ফাতেমার চিৎকার থামার পর সুপ্ৰভা খুব সাবধানে দোতলায় উঠল। মার ঘরে উঁকি দিল। মা রাতের খাওয়া শেষ করেছেন। দেয়ালে হেলান দিয়ে খাটে বসে আছেন। তাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে, চিৎকার চেচামেচি সবই কানে গেছে। তার চোখ মুখ অস্বাভাবিক শান্ত। এই অস্বাভাবিক শান্ত ভাবটা মারাত্মক। আজ খুবই ভয়ংকর কিছু ঘটবে। সুরাইয়া মেয়ের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত স্বাভাবিক গলায় বললেন, সুপ্ৰভা রাতের খাওয়া খেয়েছিস?
সুপ্ৰভা ভয়ে ভয়ে বলল, হুঁ।
ইমন! ইমান খেয়েছে?
হুঁ।
আমাকে একটু পান সুপারি। এনে–দেতো, পান খেতে ইচ্ছে করছে। চুন আলাদা করে আনবি।
আচ্ছা।
সুপ্ৰভা পান আনতে নিচে গেল। মার ব্যাপারটা এখনো কিছু বোঝা যাচ্ছে না। অতি স্বাভাবিক আচরণ করছেন সেটাই অস্বাভাবিক। সুপ্রভার ভয় লাগছে। মিতু আপাকে ছাদ থেকে ডেকে নিয়ে আসতে ইচ্ছে করছে। মিতু আপা আশেপাশে থাকলেও একটা ভরসা।
পিরিচে করে দুটা বানানো পান সুপ্ৰভা মার জন্যে এনেছে। এক পাশে চুন, আরেক পাশে মৌরী, দুটা এলাচ। যেন পিরিচের দিকে তাকালেই মার মনটা ভাল হয়।
সুপ্ৰভা!
জ্বি মা।
ইমন কি করছে?
পড়ছে।
ওকে একটু ডাকতো। ওর সঙ্গে কথা আছে।
আচ্ছা।
তোর বড় মামা কি বাসায় আছে?
জ্বি না।
ভাইজান কখন ফিরেন?
এগারোটার মধ্যে সব সময় ফিরেন।
এখন কটা বাজে।
দশটা দশ।
তুই ইমনকে খবর দে।
সুপ্ৰভা ভাইকে ডাকতে গেল। তাকে বলে দিতে হবে যে তার সম্পর্কে মাকে সে একটা মিথ্যা কথা বলেছে। সে বলেছে ভাইয়া ভাত খেয়েছে। আসলে তারা দুজনের কেউই ভাত খায়নি।
ইমন পর্দা সরিয়ে মার ঘরে ঢুকল। শান্ত গলায় বলল, মা ডেকেছ?
দেখলেন, ইমনের বসার ভঙ্গি অবিকল তার বাবার মত। শুধু যে বসার ভঙ্গি তাই না, তাকানোর ভঙ্গিও সে রকম। ঐতো ভুরু কুঁচকে আছে। কপালের চামড়ায় সূক্ষ্ম ভাজ পড়েছে। এই বয়সেই কেমন গম্ভীর গভীর ভাব। গলার স্বরটাও কি তার বাবার মত? কখনো সে ভাবে লক্ষ্য করা হয় নি। একদিন ইমনকে বলতে হবে টেলিফোনে তার সঙ্গে কথা বলতে। টেলিফোনের কথা শুনে বলতে পারবেন। ইমনের গলার স্বর তার বাবার মত কি-না!
ইমন!
জ্বি।
তোর মামী যে সব কথাবার্তা বলছিল শুনছিলি।
হুঁ।
ভুরু কুচকে আছিস কেন? ভুরু সোজা করে কথা বল। তোর মামীর কথা শুনেছিস?
শুনেছি।
এরপরেও কি আমাদের এ বাড়ীতে থাকা উচিত?
হ্যাঁ উচিত।
সুরাইয়া বিস্মিত হয়ে বললেন, উচিত কেন?
উচিত কারণ আমাদের যাবার কোন জায়গা নেই।
সুরাইয়া তীক্ষ্ম গলায় বললেন, যাবার জায়গা থাকতেই হবে –রাস্তায় থাকব। রাস্তায় মানুষ বাস করে না?
পাগলের মত কথা বললেতো মা হবে না।
পাগলের মত কথা? কোন কথাটা পাগলের মত বললাম?
