দরজায় খুটি খুঁট শব্দ। ইমন ঘুমিয়ে পড়েছিল, খুটাখুটি শব্দে ঘুম ভাঙ্গল। দরজার ও পাশ থেকে টোকনের গলা শোনা গেল, ইমন দরজা খোল। রাত দুটা না বাজতেই ঘুমিয়ে পড়লি পরীক্ষায় ফাস্ট সেকেন্ড হবি কি ভাবে।
ইমন দরজা খুলল। দুই ভাই হাসি মুখে দাঁড়িয়ে। কাউকেই চেনা যাচ্ছেনা। মাথার চুল প্রায় কদম ছাট করা। দুজনেই দাড়ি রেখেছে। গোফ রেখেছে। শোভন বলল, চিনতে পারছিস? আমরাই আমাদের চিনিনা তুই চিনবি কি ভাবে? যা ফ্ৰীজ খুলে দেখ খাবার টাবার কিছু আছে কি না। ক্ষিধেয় জীবন যাচ্ছে।
ইমন বলল, রাতে থাকবে?
শোভন বলল, এখনো বুঝতে পারছি না। হেভী একটা গোসল দেব। সাত দিন গোসল করিনি। গা থেকে পাঠার গন্ধ আসছে। কাছে আয় শুকে দেখ।
শোভন হাসছে, তার সঙ্গে টোকনও হাসছে। ইমনেরও খুব মজা লাগছে। ইমনের মনে হচ্ছে এই দুই ভাইতো আসলে সুখেই আছে। মনের সুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে। যা করতে ইচ্ছা হয় করছে। এই দাড়ি রেখে ফেলছে, এই মাথা কামিয়ে ফেলছে। ঘর বাড়ির সঙ্গে কোন সম্পর্ক নেই। ফ্রীজে বাসি খাবার যা পাওয়া যাবে তাই খাবে। ইচ্ছা হলে ঘুমুবে, ইচ্ছা না হলে রাতেই চলে যাবে।
শোভন বাথরুমে ঢুকে পড়েছে। বাথরুমের দরজা খোলা। শাওয়ার ফুল স্পীডে ছেড়েছে। ঝড়ের মত শব্দ হচ্ছে। ইমনের দায়িত্ব ফ্ৰীজ থেকে খাবার আনা। ইমন যাচ্ছে না। কারণ শোভন যখন বাথরুমে গোসল করে তখন ইমন বাথরুমের আশে পাশে থাকতে খুব পছন্দ করে। শোভনের স্বভাব হচ্ছে গায়ে পানি ঢালতে ঢালতে গান করা। কোন গানই সে পুরোটা জানে না। দুই লাইন, চার লাইনের গান। এই এক লাইনের রবীন্দ্র সংগীত-কুসুমে কুসুমে চরণ চিহ্ন তারপরই হিন্দী বাচুপানকে দিন ভুলানা দেনা
ইমনের ধারণা বাংলাদেশে শোভন ভাইয়ার চেয়ে ভাল গানের গলা আর কারোর নেই।
শোভন বাথরুম থেকে চেচিয়ে বলল, ইমন তোকে না খাবারের ব্যবস্থা করতে বললাম, তুই দাঁড়িয়ে আছিস কেন?
যাচ্ছি। ঐ গানটা গাও না—
কোনটা?
বাকের ভাইয়ের গানটা—হাওয়ামে উড়ত যায়ে…
কথা ভুলে গেছি। তোকে যা করতে বলছি করা। যদি দেখিস ফ্রীজে কিছু নেই তাহলে কাঁচা ডিম নিয়ে আসবি। কাঁচা ডিম লবন দিয়ে খেতে মারাত্মক টেস্ট।
ইমন তবুও যাচ্ছে না। শোভন ভাইয়া বাকের ভাইয়ের গানের এক দুলাইন অবশ্যই গাইবে। তারপর সে যাবে।
শোভন শীষ দিতে দিতে হাওয়ামে উড়ত যায়ে গানটা ধরল। ইমনের রীতিমত ঈর্ষা হচ্ছে—কাউকে কাউকে আল্লাহ এত ক্ষমতা দিয়ে পাঠান কেন?
ফ্রীজে অনেক খাবার ছিল। সকালের নাস্তা খিচুড়ি রাতেই রোধে ফ্রাজে ঢুকিয়ে রাখা হয়েছে। খিচুড়ির সঙ্গে গোশত। জমে শক্ত হয়ে আছে। দুই ভাই তাই খুব তৃপ্তি করে খেল।
ইমন বলল, তোমরা কি আজ রাতেই চলে যাবে?
