সুরাইয়া ছেলেকে নিয়ে ঝিকাতলায় ফ্ল্যাট ভাড়া করে থাকেন। এক দিকে ভালই হয়েছে। সুরাইয়া ভাল আছে। নিজের সংসার নিয়ে ব্যস্ত। প্রবল শোক ভুলে থাকতে পারছে এটা মন্দ কি। এইভাবে চলতে চলতে সুরাইয়া যদি স্বাভাবিক হয় তাহলে এরচে ভাল ব্যাপার। আর কি হতে পারে? এ বাড়িতে থাকলে সুপ্ৰভা সম্পর্কে আজগুবি সব গল্প সুরাইয়ার কানো যেত। মাথা আরো খারাপ হয়ে যেত।
করিডোরে আবারো পায়ের শব্দ। এখন মনে হচ্ছে স্যান্ডেল পরে কে যেন হাঁটছে। ছোট ছোট করে নিঃশ্বাস ফেলছে। সেই নিঃশ্বাসের শব্দও আসছে। ব্যাপারটা কি?
জামিলুর রহমান চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। পেটের ব্যথাটা এখন একটু কম লাগছে। না-কি মাথায় অন্য চিন্তা ঘুরছে বলে ব্যথা টের পাচ্ছেন না? তিনি খাবার ঘরে ঢুকলেন। করিডোরের বাতি জ্বলিয়ে রান্নাঘর পর্যন্ত গেলেন। কেউ নেই। রান্নাঘরে দুজন বুয়া কথা বিছিয়ে ঘুমুচ্ছে। তাদের নিঃশ্বাসের শব্দই হয়ত শুনেছেন। এই বাড়িতে বুয়াদের জন্য আলাদা ঘর আছে, তারপরেও তারা কেন জানি রান্নাঘরে ঘুমায়। তিনি ফ্ৰীজ খুলে ঠাণ্ডা পানির বোতল খুলে পানি খেলেন। ঠাণ্ডা পানি খেলেই তার সুপ্রভার কথা মনে হয়। শুধুমাত্র এই মেয়েটার জন্যেই তিনি অফিসে ফ্রীজ কিনেছিলেন। মেয়েটা যখন তখন অফিসে চলে এসে ফ্ৰীজ খুলে কোক খেত। তার জন্যে কেনা পাঁচটা কোকের ক্যান এখনো ফ্রীজে আছে। মাঝে মাঝে সুপ্রভার জন্যে তার বুক হু হু করে। তিনি অফিসের ফ্ৰীজ খুলে কোকের ক্যানগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকেন। তার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। বয়স যত বাড়ছে, মন তত দুর্বল হচ্ছে। চোখ-বগাপসা রোগ হয়েছে। যখন তখন চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে।
ঠান্ডা পানি খেতে খেতেও তার চোখ ঝাপসা হল। তিনি কি মনে করে। ছাদের দিকে রওনা হলেন। এই পৃথিবীতে অনেক অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটে। তাঁর জীবনে কখনো কোন অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটে নি। তাই বলে যে কোনদিন ঘটবে না, তাতো না। হয়ত তাঁর জীবনেও অবিশ্বাস্য কোন ঘটনা ঘটবে। হয়তো আজ রাতেই ঘটবে। তিনি ছাদে উঠে দেখবেন ছাদে পা ঝুলিয়ে সুপ্ৰভা বসে আছে। তিনি কোমল গলায় ডাকবেন, সুপ্ৰভা!
সুপ্ৰভা তার দিকে তাকিয়ে হাসবে। তিনি বলবেন, কেমন আছিসরে মা? সুপ্ৰভা বলবে, তুমি কেমন আছ বড় মামা। তিনি বলবেন, আমি ভাল আছি। সুপ্ৰভা রাগি রাগি গলায় বলবে, তুমি মোটেও ভাল নেই। তোমার পেটে ব্যথা হচ্ছে। এ রকম ব্যথা নিয়ে তুমি ছাদে এলে কেন? মামা তোমার কি কান্ডজ্ঞান নেই?
তোকে দেখতে এসেছিরে মা।
আমাকে কিভাবে দেখবে? আমিতো মরে গেছি।
মা কেন এই কান্ডটা করলি?
