ভূপতিগণের মধ্যে যিনি সৈন্যগণের কোলাহল, অগ্নির দাহিকাশক্তির প্রভাবে জাগরিত হইয়াছিলেন, তিনি যাহা দেখিলেন, তাহাতে নিশ্চয় মরণ জানিয়া মনে মনে ঈশ্বরে আত্মসমর্পণ করিলেন! স্পষ্টভাবে ঈশ্বরের নাম উচ্চারণ করিবার শক্তি নাই-কঠিনভাবে বস্ত্রে মুখ বন্ধ। শয্যা হইতে উঠিবার শক্তিও নাই-হস্ত পদ কঠিন বন্ধনে আবদ্ধ। যাহারা বান্ধিল, তাহারা সকলেই পরিচিত, কেবল দুই-একটি মাত্র অপরিচিত। কী করিবেন, কোন উপায় নাই! মহা মহা বীর হইয়াও হস্ত পদ বন্ধন প্রযুক্ত কোনও ক্ষমতা নাই! দেখিতে দেখিতে চক্ষুদ্বয়ও বস্ত্রে আবৃত করিয়া ফেলিল, ক্রমে শয্যা হইতে শূন্যে শূন্যে কোথায় লইয়া চলিল।
শিবিরমধ্যে যাহারা যথার্থ নিদ্রিত ছিল, তাহারা অনেকেই জ্বলিয়া ভস্মসাৎ হইয়া গেল। যাহারা এই ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল, তাহারা কেহই মরিল না, শিবিরেও থাকিল না, সীমারদলে মিশিয়া গেল। অবশিষ্টের মধ্যে কে জ্বলন্ত হুতাশন নিবারণ করে? কে প্রভুর অন্বেষণ করে? কে মন্ত্রীদলের সন্ধান লয়? আপন আপন প্রাণ লইয়াই মহাব্যস্ত!
ভূপতিদ্বয়কে বন্ধন-দশাতেই শিবিরে লইয়া সীমার নির্দিষ্ট আসনে বসিল। বন্দিদ্বয়ের বন্ধন, চক্ষের আবরণ মোচন করাইয়া সম্মুখে দণ্ডায়মান করাইল। গায় গায় প্রহরী। পদমাত্রও হেলিবার সাধ্য নাই! চক্ষে দেখিলেন যে, তাঁহাদের কতক সৈন্য ঐ দলে দণ্ডায়মান-মহা হর্ষে বক্ষ বিস্তার করিয়া দণ্ডায়মান,-কিন্তু সীমারের আজ্ঞাবহ।
সীমার বলিল, “আপনারা মহারাজ এজিদের বিরুদ্ধে হানিফার সাহায্যে মদিনায় যাইতেছেন, সেই অপরাধে অপরাধী এবং আমার হস্তে বন্দি। মহারাজ এজিদ্ স্বয়ং আপনাদের বিচার করিবেন, ফলাফল তাঁহার হস্তে। আমি আপনাদিগকে এখনই দামেস্কে লইয়া যাইব। আপনারা বন্দি!” এই বলিয়া ভূপতিদ্বয়কে পুনরায় বন্ধন করিতে আজ্ঞা করিয়া দরবার ভঙ্গ করিল।
সীমার-শিবিরে আনন্দের লহরী ছুটিল। সঙ্গে সঙ্গে প্রভাতের প্রতীক্ষা-গত রজনীতে সীমার প্রভাতের প্রতীক্ষায় ছিল, এখনো প্রভাতের প্রতীক্ষায় আছে। দগ্ধশিবিরেও প্রভাতের প্রতীক্ষা। শিবিরস্থ সৈন্য যাহারা পলাইয়া প্রাণ রক্ষা করিয়াছিল, তাহাদেরও প্রভাতের প্রতীক্ষা। এ প্রভাত কাহার পক্ষে সুপ্রভাত হইবে, তাহা কে বলিতে পারে? দগ্ধীভূত শিবিরের অগ্নি এখনো নির্বাণ হয় নাই। কত সৈন্য নিদ্রার কোলে অচেতন অবস্থায় পুড়িয়া মরিয়াছে, কত লোক অর্ধ পোড়া হইয়া ছট্ফট্ করিতেছে। ভূপতিগণের অবস্থা কী হইল, তাঁহারা পুড়িয়া খাক হইয়াছেন-কি পলাইয়া প্রাণ রক্ষা করিয়াছেন,-পলায়িত সৈন্যগণ তাহার কিছুই জানিতে পারে নাই। যাহাদের সম্মুখে ভূপতিগণকে বান্ধিয়া লইয়া গিয়াছে তাহারা কে কোথায় লুকাইয়া আছে, এখনো জানা যায় নাই।
