সৈন্যগণ গমনে ক্ষান্ত দিয়া দণ্ডায়মান হইল। ইরাক-অধিপতি সৈন্যগণের সম্মুখে শ্রেণীভেদ করিয়া বিবরণ জিজ্ঞাসু হইলে, ভুক্তভোগী সৈন্যগণ তাঁহার সম্মুখে রাত্রের ঘটনা সমুদয় বিবৃত করিল। আরো বলিল, “বাদশাহ নামদার! ঐ যে জ্বলন্ত হুতাশন দেখিতেছেন, উহাই শিবিরের ভস্মাবশেষ; এখন পর্যন্ত খাকে পরিণত হয় নাই! কত সৈন্য, কত উষ্ট্র, কত আহারীয় দ্রব্য, কত অর্থ, কত বীর, যে ঐ মহা-অগ্নির উদরস্থ হইয়াছে, তাহার অন্ত নাই। তোগান এবং তুর্কীর ভূপতিদ্বয় মোহাম্মদ হানিফার সাহায্যে মদিনায় যাইতেছিলেন; এজিদ্ সেনাপতি সীমার রাত্রে দস্যুতা করিয়া মহা অনর্থ ঘটাইয়াছে, ভূপতিদ্বয়কে বন্দি করিয়া ঐ শিবিরে লইয়া গিয়াছে, এখন দামেস্কে লইয়া যাইবে। গতকল্য প্রাতঃকাল হইতে দিবা দ্বিপ্রহর পর্যন্ত আমরা কেবল তীরের লড়াই করিয়াছিলাম। বিপক্ষদিগকে এক পদও অগ্রসর হইতে দিয়াছিলাম না। শেষে সন্ধির প্রস্তাব করিয়া ঐদিনের জন্য যুদ্ধ বন্ধ রাখিল, তাহার পর রাত্রে এই ঘটনা। সীমার ভয়ানক চতুর। বাদশাহ নামদার! মিথ্যা সন্ধির ভাণ করিয়া শেষে এই সর্বনাশ করিয়াছে।”
মস্হাব বলিলেন, “তোমরা বলিতে পার, এ কোন্ সীমার?”
“বাদশাহ নামদার! গতকল্য ইহার পরিচয় পাওয়া গিয়াছে। এই সীমারই স্বহস্তে ইমাম হোসেনের শির খঞ্জর দ্বারা খণ্ডিত করিয়াছিল। এই সীমারই ইমাম হোসেনের বুকের উপর বসিয়া দুই হাতে খঞ্জর চালাইয়া মহাবীর নামে খ্যাত হইয়াছে, লক্ষ টাকা পুরস্কারও পাইয়াছে। পাষাণপ্রাণ না হইলে এত লোককে আগুনে পোড়াইয়া মারিতে পারিত কি?”
ইরাক-ভূপতি চক্ষু আরক্তিম করিয়া, “উহু! তুমি সেই সীমার! হায়! তুমি সেই!” এই কথা বলিয়া অশ্ব ফিরাইলেন। সৈন্যগণও প্রভুর পশ্চাৎ পশ্চাৎ অশ্ব চালাইল। অশ্বপদ নিক্ষিপ্ত ধুলারাশিতে চতুষ্পার্শ্ব অন্ধকার হইয়া গেল! প্রবল ঝঞ্ঝাবাতের ন্যায় মস্হাব কাক্কা সীমারশিবির আক্রমণ করিলেন। অশ্বের দাপট, অস্ত্রের চাক্চিক্য দেখিয়া সীমার চতুর্দিক অন্ধকার দেখিতে লাগিল। আজ নিস্তার নাই। কাক্কা স্বয়ং অসি ধরিয়াছেন, আর রক্ষা নাই।
মস্হাব বলিতে লাগিলেন, “সীমার! আমি তোমাকে বাল্যকাল হইতে চিনি, তুমিও আমাকে সেই সময় হইতে বিশেষরূপে জান। আর বিলম্ব কেন? আইস, দেখি তোমার দক্ষিণ হস্তে কত বল? (ক্রোধে অধীর হইয়া) আয় পামর! দেখি তোর খঞ্জরের কত তেজ!”