টোকন হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল। শোভন বলল, তোর কাছে একটা জিনিস রেখে যাব। কাপড় দিয়ে মোড়া। খবৰ্দার খুলে দেখবি না। ভেতরে কি। সাবধানে রাখবি।
ইমন বলল, আচ্ছা।
ইউনিভার্সিটিতে তোর কোন সমস্যা হচ্ছে নাতো?
কি সমস্যা?
ইউনিভার্সিটিটা হয়েছে রাজনীতির আখড়া। এ ওকে মারছে, ও তাকে ধমকাচ্ছে। তোকে যদি কেউ কিছু বলে আমাদের বলিস ভূড়ি গালিয়ে পেটের ফোটকা বের করে ফেলব।
ইমন হাসছে। শোভন বিরক্ত গলায় বলল, হাসছিস কেন?
ইমন বলল, মানুষের ফোটকা থাকে না। ফোটকা থাকে মাছের।
শোভন বলল, নাড়ি ভুড়ি এবং ফোটকা একই জিনিস।
খাওয়া শেষ করে দুই ভাই রাত তিনটার দিকে চলে গেল। বাকি রাতটা ইমনের ঘুম হল না। তার বার বার মনে হল সে একটা ভুল করেছে। তারও উচিত ছিল এই দুজনের সঙ্গে চলে যাওয়া।
অনেক্ষণ ধরে টেলিফোন বাজছে
অনেক্ষণ ধরে টেলিফোন বাজছে।
মিতু টেলিফোনের পাশেই, ভুরু কুঁচকে আছে। ক্রিং ক্রিং শব্দটা থামলে তার ভুরু মসৃণ হবে। যে টেলিফোন করেছে সে একসময় বিরক্ত হয়ে হাল ছেড়ে দেবে— মিতুর তাই ধারণা। ইদানীং খুব আজে বাজে কল আসছে। কথা বাতাঁর ধরণ থেকে মনে হয় নাইন টেনের ছাত্র। কুৎসিত বাক্য মুখে ঠিকমত আসছে না, আবার বলার ইচ্ছাও আছে। মিতুর ধারণা চার পাঁচজনের একটা দল আছে। কুৎসিত কথা। একজন বলে অন্যরা হাতে মুখ চাপা দিয়ে খিক খিক করে হাসে। যেমন একজন বলল, আচ্ছ। আপা আপনার বুকের সাইজ কত? ব্রার নাম্বার কত থাটি ফোর, না থাটি সিক্স? চারদিকে শুরু হল খিক খিক হাসি। এই জাতীয় একটা বাক্যেই সারাদিনের জন্যে মেজাজ খারাপ হয়ে থাকে। মিতু প্ৰতিজ্ঞা করেছে সে টেলিফোন ধরবে না।
আজ যে টেলিফোন করেছে তার ধৈৰ্য অসীম। সে বিরক্ত হয়ে লাইন কেটে দিচ্ছে না। ধরেই আছে। কিছুক্ষণ বিরতি নেয়। আবার করে। মিতু শেষটায় চোখ মুখ কঠিন করে রিসিভার হাতে নিল। ওপাশ থেকে মিষ্টি এবং কোমল গলায় একটি মেয়ে বলল–এটা কি ইমন ভাইয়াদের বাড়ি?
মিতু বলল, হ্যাঁ।
আপনি কে?
আমি ইমনের বড়বোন।
আপা স্লামালিকুম।
ওয়ালাইকুম সালাম।
ইমন ভাইয়া কি বাসায় আছে?
তুমি একটু ধরে থাক, আমি দেখছি ও আছে কি-না। তোমার নাম কি?
নবনী।
নবনী বললেই সে তোমাকে চিনবে?
জ্বি।
আচ্ছা তুমি ধরে থাক।
মিতু ইমনের ঘরে ঢুকল। ইমন পড়ছিল, মিতুকে দেখে শুধু তাকাল, কিছু বলল না।
মিতু বলল, দিনের বেলা দরজা জানালা বন্ধ করে তুই পড়িস কি ভাবে? অন্ধকারে চোখের বারোটা বাজবো।
ইমন কিছু বলল না। প্রশ্ন না করলে সে জবাব দেয় না। এখনো তাকে কোন প্রশ্ন করা হয় নি। মিতু বলল, চা খাবি? ইমনের চা খাবার কোন ইচ্ছা নেই। তবু সে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল। ইমান লক্ষ্য করেছে সে চা খেতে চাইলেই মিতু ট্রেতে করে দুকাপ চা নিয়ে আসে। ইমনকে এক কাপ দিয়ে নিজে এক কাপ নেয়। চা খাবার সময়টা পা দুলিয়ে দুলিয়ে গল্প করে। মিতুর সেই গল্পগুলি হয় খুব মজার। চা খেতে ইচ্ছে না হলেও শুধুমাত্র গল্প শোনার লোভে ইমন চা খেতে চায়।
