সীমার ভূপতিদ্বয়কে নিষ্কৃতি দিল। তোগান এবং তুর্কীর ভূপতিদ্বয়কে দেখিয়া মস্হাব কাক্কা সাদরে এবং মিষ্ট সম্ভাষণে বলিলেন, “ঈশ্বর আপনাদিগকে রক্ষা করিয়াছেন, আর চিন্তা নাই। সৈন্যসামন্ত, আহারীয় দ্রব্য, অর্থ ইত্যাদি যাহা ভস্মীভূত হইয়াছে, সে জন্য দুঃখ নাই। বিপদগ্রস্ত না হইলে নিরাপদের সুখ কখনোই ভোগ করা যায় না; দুঃখভোগ না করিলে সুখের স্বাদ পাওয়া যায় না। ভ্রাতাগণ! কথা কহিবার সময় অনেক পাইব, কিন্তু সীমার হাতছাড়া হইলে আর পাইব না। আপনারা আমার সাহায্যার্থে অস্ত্র ধারণ করুন, ঐ অশ্ব সজ্জিত আছে, অস্ত্রের অভাব নাই। যে অস্ত্র লইতে ইচ্ছা করেন, রক্ষীকে আদেশ করিলেই সে তাহা যোগাইবে; বিলম্বের সময় নহে, শীঘ্র সজ্জিত হইয়া আমায় সাহায্য করুন, যুদ্ধে ব্যাপৃত হউন। দেখি, সীমার যায় কোথা!”
সীমারের সেনাগণ সেনাপতির কাপুরুষতা দেখিয়া বলিয়া উঠিল, “ছি! ছি! আমরা কাহার অধীনতা স্বীকার করিয়াছি? এমন ভীরুস্বভাব নীচমনার আজ্ঞাবহ হইয়া সমরসাজে আসিয়াছি? ছি! ছি! এমন সেনাপতি তো কখন দেখি নাই! বিনাযুদ্ধে সৈন্যক্ষয় করিতেছে। কি কাপুরুষ! যুদ্ধ করিবার আজ্ঞাও মুখ হইতে বহির্গত হইতেছে না। ছি! ছি!-এমন যোদ্ধা তো জগতে দেখি নাই! ধিক্ আমাদিগকে! এমন ভীরুস্বভাব সেনাপতির অধীনে আর থাকিব না! চল, ভ্রাতাগণ! চল, ঐ বীর-কেশরীর আজ্ঞাবহ হইয়া প্রাণ রক্ষা করি, যদি বল, আমাদিগকে তাহারা বিশ্বাস করিবে না; বিশ্বাস না করুক আগে-পাছে উহাদের হাতেই মরণ-নিশ্চয়ই মরণ। চল, ঐ মহাবীর মস্হাব কাক্কার পদানত হই, অদৃষ্টে যাহা থাকে হইবে।”
সীমার-সৈন্যগণ “জয় মোহাম্মদ হানিফা! জয় মোহাম্মদ হানিফা!” মুখে উচ্চারণ করিয়া বিপক্ষদল সম্মুখে দণ্ডায়মান হইল এবং তরবারি আদি সমুদয় অস্ত্র তাহাদের সম্মুখে রাখিয়া দিয়া আত্মসমর্পণ করিল। মহাবীর মস্হাব তাহাদিগকে অভয়দানে আশ্বস্ত করিয়া সাদরে গ্রহণ করিলেন কিন্তু অস্ত্র লইতে দিলেন না।
সীমার অর্থলোভ দেখাইয়া, পদোন্নতি আশা দিয়া, অর্থে বশীভূত করিয়া, যে সকল সৈন্য ও সৈন্যাধ্যক্ষকে নিজ শিবিরে আনাইয়াছিল, তাহারা বলিতে লাগিল, “আমরা যে ব্যবহার করিয়াছি, সীমারের কুহকে পড়িয়া যে কুকাণ্ড করিয়াছি, ইহার প্রতিফল অবশ্যই পাইতে হইবে! কী ভ্রমে পড়িয়া এই কুকার্যে যোগ দিয়াছিলাম। এ পাপের প্রায়শ্চিত্ত