বেশীর ভাগ কথাই তুমি পাগলের মত বল।
তোর ধারণা আমি পাগল?
ইমন কিছু বলল না। চুপ করে রইল। সুরাইয়া চোখ মুখ লাল করে বললেন–খবৰ্দার চুপ করে থাকবি না। তোর ধারণা আমি পাগল? বল, আমি পাগল?
কিছুটা পাগলামী তোমার মধ্যে আছে।
এত বড় কথা তুই বলতে পারলি? পাগল যদি হয়েই থাকি কেন পাগল হয়েছি তুই জানিস না? কথার জবাব দে। চুপ করে থাকবি না।
কথার জবাব দেবার কিছু নেই। কথার জবাব দেয়া মানে— কথার পিঠে কথা বলা। আমি একটা কথা বলব, তুমি তার উত্তরে পাঁচটা কথা বলবে। আবার আমি বলবি. লাভ কি?
লাভ কি মানে, তুই কি সব সময় লাভ-লােকসান দেখে চলিস? তুই কি লাভ-লোকসানের দোকান খুলেছিস? একজন আমাকে আর আমার মেয়েকে বেশ্যা বলবে তারপরেও তার বাড়িতে আমি থাকিব? কোন যুক্তিতে থাকিব?
যুক্তি একটাই আমাদের যাবার জায়গা নেই। তা ছাড়া মামী রেগে গিয়ে কি বলেছেন সেটা বড় কথা না। রেগে গেলে আমরা সবাই কুৎসিত সব কথা বলি। মামী যেমন বলেন, তুমিও বল।
আমি বলি? কখন বলেছি? কি বলেছি?
কখন বলেছ, কি বলেছ সে সবাতো মা আমি লিখে রাখি নি। তবে অনেকবারই অনেক কুৎসিত কথা বলেছ। যখন বলেছি তখন লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছা করেছে।
ইচ্ছে করেছে। যখন তখন মরে গেলেই পারতিস। ছাদে উঠে ছাদ থেকে ঝাঁপ দিলেই পারতি। সেটা দিতে সাহস হয় না? মেনী বিড়াল হয়ে থাকতে ভাল লাগে।
তুমি কুৎসিত কথা বলা শুরু করেছ মা।
কথায় কথায় মা ডাকবি না। তোর মত ছেলের মুখ থেকে মা ডাক শুনতে চাই না। তোর জ্ঞান বেশী হয়ে গেছে। তুই মহাজ্ঞানী হয়ে যাচ্ছিস। মহাজ্ঞানী পুত্রের আমার দরকার নেই। শোন মহাজ্ঞানী, আমি এই বাড়িতে থাকিব না।
কোথায় যাবে?
কোথায় যাব সেটাও জানার দরকার নেই। সুপ্ৰভাকে নিয়ে আমি এখন, এই মুহুর্তে বিদেয় হব। তোর মামী যদি আমার পায়ে এসেও পড়ে থাকে তারপরেও থাকব না।
ঠিক আছে।
অবশ্যই ঠিক আছে। তুই এখন আমার সামনে থেকে যা। দয়া করে একটা বেবীটেক্সি এনে দে।
আচ্ছা।
ইমন মার ঘর থেকে বের হল। সুরাইয়া কাঁদতে শুরু করলেন। তিনি শব্দ করে কাঁদছেন, তার হাত পা কাঁপছে। দরজার আড়াল থেকে সুপ্ৰভা দেখছে। কিন্তু মাকে শান্ত করার জন্যে এগিয়ে আসছে না। তার শুধু মনে হচ্ছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। সুরাইয়া তীক্ষ্ণ গলায় ডাকলেন, সুপ্ৰভা সুপ্রভা। সুপ্ৰভা জবাব দিল না। সুরাইয়া বিছানা থেকে নামলেন। চটি পায়ে দিলেন। গায়ে একটা চাদর দিলেন, আর তখনি ইমন ঘরে ঢুকে বলল, মা তোমার বেবীটেক্সি এনেছি। তুমি যদি যেতে চাও যাও। আর যদি যেতে না চাও আমি বেবীটেক্সি বিদায় করে দেব। মা একটা কথা, তুমি কিন্তু একা যাবে। তোমার সঙ্গে সুপ্ৰভা যাবে না।