ভুল করে ফেলেছি মামা। মানুষ ভুল করে না? ভুল করে বলেইতো সে মানুষ। শুধু শুদ্ধ করলে কি সে মানুষ হয়? সে হত রোবট।
জামিলুর রহমান ছাদে উঠার ঠিক আগে থমকে গেলেন–ছাদে হাঁটতে হাঁটতে কে যেন গান গাইছে। নিশুতি রাতে ছাদে গান করবে কে? সুপ্রভার গলা না? হ্যাঁ সুপ্রভার গলাতো বটেই। মিষ্টি রিনারিনে বিষাদময় গলা। ব্যাপারটা কি? জামিলুর রহমানের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এল। তার মনে হল তিনি মাথা ঘুরে এক্ষুনি পড়ে যাবেন। আসলেই সুপ্ৰভা গান গাইছে। গানের কথাগুলো স্পষ্ট না। টানা সুরের গান বলে কথা স্পষ্ট হচ্ছে না। ফুলে ফুলে এই দুটা শব্দ শুধু পরিষ্কার।
জামিলুর রহমান ছাদে পা রাখলেন। সুপ্ৰভা বলে ডাকতে গিয়ে থমকে গেলেন, কাপড় শুকানোর দড়ি দু হাতে ধরে যে মেয়েটি গান গাইছে সে সুপ্ৰভা নয়— মিতু। ছাদে গান গাইছে মিতু।
মিতু শব্দ শুনে বাবাকে দেখে সহজ গলায় বলল, বাবা তুমি? তুমি ছাদে কি করছ।
জামিলুর রহমান বিস্মিত হয়ে বললেন–রাত তিনটার সময় তুইই বা কি করছিস?
বাবা আমিতো ছাদেই থাকি।
ছাদে থাকিস মানে? ছাদে কোথায় থাকিস?
চিলেকোঠার ঘরটায়। হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেছে। তাই হাঁটাহাঁটি করছি।
হাঁটাহাঁটি কোথায় তুইতো গান করছিলি।
হুঁ করছিলাম।
চিলেকোঠার ঘরে কবে থেকে থাকিস?
অনেক দিন থেকেই থাকি। সবাই জানে। তুমি বাড়ির কোন খোঁজ খবর রাখ না বলে তুমি জান না।
একা একা ছাদে থাকিস আশ্চর্য কান্ড। ভয় লাগে না?
ভয় লাগবে কেন? ভয় লাগার কি আছে। এই যে তুমি হঠাৎ এসে উপস্থিত হলে— আমি কি তোমাকে দেখে ভয় পেয়েছি?
জামিলুর রহমানের পেটের ব্যথাটা আবার শুরু হয়েছে। এখন মনে হচ্ছে তিনি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারবেন না। খোলা ছাদেই শুয়ে পড়তে হবে। মিতু বলল, কি হয়েছে। বাবা? তুমি এ রকম করছি কেন?
তলপেটে প্রচণ্ড ব্যথা হচ্ছে। দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না।
মিতু ছুটে এসে বাবার হাত ধরল। চিন্তিত গলায় বলল, তোমার শরীরতো। কাঁপছে বাবা। এসো আমার ঘরে এসে বিছানায় শুয়ে থাক।
পানি খাব।
তোমাকে পানি দিচ্ছি–তুমি এসোতো।
জামিলুর রহমান মিতুর ঘরে শুয়ে আছেন। এক চিলতে ছোট্ট অদ্ভুত একটা ঘর। মুখের কাছে গ্রামের রেলস্টেশনের টিকিট ঘরের মত জানালা। সেই জানালার হাওয়া এসে শুধু মুখের উপর পড়ছে। ভাল লাগছে। মিতুর চিলেকোঠার এই ঘরটা এমন মজার তিনি জানতেন না। বাড়ির অনেক কিছুই তিনি জানেন না। তেমনি তার নিজের জগতের অনেক কিছুই বাড়ির কেউ জানে না। তিনি যেমন তার ব্যাপারগুলো জানানোর প্রয়োজন মনে করেন না। তারাও তেমনি তাদের ব্যাপারগুলো জানাবার প্রয়োজন মনে করে না।
শোভন পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে এই খবর তিনি বাড়িতে কাউকে দেন। নি। দেয়ার প্রয়োজন মনে করেন নি। পুলিশ শোভনের উপর শারিরীক নির্যাতন করছে। এই খবরও তিনি পেয়েছেন। শারিরীক নির্যাতন খবরাখবর বের করার জন্যে করছে না। নির্যাতনটা করছে যেন খবর পেয়ে ছেলের বাবা জামিলুর রহমান পুলিশকে বড় অংকের টাকা দেবার ব্যবস্থা করেন। এই ব্যবস্থা জামিলুর রহমান করেছেন। বড় অংকের টাকাই পুলিশকে দিয়েছেন। মার বন্ধ হয়েছে। ওসি সাহেব এই সুসংবাদ নিজে এসে দিয়ে গেছেন। সিগারেট টানতে টানতে বলেছেন, আপনি কোন চিন্তা করবেন না। আপাতত জামিন হচ্ছে না। কিন্তু মূল কেইস এমন ভাবে সাজানো হবে যেন তাসের ঘর। সব ঠিক ঠাক-কোর্টে গিয়েই-ধপাস। ঘর ভেঙ্গে পড়ে গেল। কেউ কিছু বুঝল না। আসামী বেকসুর খালাস। হা হা হা।
