ভূতলে পড়িতেছে, হু-হুঙ্কার বজ্রনাদে সমরাঙ্গণ কাঁপাইতেছে। আজ উভয় দলের সৈন্য-শোণিত রণভূমি রঞ্জিত হইতেছে। জয়-পরাজয় কাহারো ভাগ্যে ঘটিতেছে না; কিন্তু অলীদ সৈন্য অধিক পরিমাণে মারা পড়িতেছে। আজ মহাসংগ্রাম। উভয় দলে আজ বিষম সমর, দুর্ধর্ষ রণ। সৈন্যগণের চক্ষু ঊর্ধ্বে উঠিয়াছে, মুখাকৃতি অতি কদর্য বিকৃত ভাব ধারণ করিয়াছে;-রোষে, ক্রোধে যেন উন্মত্ত হইয়া চক্ষুতারা ফুটিয়া বাহির হইবার উপক্রম হইয়াছে;-মুখব্যাদানে জিহ্বা, তালু, কণ্ঠ, কণ্ঠনালী পর্যন্ত দৃষ্ট হইতেছে। অস্ত্রাঘাতে যুদ্ধপ্রবৃত্তি নিবৃত্তি হইবে না-মনের তৃপ্তি জন্মিবে না বলিয়াই যেন নখাঘাত, দন্তাঘাতে যুদ্ধপ্রবৃত্তি নিবৃত্তি হইবে না-মনের তৃপ্তি জন্মিবে না বলিয়াই যেন নখাঘাত, দন্তাঘাত জন্য ব্যাকুল রহিয়াছে! প্রান্তরময় সৈন্য, প্রান্তরময় যুদ্ধ। হানিফা আজ স্বয়ং সৈন্যগণের পৃষ্ঠপোষক ও রক্ষক, গাজী রহমান পরিচালক। মহাবীর অলীদও আজ মহাবিক্রম প্রকাশ করিতেছে। এক প্রভাত হইতে অন্য প্রভাত গত হইয়াছে, এখন সূর্যদেব মধ্যগগনে,-কোন পক্ষই পরাজয় স্বীকার করিতেছে না-যুদ্ধেরও ইতি হইতেছে না। অলীদের প্রতিজ্ঞা,-আজ হানিফার শিরচ্ছেদ করিয়া জগতে মহাকীর্তি স্থাপন করিব; হানিফারও চেষ্টা যে, আজ মদিনার পথ পরিষ্কার না-করিয়া ছাড়িব না। হয় অলীদহস্তে জীবন বিসর্জন, না হয় সসৈন্যে মদিনায় প্রবেশ।
গাজী রহমান বলিলেন, “সৈন্যগণ মহাক্লান্ত হইয়াছে। কী করিবে? এত মারিয়াও যখন শেষ করিতে পারিতেছে না, তখন আর উপায় কী?
মোহাম্মদ হানিফা অশ্ব-বল্গা ফিরাইয়া বলিলেন, “আজ উভয় দলের সৈন্য যে প্রকার ক্ষয় হইতেছে, ইহাতে মহাবিপদের আশঙ্কা দেখিতেছি। এখন না নিবারণের উপায় আছে, না উপদেশের সময় আছে, না কথা বলিবার অবসর আছে! অলীদের সমস্ত সৈন্য শেষ হইলেও অলীদ কখনোই পরাভব স্বীকার করিবে না, আমরাও পরাস্ত না করিয়া ছাড়িব না!”
এই প্রকার কথা হইতেছে, এমন সময়ে অলীদ-দলে আনন্দের বাজনা বাজিয়া উঠিল। ওত্বে অলীদ তাহার নূতন সৈনিকদলের ব্যবহার জন্য যে সাজ প্রস্তুত করিয়াছিল, ঠিক সেইরূপ সাজে সজ্জিত সেনাগণ মস্হাব কাক্কার সঙ্গে আসিতেছিল। দূর হইতে তাহাদিগকে দেখিয়া আপন সেনা মনে করিয়া অলীদ মনের আনন্দে বাজনা বাজাইতে আদেশ করিয়াছিল। গাজী রহমানের কর্ণে হঠাৎ ঐ বাজনার রোল মহাবিপজ্জনক ও বিষম বোধ হইতে লাগিল। কারণ উভয় দলই প্রমত্ত কুঞ্জর সম যুদ্ধে মত্ত, কেহই পরাজয় স্বীকার করে নাই; এ সময়ে সন্তোষের বাজনা কেন? গাজী রহমানের বিশাল চক্ষু মদিনা-প্রান্তরের চতুর্দিকে ঘুরিতে লাগিল, চিন্তাস্রোত খরতর বেগে বহিতে লাগিল,-পূর্ব দিকে দৃষ্টি পড়িতেই শরীর রোমাঞ্চিত হইল। যুদ্ধ জয়ের আশা, মদিনা-প্রবেশের আশা,-জয়নাল উদ্ধারের আশা অন্তর হইতে একেবারে সরিয়া গেল।
মোহাম্মদ হানিফাকে বলিলেন, “বাদশাহ নামদার! ঈশ্বরের অভিপ্রেত কার্যে বিপর্যয় ঘটাইতে মানুষের ক্ষমতা নাই। সৈন্যশ্রেণী যে প্রকারে চালনা করিয়াছিলাম, সৈন্যগণও যে বীর বিক্রমে আক্রমণ করিয়াছিল, অতি অল্প সময়মধ্যেই অলীদ বাধ্য হইয়া পরাভব স্বীকারে মদিনার পথ ছাড়িয়া দিত; আর যদি পথ না ছাড়িত, গাজী রহমানের হস্তে নিশ্চয় আজ বন্দি হইত। কিন্তু কী করি? ঐ দেখুন, উহারা যখন আমাদের পশ্চাদ্দিক হইতে আসিতেছে, তখন রক্ষার আর উপায় নাই। সম্মুখে, পশ্চাতে, উভয় দিকে শত্রুসেনা, আর নিষ্কৃতি কোথা? নিশ্চয় বন্দি! আজ সৈন্যসহ আমরা বন্দি!!”
মোহাম্মদ হানিফা বলিলেন, “বহু অশ্বারোহী সৈন্য বটে, পদাতিক সৈন্যও আছে। উহারা যেরূপ বীরদাপে আসিতেছে, শত্রুসেনা হইলে মহাবিপদ, তাহাতে আর সন্দেহ নাই। কিন্তু সন্দেহ অনেক। বাজনাই কী তাহার নিশ্চয়তার প্রমাণ? অথবা ওত্বে অলীদ কি এমনই অবোধ যে না জানিয়া, আপন-পর না ভাবিয়া, আনন্দ-বাজনা বাজাইয়াছে? নিশ্চয় ইহারা দামেস্কের সৈন্য!”
