এমন বিশ্ৰী করে জামিলুর রহমান কাউকে হাসতে দেখেননি। তিনি শুকনা গলায় বললেন, ওসি সাহেব আজ চলে যান। আরেকদিন আসুন। আমি বের হব, জরুরী কাজ আছে।
এক কাপ চ খেয়ে তারপর যাই। আপনার এখানে চা-টা ভাল করে।
জামিলুর রহমান চা দিতে বললেন। একজন মানুষের সামনে মুখ সেলাই করে মূর্তির মত বসে থাকা যায় না। টুকটাক কথা বলতে হয়। তিনি কি বলবেন ভেবে পাচ্ছেন না।
ওসি সাহেব বললেন, দেশের ইয়াং ছেলে।পুলেরা যে কোন দিকে যাচ্ছেভাবলে গা শিউরে ওঠে। আমার তিন মেয়ে, ছেলে নেই। আমার স্ত্রীর এই নিয়ে আফসোস আছে। আমি তাকে বললাম, শাহানা তুমি আল্লাহর কাছে শুকুর গুজার কর যে তোমার ছেলে নেই।
হলেতো আপনাদের ভাল। নষ্ট ছেলেমেয়ের বাবা-মার কাছ থেকে অর্থনৈতিক সুবিধা পান। অনেক বাবা-মাদের সঙ্গেই নিশ্চয় আপনাদের মাসকাবারি বন্দোবস্ত আছে। আছে না?
খুব কঠিন কথা। এই কঠিন কথা শুনেও ওসি সাহেব হাসছেন। যেন মজাদার রসিকতা শুনে বিমলানন্দ পেলেন। তিনি আরাম করে চা খেলেন।
চায়ের খুব প্রশংসাও করলেন। চায়ের পাতা কোন দোকান থেকে কেনা হয়। জানতে চাইলেন। ক্লোন চা, না ডাস্ট চা তাও জিজ্ঞেস করলেন।
মিতু পানি নিয়ে এসেছে। বাবার মাথায় হাত দিয়ে সে বাবাকে তুলে
বসালো।
ব্যথা কি একটু কম লাগছে। বাবা?
উহু।
বাবা চল তোমাকে হাসপাতালে নিয়ে যাই।
সকাল হোক তারপর দেখা যাবে।
না এখুনি চল। তোমার চোখ মুখ কালো হয়ে গেছে। আমার ভাল লাগছে না। বাবা।
ব্যথাটা এখন একটু কম।
এখন কম?
হুঁ। এক কাপ চা বানিয়ে খাওয়াতে পারবি মা?
অবশ্যই পারব। চল নিচে চলে যাই।
আমি এখানেই থাকি— তুই চা বানিয়ে নিয়ে আয়।
মিতুর ঘর ছেড়ে তাঁর নড়তে ইচ্ছা করছে না। মিতুকে বলে তাঁর ঘরটা কি তিনি নিজের জন্যে নিয়ে নেবেন। অফিস থেকে এসে এই ঘরে থাকবেন। ঘরেতো বাথরুম নেই। বাথরুমের জন্যে নিচে যেতে হবে। মিতুর ঘরটা নেয়া ঠিক হবে না। বেচারীর শখের ঘর। মিতুকে একটা বাথরুম বানিয়ে দিতে হবে। রাজমিস্ত্রীকে সকালবেলাই বলে দেবেন। মিতুর ঘরের সঙ্গে সুন্দর একটা বাথরুম হবে। আর ছাদের চারদিকে রেলিং হবে।
চা খেতে গিয়ে জমিলুর রহমান লক্ষ্য করলেন— তার ব্যথা একটুও নেই। শরীর ঝড়ঝড়ে লাগছে। শরীর ভাল থাকলে যা হয়— সব কিছুই ভাল লাগে। এখনো তাই লাগছে। এই যে তার পাশে মিতু বসে আছে। বিস্মিত চোখে তাকে দেখছে এই দৃশ্যটাও দেখতে ভাল লাগছে।
তুই কি পড়াশোনাও এখানে করিস?
না। এটা হচ্ছে আমার ঘুম-ঘর শুধু ঘুমুবার সময় এখানে আসি। ঘরট সুন্দর না বাবা?
হুঁ সুন্দর।
তোমার ব্যথা কি এখনো আছে?