সীমার মস্হাব কাক্কার বলবিক্রম পূর্ব হইতেই অবগত ছিল। তাঁহার সহিত সম্মুখ সমরাশা দূরে থাকুক, ভয়ে কাঁপিতে লাগিল। কী বলিবে, কাহাকে কী আজ্ঞা করিবে, কিছুই স্থির করিতে পারিল না।
মস্হাব কাক্কা সৈন্যগণকে বলিলেন, “সেই সীমার! এ সেই সীমার! ইহার মস্তক দেহ বিচ্ছিন্ন করিতে আমার জীবনপণ। এ সেই পাপিষ্ঠ, এ সেই নরাধম সীমার! আইস, আমার সঙ্গে আইস, বিষম বিক্রমে চতুর্দিক হইতে পামরের শিবির আক্রমণ করি।” কাক্কা অশ্বে কশাঘাত করিতেই অশ্বারোহী সৈন্যগণ ঘোরনিনাদে সিংহবিক্রমে সীমার-শিবিরোপরি যাইয়া পড়িল। আজ সীমারের মহা সঙ্কট সময় উপস্থিত। আত্মরক্ষার অনেক উপায় উদ্ভাবন করিল, কিন্তু কিছুতেই কিছু হইল না, কিছুই কার্যে আসিল না। পরাভব স্বীকারের চিহ্ন দেখাইল, কোন ফল হইল না; কাক্কা সেদিকে দৃক্পাতও করিলেন না, কেবল মুখে বলিলেন, “সীমার! তোর সঙ্গে যুদ্ধের রীতি কি? তোর সঙ্গে সন্ধি কি? তুই কোথায়? শীঘ্র আসিয়া আমার তরবারির নীচে স্কন্ধ পাতিয়া দে। তোকে পাইলেই আমি যুদ্ধে ক্ষান্ত হই, তোর সৈন্যগণের প্রাণবধ হইতে বিরত হই। তুই কেন গোপনভাবে আছিস্? তুই নিশ্চয়ই জানিস, আজ তোর নিস্তার নাই! এই অশ্বচক্রমধ্যে তোর প্রাণ,-তোর সৈন্যসামন্ত সকলের প্রাণ বাঁধা রহিয়াছে। একটি প্রাণীও এ চক্র ভেদ করিয়া যাইতে পারিবে না। নিশ্চয় জানিস্, তোদের সকলের জীবন আমাদের তরবারির তেজের উপর নির্ভর করিতেছে। তুই সেই সীমার! আবার আজকাল মহাবীর সীমার নামে পরিচিত; শুনিলাম, তুই নাকি এজিদের সেনাপতি? তোর আত্মগোপন কি শোভা পায়? ছি ছি, সেনাপতির নাম ডুবাইলি! মহাবীর নামে কলঙ্ক রটাইলি! তোর অধীনস্থ সৈন্যগণের নিকট অপদস্থ হইলি! ভীরু কাপুরুষের পরিচয় প্রদান করিলি! নিজেও মজিলি, অপরকেও মজাইলি! তোর শুভ্র নিশানে ভুলিব না; তুই গতকল্য যাহা করিয়াছিস, তাহাতে সন্ধির প্রস্তাব আর কর্ণে করিব না। তোর কোন প্রার্থনাই গ্রাহ্য করিব না! তুই যে খেলা খেলিয়াছিস, যে আগুন জ্বালিয়াছিস, তাহার ফল চক্ষের উপরেই রহিয়াছে,-এখনো জ্বলিতেছে, এখনো পুড়িতেছে। তুই অনেক প্রকারের খেলা খেলিয়াছিস্। কী ধূর্ত! পরকালের পথও একেবারে নিষ্কণ্টক করিয়া রাখিয়াছিস্! তোর চিন্তা কী? তোর মরণে ভয় কী? তোগান, তুর্কী ভূপতিদ্বয়ের যে দশা ঘটিয়াছে, ইহা তাঁহাদের ভ্রম নহে। বিশ্বাস না হইলে বিশ্বাসঘাতকতা করিবার সাধ্য কার? আমি নিশ্চয় বলিতেছি, তোর জীবন-প্রদীপ নির্বাণ না করিলে আমার অন্তরের জ্বালা নিবারণ হইবে না!”
কাক্কা কথা বলিতেছেন, এদিকে সীমারের সৈন্যদল বাতাহত কদলীর ন্যায় কাক্কার সৈন্যহস্তে পতিত হইতেছে, কথাটি বলিবার অবসর পাইতেছে না, নির্বাক রক্তমাখা হইয়া ভূতলে পড়িতেছে! সীমার কোনও চাতুরী করিয়া আর উদ্ধারের পথ আবিষ্কার করিতে পারিল না। বহু চিন্তার পর স্থির হইল যে, “ভূপতিদ্বয়কে ছাড়িয়া দিলেই বোধ হয় মস্হাব কাক্কা যুদ্ধে ক্ষান্ত দিবেন। বাঁচিলে তো পদোন্নতি? আজ এই কালান্তক কালের হস্ত হইতে রক্ষা পাইলে তো অন্য আশা? অদৃষ্টে যাহাই থাকুক, ঘটনাস্রোত যেদিকে যায়, সেই দিকেই অঙ্গ ভাসাইব; এক্ষণে ভূপতিদ্বয়কে ছাড়িয়া দেওয়াই যুক্তিসঙ্গত।”
