ক্যাশিয়ার সোব আপনেরে বলব।
তুমি বললে কোন অসুবিধা আছে? ঘটনা কি আগে তুমি বল— তারপর ক্যাশিয়ারের কাছ থেকে শুনব।
আমি কিছু জানি না। স্যার। ঘটনার সময় আমি বাইরে ছিলাম। ম্যানেজার সোব আমারে চিঠি পোস্ট করতে বলেছিলেন। আমি গিয়েছি। চিঠি পোস্ট করতে। তখন ঘটনা ঘটেছে।
ঘটনাটা কি?
ছোট সাব এসেছিল।
ছোট সাব মানে কে? শোভন?
জ্বি।
তারপর?
আপনে ক্যাশিয়ার সাবরে জিগান।
তোমাকে জিজ্ঞেস করছি তুমি বল—শোভন এসে টাকা চাইল?
জে।
টাকা নিয়ে চলে গেছে?
জে।
কত টাকা?
প্যাটি ক্যাশে যত ছিল সবই নিছে।
কত ছিল?
মনে হয় তিরিশ হাজার। আইজ একটা পেমেন্ট দেওনের কথা। চেক ক্যাশ করাইছে।
শোভন একা এসেছিল?
জ্বে না। টোকন ভাইয়াও ছেল। গাড়িতে বইস্যা ছেল। নামে নাই। নামছে খালি শোভন ভাইয়া।
শোভন টাকা চেয়েছে আর বিনয় বাবু আয়রণ সেইফ খুলে টাকা দিয়ে দিয়েছে?
উনি দিতে চান নাই। ম্যানেজার সাব উনারে দিতে বলছেন। ম্যানেজার সাব খুব ভয় পাইছেন।
ভয় পেয়েছে। কেন? শোভন পিস্তল বের করেছিল?
জ্বি।
আচ্ছা যাও।
ক্যাশিয়ার সাবরে আসতে বলি?
কাউকে আসতে বলতে হবে না। যখন ডাকব তখন আসবে।
স্যার, চা বানায়ে দিব?
না। দরজা লাগিয়ে দিয়ে যাও।
সামছু দরজা লাগিয়ে ভীত মুখে বের হয়ে গেল। জামিলুর রহমান চুপচাপ চেয়ারে বসে রইলেন। তার বুকে চিনচিনে ব্যথা হচ্ছে—শরীর ঘামছে। হার্ট এ্যাটাকের প্রাথমিক পর্যায় নাতো? না, তা না। এরকম তার আগেও কয়েকবার হয়েছে। চুপচাপ বসে থাকলে ঠিক হয়ে যাবে। এখন তার করণীয় কি? পুলিশে খবর দেবেন? পুলিশকে বলবেন, আমার দুই ছেলে এসে ডাকাতি করেছে। আর্মড রোভারী। সঙ্গে পিস্তল ছিল। না, তা করা যাবে না। জামিলুর রহমান তার মন অন্যদিকে ফেরাবার চেষ্টা করছেন— পারছেন না। না পারলেও চেষ্টা করতে হবে। আজকের কাগজ পড়া হয় নি। কাগজ পড়া যেতে পারে। তিনি বেল টিপলেন। সামছু ঢুকল। তিনি বললেন, দেখি আজকের কাগজটা দেখি।
চা দিব স্যার?
দাও, চা দাও।
বুকের চিনচিন ব্যথাটা মনে হয় কমে আসছে। ব্যথা পুরোপুরি কমুক তখন বিনয়ের সঙ্গে কথা বলা যাবে। তিনি সিঙ্গাড়ার গন্ধ পেলেন। বারোটা বেজে গেছে। অফিসে সিঙ্গাড়া চলে এসেছে। কি এমন জিনিস যে প্রতিদিন খেতে হয়? তিনি নিজে আজ একটা খেয়ে দেখবেন না-কি?