না হইয়া যায় না,-হওয়াই উচিত। কিন্তু এখন কথা এই যে, সেনাপতি মহাশয় নিজ সৈন্যদিগকে স্ববশে রাখিতে যখন অক্ষম, আমাদের দশা কী হইবে, অতি অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা কাক্কার হস্তে ধরা পড়িব। কোন দিক হইতেই আর জীবনের আশা নাই। এ অবস্থায় আর বিলম্ব করা উচিত নহে। কোন দিক হইতেই আমাদের জীবনের আশা নাই। আর বিলম্ব করিব না; ভাই সকল! যত সত্বর হয়, মহাবীর মস্হাব কাক্কার হস্তে আত্মসমর্পণ করিব কিন্তু সেনাপতি মহাশয়কে রাখিয়া যাইব না। শেষে ভবিতব্যে যাহা থাকে, হইবে। আমরাই বিখ্যাত যোদ্ধা, আমাদের এ কলঙ্ক-কালিমা-রেখা জগতে চিরকাল সমভাবে আঁকা থাকিবে। মনে হইলেই বলিবে, তুর্কী সৈন্যের সৈন্যাধ্যক্ষ অর্থলোভে বিশ্বাসঘাতকতার কার্য করিয়া সর্বনাশ করিয়াছে। ভাই সকল! তাহাতেই বলি, কথার শেষে আর একটি কথা সংলগ্ন করিয়া রাখিয়া যাই,-সীমার! সীমার! সীমার!”
সীমার-শিবির মধ্য হইতে ঘোর রবে-“জয় ইরাক-অধিপতি! জয় মোহাম্মদ হানিফা” রব হইতে লাগিল। মুহূর্তমধ্যে সীমারের হস্তপদ বন্ধন করিয়া রণপ্রাঙ্গণে মস্হাব কাক্কার সম্মুখে রাখিয়া করজোড়ে বলিতে লাগিল, “আমরা অপরাধী, দণ্ডবিধান করুন! বাদশাহ নামদার! সেনাপতি মহাশয়কে বাঁধিয়া আনিয়াছি, গ্রহণ করুন।”
মস্হাব কাক্কা, প্রথমে সীমারের চাতুরী মনে করিয়া, দ্রুতহস্তে অসি চালনে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন। পরে আমূল বৃত্তান্ত শুনিয়া বলিলেন, “সৈন্যগণ তোমরাই বাহাদুর, তোমরাই সীমারের রক্ষক, তোমরাই সীমারকে বন্দিভাবে লইয়া আমার সহিত মদিনায় চল। মোহাম্মদ হানিফার সম্মুখে তোমাদের এবং সীমারের বিচার হইবে।”
এদিকে কাক্কা সৈন্যগণকে গোপনে আজ্ঞা করিলেন, “বিদ্রোহী সৈন্য ও সীমারকে কৌশলে মদিনায় লইতে হইবে; সাবধান! উহাদের একটি প্রাণীও যেন হাতছাড়া না হয়। বিশেষ, সীমার বড় ধূর্ত।” এই আদেশ করিয়া মস্হাব কাক্কা মদিনাভিমুখে যাত্রা করিলেন।
জগদীশ! তোমার মহিমার অন্ত নাই। কাল কি করিলে! আবার রাত্রে কী ঘটাইলে! প্রভাতেই-বা কী দেখাইলে! আবার এখনই-বা কি কৌশল খাটাইয়া কি খেলা খেলাইলে! ধন্য তোমার মহিমা! ধন্য তোমার কারিগরি! যে ফণীর দ্বারা দংশন করাইলে, সেই বিষধর ফণীর বিষই ঔষধ করিয়া নির্বিষ করিয়া দিলে! ধন্য তোমার মহিমা! ধন্য তোমার লীলা!