আজ সীমারের অন্তরে নানা চিন্তা। এ চিন্তার ভাব ভিন্ন, আকার ভিন্ন, প্রকার ভিন্ন। কারণ-সুখের চিন্তার ইয়ত্তা নাই, সীমা নাই, শেষ নাই। যে কার্যভার মস্তকে গ্রহণ করিয়া দামেস্ক হইতে যাত্রা করিয়াছিল, সর্বতোভাবেই তাহাতে কৃতকার্য হইয়াছে। মনে আনন্দের তুফান উঠিয়াছে, তরঙ্গের উপর তরঙ্গ উঠিয়া মহা গোলযোগ করিতেছে। ধনলাভ, মর্যাদাবৃদ্ধি, কী পদবৃদ্ধি, কী হইবে, কী চাহিবে, কী গ্রহণ করিবে, তাহার কিছুই স্থির করিতে পারিতেছে না। রজনী প্রভাত হইল। জগৎ জাগিল, প্রথমে পক্ষীকুল, শেষে মানবগণ, বিশ্বর ন বিশ্বপতির নাম মুখে করিয়া জাগিয়া উঠিল। পূর্বগগনে রবিদেব আরক্তিম লোচনে দেখা দিলেন। গত দিবাবসানে যে কারণে মলিনমুখ হইয়া অস্তাচলে মুখ ঢাকিয়াছিলেন, আজ যেন সে ভাব নাই। ঘোর লোহিত, অসীম তেজ-দেখিতে দেখিতে সেই প্রখর কিরণ বিকীর্ণ করিয়া ক্রমেই অগ্রসর হইতে লাগিলেন।
সীমার দামেস্ক যাত্রার আয়োজনে ব্যস্ত,-সৈন্যগণ সাজিতেছে, অশ্ব সকল সজ্জিত হইয়া আরোহীর অপেক্ষায় রহিয়াছে, বাজনার রোল ক্রমেই বাড়িতেছে, বিজয়-নিশান উচ্চশ্রেণীতে ঊর্ধ্বে উঠিয়া ক্রীড়া করিতেছে, এমন সময় যেন রবিদেবের প্রজ্বলিত অগ্নিমূর্তির সহিত পূর্বদিকে প্রায় লক্ষাধিক দেবমূর্তির সশস্ত্র আবির্ভাব। কী দৃশ্য! কী চমৎকার বেশ! স্বর্ণ রজত নির্মিত দণ্ডে কারুকার্যখচিত পতাকা। অশ্বপদবিক্ষেপের শ্রীই-বা কী মনোহর! অস্ত্রের চাকচিক্য আরো মনোহর, সূর্যতেজে অতি চমৎকার দৃশ্য ধারণ করিয়াছে। সীমার আশ্চর্যান্বিত হইল! পতাকার চিহ্ন দেখিতে দেখিতে তাহার বদনে বিষাদ-কালিমা রেখার শত শত চিহ্ন বসিয়া গেল, অঙ্গ শিহরিয়া উঠিল, হৃদয় কাঁপিতে লাগিল, চঞ্চল অক্ষি স্থির হইল। মুখে বলিল, “এ কার সৈন্য? এ যে নূতন বেশ, নূতন আকৃতি, নূতন সাজ। উষ্ট্রোপরি ডঙ্কা, নাকাড়া, নিশান-দণ্ড উষ্ট্রপৃষ্ঠে দণ্ডায়মান, আকার-প্রকার বীরভাবের পরিচয় দিতেছে! বংশীরবে উষ্ট্রসকল মনের আনন্দে নাচিতে নাচিতে আসিতেছে। এরা কারা? সৈন্য! এ কার সৈন্য?”
উষ্ট্রপৃষ্ঠে নকিব উচ্চৈঃস্বরে ঘোষণা করিয়া বলিতেছে যে, “ইরাকের অধিপতি মস্হাব কাক্কা, হজরত মোহাম্মদ হানিফার সাহায্যে মদিনায় যাইতেছেন, যদি গমনে বাধা দিতে কাহারো ইচ্ছা থাকে, সম্মুখ সমরে দণ্ডায়মান হও! না হয় পরাজয় স্বীকারপূর্বক পথ ছাড়িয়া প্রাণ রক্ষা কর!”
এই সকল কথা সীমারের কর্ণে বিষসংযুক্ত তীরের ন্যায় বিঁধিতে লাগিল। তোগানের সৈন্যমধ্যে যাহারা নিশীথ সময়ে জ্বলন্ত অনল হইতে প্রাণ বাঁচাইয়া সীমার-ভয়ে জঙ্গলে লুকাইয়াছিল, তাহারা ঐ মধুমাখা স্বর শুনিয়া মহোল্লাসে নিকটে আসিয়া বলিতে লাগিল, “বাদশাহ নামদার! আমাদের দুর্দশা শুনুন।”