ফাতেমার মেজাজ আজ খুব চড়ে গেছে
ফাতেমার মেজাজ আজ খুব চড়ে গেছে। মেজাজ চড়ার মত তেমন কোন বড় ঘটনা ঘটে নি। মাঝে মাঝে অতি তুচ্ছ ব্যাপারে তাঁর মাথায় রক্ত উঠে যায়। তখন তিনি কি বলেন বা কি করেন নিজেই জানেন না। এখন তার চোখ রক্ত বর্ণ, কথা জড়িয়ে যাচ্ছে। তিনি সুপ্রভার দিকে তর্জনী উচিয়ে বলছেন, তোর মাকে বল এক্ষুণি বাড়ি থেকে বের হতে। এক্ষুণি। অনেক দিন ফকির খাওয়ানো হয়েছে আর না। হোটেলের ফ্রি খাওয়া, ফ্রি থাকা যথেষ্ট হয়েছে। এখন পথে নামতে বল। গতির খাটিয়ে খেয়ে দেখুক কেমন লাগে।
এইখানে থেমে গেলে হত, তিনি এখানে থামলেন না। পথে নেমে কি ভাবে জীবন যাপন করলে খেয়ে পরে বাচা যায় তা বলতে শুরু করলেন। ইঙ্গিত টিঙ্গিতের ধার ধারলেন না। ভয়াবহ কথা বলতে শুরু করলেন।
মা-মেয়ে ঠোঁটে লিপস্টিক মেখে চন্দ্ৰিমা উদ্যানে হাঁটবি, কাস্টমার চলে আসবে। কোলে করে নিয়ে যাবে। কোলে কোলে থাকিবি। সুখে ভাড়া খাটবি। এইখানেতো কোলে করে কেউ রাখে না-পথে নামলেই কোল পাবি।
সুপ্ৰভা ভয়ে এবং লজ্জায় থারথার করে কাঁপছে। মনে মনে বলছে, আল্লা তুমি মামীকে থামাও। তুমি দয়া করে মামীকে থামাও। মামীর কথা শুনে সে যতটা ভয় পাচ্ছে, তারচে বেশী ভয় পাচ্ছে— মা এখন কি করবে। এই ভেবে। ফাতেমার প্রতিটি শব্দ সুরাইয়ার কানে যাচ্ছে। সুরাইয়া খুব সহজ পাত্র না। চুপচাপ সব হজম করবে। এই প্রশ্নই আসে না।
সুপ্রভার ধারণা কিছুক্ষণের মধ্যেই তার মা বলবেন, সুপ্ৰভা ইমনকে বল একটা বেবীটেক্সি ডাকতে। আমরা চলে যাব। সুপ্ৰভা যদি বলে, মা কোথায় যাব? তিনি অবশ্যই বলবেন, চন্দ্ৰিমা উদ্যানে। ভাড়া খাটিব। এখন বাজে রাত দশটা। বড় মামাও বাসায় নেই। উপায়টা কি হবে? মিতু আপা আছেন। মার চিৎকার কথাবার্তা তিনি সব শুনছেন। কিন্তু কিছুই বলছেন না।
সুপ্ৰভা দেখল, মিতু আপা মগভর্তি চা নিয়ে ছাদে উঠে যাচ্ছে। এখন মা যদি সত্যি সত্যি বেবীটেক্সি আনায় তাহলে কেউ থাকবে না মাকে বুঝিয়ে দুটা কথা বলার। সুপ্রভার চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। কাঁদছে না। ভয়ে। কাঁদলে বড় মামী আরো রেগে যেতে পারেন।
যে ঘটনা থেকে এই আগ্নোৎপাতৃ সেই ঘটনা খুবই সামান্য। ফাতেমার পায়ে পানি এসে পা ফুলে গেছে। কাজের মেয়েকে বলেছেন এক গামলা গরম পানি এনে দিতে। গরম পানিতে পা ড়ুবিয়ে বসে থাকবেন। সে পানি আনতে অনেক দেরী করল। কারণ সে সুরাইয়াকে দোতলায় ভাত দিতে গিয়েছিল। ফাতেমা বললেন, ভাত ঘরে দিয়ে আসতে হবে কেন নিচে নেমে খেতে পারে না? কাজের মেয়ে বলল, আম্মা আমি ছোটমুখে অত বড় কথা বলি ক্যামনে? ভাত চায় ভাত দিয়া আসি, চা চায় চা দিয়া আসি, ফিরিজের ঠাণ্ডা পানি চায়, পানি দিয়া আসি। আমার কাম হইছে সিঁড়ি বাওয়া। আম্মা, আমারে ক্ষ্যামা দেন। চাকরি অনেক করছি, আর না।
ফাতেমার বারুদের বস্তায় আগুন লেগে গেল। প্রথমে গরম পানির গামলা লাথি মেরে উল্টে দিলেন। শুরু করলেন চিৎকার। দুর্ভাগ্যক্রমে সুপ্ৰভা তখন তার সামনে। সে সরে পরতে চেয়েছিল, ফাতেমা কঠিন গলায় বললেন, খবৰ্দার মেয়ে নড়বি না। খবর্দার বললাম।