যাও সীমার, মদিনায় যাও। তোমার বাক্য সফল। আর ও-হাতে লৌহ-অস্ত্র ধরিতে হইবে না। যাও, মদিনায় যাও! মদিনায় গিয়া তোমার কৃতকার্যের ফলভোগ কর! সেখানে অনেক দেখিবে;-সে প্রান্তরে অনেক দেখিতে পাইবে। তোমার প্রাণ-প্রতিমা প্রিয়সখা ওত্বে অলীদকে দেখিতে পাইবে। অশ্ব, শিবির, অস্ত্র, যুদ্ধ, যোদ্ধা, সমরাঙ্গণ-সকলই দেখিতে পাইবে; কিন্তু তুমি পরহস্তে থাকিবে। সীমার! একবার মনে করিয়ো, সীমার! ফোরাতকূলের ঘটনা একবার মনে করিয়ো। আজরের কথা মনে করিয়ো। তুমি জগৎ কাঁদাইয়াছ; বন, উপবন, পর্বত, গিরিগুহা, গগন, নক্ষত্র, চন্দ্র, সূর্য, বায়ু ভেদ করিয়া চতুর্দিক হইতে যে হৃদয়-বিদারক শব্দ উত্তোলন করাইয়াছ, সে কথাটাও একবার মনে করিয়ো। এই সেদিনের কথা! হাতে-হাতেই এই ফল।-ইহাতে আর আশা কী? এ নশ্বর জীবনে, এ অস্থায়ী জগতে আর আশা কী? সীমার! প্রাতে তোমার মনে যে ভাবনা ছিল, এইক্ষণে তাহার কী কিছু আছে? বল তো মানুষের সাধ্য কী? বাহুবল, অর্থবল লইয়া মূর্খেরাই দর্প করে। তুমি না দামেস্কের অভিমুখে মহাহর্ষে যাত্রা করিয়াছিলে? সুখসময়ে সুযাত্রার চিহ্নস্বরূপ কত পতাকাই না উড়াইয়াছিলে? কত বাজনাই-না বাজাইয়াছিলে? দেখ দেখি, মুহূর্তমধ্যে কী ঘটিয়া গেল! ভবিষ্যতগর্ভে যে কি নিহিত আছে, তাহা জানিবার কাহারো সাধ্য নাই। যাও সীমার, মদিনায় যাও, তোমার কৃতকার্যের ফল ভোগ কর।
উদ্ধার পর্ব ১৪ প্রবাহ
হায়! হায়! এ আবার কী? এ দৃশ্য কেন চক্ষে পড়িল? উহু! কী ভয়ানক ব্যাপার। উহু! কী নিদারুণ কথা! এ প্রবাহ না লিখিলে কী “উদ্ধার-পর্ব” অসম্পূর্ণ থাকিত, না বিষাদ-সিন্ধুর কোন তরঙ্গের হীনতা জন্মিত? বৃদ্ধি নাই, তাই সীমারের বন্ধনে মনে মনে একটু সুখী হইয়াছিলাম। কিন্তু এখন যে প্রাণ যায়! এ বিষাদ-প্রবাহে এখন যে প্রাণ যায়! হায়! হায়! এ সিন্ধুমধ্যে কি মহাশোকের কল্লোলধ্বনি ভিন্ন আনন্দ হিল্লোলের সামান্য ভাবও থাকিবে না; হায় রে কৃপাণ! আবরণবিহীন কৃপাণ!! এজিদের হস্তে কৃপাণ!!! সম্মুখে মদিনার ভাবী রাজা, ঊর্ধ্বদৃষ্টে দণ্ডায়মান। তিন পার্শ্বে সজ্জিত প্রহরী,-এক পার্শ্বে প্রহরী নাই। হাসনেবানু, সাহারাবানু, জয়নাব প্রভৃতির দৃষ্টির বাধা না জন্মে-জয়নালের শিরচ্ছেদন স্বচ্ছন্দে তাঁহাদের চক্ষে পড়ে, সেই উদ্দেশ্যেই বন্দিগৃহের সম্মুখে বধ্যভূমি এবং সেই দিক প্রহরীশূন্য! সন্তানের মস্তক কী প্রকারে ধরায় লুণ্ঠিত হয়, তাহাই মাতাকে দেখাইবার জন্য সে দিক প্রহরীশূন্য! এজিদ্ অসিহস্তে জয়নাল সম্মুখে দণ্ডায়মান।-মারওয়ান নীরব, পুরবাসিগণ নীরব, দর্শকগণ ম্লানমুখে নীরব। এ ঘটনা কেহ ইচ্ছা করিয়া দেখিতে আসে নাই। প্রহরিগণ বলপূর্বক নগরবাসিগণকে ধরিয়া আনিয়াছে।