না-ব্যথা সেরে গেছে।
সেরে গেলেও, তুমি সকালে কোন একজন ভাল ডাক্তারকে তোমার শরীরটা দেখাও।
ডাক্তার দেখাতে হবে না। আমি খুব পরিশ্রম করিতো। পরিশ্রমী মানুষের অসুখ বিসুখ হয় না। এই যে সুরাইয়া এখন স্বাভাবিক আচরণ করছে। কেন করছে? পরিশ্রম করছে বলেই এই উন্নতিটা হয়েছে।
ফুপু কি এখন ভাল হয়ে গেছেন?
আমারতো মনে হয় সে আগের চেয়ে অনেক ভাল। কথাবার্তা ও স্বাভাবিক। তোর কাছে মনে হয় না?
আমিতো বাবা জানি না। ফুপুদের বাড়িতে কখনো যাইনি।
কেন?
যেতে ইচ্ছা করে নি।
ইমন? ইমন আসে না?
না।
কেন?
জানি না বাবা।
সে আসে না বলেই কি তুই যাস না?
মিতু হেসে ফেলে বলল, এইসব তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে তুমি মাথা ঘামিওনাতো। মা-পুত্র নতুন সংসার পেতেছে, ওদের বিরক্ত করতে ইচ্ছা করে না বলেই যাই না।
ওরা কেন আসে না?
আমি কি করে বলব ওরা কেন আসে না?
আচ্ছা আমি বলে দেব।
তোমাকে কিছু বলতে হবে না। বাবা।
মনের ভেতরের আকাশ মেঘে মেঘে ঢেকে গেলে— গলা এমন ভারী হয়। কেন তার মেয়ের মনে এত মেঘা জমবে? তিনি যেমন একা একা জীবন যাপন করেন তার মেয়েটাও কি তাই করে? এটা ঠিক না। এই বয়সেই একা জীবন যাপনে অভ্যস্ত হয়ে গেলে বাকি জীবন কাটানো খুব কষ্টকর হবে।
বাবা!
হুঁ।
সকাল হয়ে যাচ্ছে। ছাদ থেকে সরকাল হওয়া দেখা খুব ইন্টারেস্টিং, দেখবো?
আয় দেখি।
জামিলুর রহমান মেয়ের সঙ্গে সকাল হওয়া দেখতে গেলেন। ব্যাপারটা তাঁর এত ভাল লাগবে তিনি নিজেও ভাবেন নি। গ্রামের সকাল সুন্দর, কিন্তু শহরের সকালও এত সুন্দর হয়? এত পাখি ডাকে? দিনের প্রথম আলোয় এত রহস্য?
জামিলুর রহমানের খুব ইচ্ছা করল মেয়েকে বলেন, মা তুমি আমাকে সুন্দর একটা জিনিস দেখালে। এখন তুমি বল আমার কাছে কি চাও। যা চাইবে তাই আমি দেব। তাঁর নিজেকে কিছুক্ষণের জন্যে হলেও আলাদীনের চেরাগের দৈত্যের মত মনে হল। মনে হল তার ক্ষমতা অসীম। মিতু নামের মেয়েটি এই মহেন্দ্রক্ষণে যা চাইবে তাই তিনি তাকে দিতে পারবেন।
মিতু কিছু চাচ্ছে না। সুন্দর করে হাসছে। আশ্চর্য! তাঁর নিজের মেয়ে এত সুন্দর করে হাসে আর তিনি জানেন না। শোভনের ব্যাপারটা কি মিতুর সঙ্গে আলাপ করবেন? এমন সুন্দর সকালে কুৎসিত কিছু নিয়ে আলাপ করতে ইচ্ছা করে না।
মিতু!
জ্বি বাবা।
শোভন পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে। থানা হাজতে আছে।
বাবা আমি জানি।
তুই জানিস?
হুঁ।
তোর মা। তোর মা-কি জানে?
হ্যাঁ মাও জানেন। টোকন ভাইয়া এসে বলে গেছে।
জামিলুর রহমান চুপ করে গেলেন। সবাই সব কিছু জানে। অথচ সবাই এমন ভাব করছে যেন কেউ কিছু জানে না। বদলে যাচ্ছে, সবাই বদলে যাচ্ছে।
মিতু!
জ্বি বাবা।
তুই যে একটা গান করছিলি। ঐ গানটা করতো শুনি।
