রাতে সুপ্ৰভা মার সঙ্গে ঘুমুতে এল। বালিশ নিয়ে এসে ঝুপ করে বিছানায় পড়ে গেল। পড়ার সময় শব্দ একটু বেশি হল। আতংকে সুপ্ৰভা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল—এই বোধ হয় মা একটা ধমক দিলেন। সুরাইয়া ধমক দিলেন না, বরং উলটো হল, স্বাভাবিক গলায় বললেন, সুপ্ৰভা আয় চুল বেঁধে দেই। রাতে টানটান করে চুল বেঁধে না দিলে চুল বড় হয় না।
সুপ্ৰভা মার কাছে চুল বাধতে গেল। মার মেজাজ এখন মনে হচ্ছে ভাল। এই ভালটা কতক্ষণ থাকবে বলা যায় না। এমন কোন যন্ত্রপাতি যদি থাকত যা আগে ভাগে মেজাজের খবর জানায়—তাহলে খুব ভাল হত। যন্ত্রটা সুপ্ৰভা ফিট করে রাখত। যন্ত্র আগে ভাগে ওয়ার্নিং দিচ্ছে
চার নম্বর দূরবতী বিপদ সংকেত। সাবধানে কথা বলতে হবে। সামনে না। যাওয়াই ভাল। দূরে দূরে থাকুন।
দশ নম্বর মহা বিপদ সংকেত। আশ্রয় কেন্দ্ৰে আশ্রয় নিন। মিতুর কাছে, কিংবা বড় মামার কাছে চলে যান।
সুপ্ৰভা!
কি মা।
এখন থেকে রাতে আমার সঙ্গে ঘুমুবি।
সুপ্রভার মুখ শুকিয়ে গেল। মা পেছন থেকে চুল আচড়াচ্ছেন বলে শুকনো মুখ দেখতে পেলেন না। সুপ্ৰভা নকল খুশী খুশী গলায় বলল, আচ্ছা।
একা ঘুমুলে হঠাৎ হঠাৎ খুব ভয়, লাগে। পরশু রাতে খুব ভয় পেয়েছি।
সুপ্রভা কিছু বলল না। মা কেন ভয় পেয়েছেন জানতে ইচ্ছে করছে না। টান টান করে বেণী বঁধছেন তার কষ্ট হচ্ছে কিন্তু মুখে বলতে পারছে না।
পরশু রাতে কি হয়েছে শোন। হঠাৎ ঘুম ভাঙ্গল, শুনি বৃষ্টি হচ্ছে। মাথার কাছের জানালা দিয়ে হাওয়া আসছে, বৃষ্টির ছাটও আসছে। ভাবলাম উঠে গিয়ে জানালা বন্ধ করি। উঠতে ইচ্ছে করছিল না, তখন ভাবলাম তোর বাবাকে বলি জানালা বন্ধ করতে।
সুপ্ৰভা বিস্মিত হয়ে বলল, বাবাকে বলি মানে? বাবা কোথায়?
এটাইতে কথা। আমি পরিষ্কার দেখছি তোর বাবা উল্টো দিকে মুখ করে আমার পাশে ঘুমিয়ে আছে। সব সময় যেভাবে ঘুমায় সেই ভাবে ঘুমুচ্ছে, বালিশ থেকে মাথা নেমে গেছে। হাঁটু চলে এসেছে বুকের কাছে। চাদরটা কোমর পর্যন্ত দেয়া। সব কিছু এত পরিস্কার যে বাস্তবও এত পরিষ্কার না। তোর বাবা যে হারিয়ে গেছে তার কোন খোঁজ নেই। এইসব কিছুই তখন আমার মনে নেই। আমি হাত বাড়িয়ে তাকে ডাকতে যাব তখন বজপাত হল, আমি চমকে উঠলাম। হঠাৎ মনে পড়ল আরো তাইতো তোর বাবাকে এখানে দেখব কেন? তখন দেখি কিছু নেই। বিছানা খালি। প্রচন্ড ভয় পেয়েছিলাম।
ভয় পাবারই কথা। আমারতো শুনেই ভয় লাগছে। বুক ধ্বক ধ্বক করছে।
সুরাইয়া সহজ গলায় বললেন, বিছানায় তোর বাবাকে শুয়ে থাকতে দেখা নতুন কিছু না। আমি প্রায়ই দেখি।
কি বলছি তুমি?
তোর যখন দুই মাস বয়স তখন পর পর কয়েক রাত দেখেছি।
সুপ্ৰভা মনে মনে বলল, মা তোমার মাথা খারাপ। পুরোপুরি খারাপ। রাতে তোমার সঙ্গে ঘুমুতে এই জন্যেই আমার ভয় লাগে। কোন একদিন তুমি হয়ত আমাকে ভূত মনে করে গলা টিপে ধরবে। কোন পীর ফকিরের কাছ থেকে তোমার জন্যে তাবিজ আনা উচিত কিংবা ডাক্তার দিয়ে চিকিৎসা করানো উচিত। ছেলে পাগলের চেয়ে মেয়ে পাগল ভয়ংকর।
সুপ্রভার স্কুলের আশে পাশে একটা মেয়ে পাগল থাকে। সে প্রায়ই হাতে একটা থান ইট নিয়ে মানুষজনকে তাড়া করে। সুপ্ৰভা আর মিনা একদিন স্কুল ছুটির পর আসছিল পাগলীটা হঠাৎ থান ইট হাতে তাদের তাড়া করল। সুপ্ৰভা এক সময় হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল। কি আশ্চর্য কান্ড পাগলিটা এসে তাকে টেনে তুলে গম্ভীর গলায় বলল, সাবধানে চলবি। বলেই সে ইট হাতে তাড়া করতে লাগল মিনাকে। তার মা পাগল হয়ে গেলে কি এই রকম কান্ড কারখানা করবে? থান ইট নিয়ে তাড়া করবে তাকে আর ভাইয়া কে। কি ভয়ংকর!
সুপ্ৰভা।
জ্বি মা।
তোর নাম তোর বাবার রাখা এটা কি জানিস।
বাবা কিভাবে রাখবেন? আমার জন্মই হল তার নিখোঁজ হবার পর।
ইমন যখন আমার পেটে তখন তোর বাবার ধারণা হল আমার মেয়ে হবে। সেই মেয়ের নাম কি রাখা হবে তার জন্যে সে অস্থির হয়ে পড়ল। অফিস থেকে প্রতিদিনই একটা দুটা নাম নিয়ে ফেরে। রাতে ঘুমুতে যাবার সময় বলে—এই নামটা তোমার কেমন লাগে। আমি শুধু হাসি।
হাস কেন?
তোর বাবার কান্ড দেখে হাসি। এ রকম গম্ভীর মানুষ অথচ ভেতরে ভেতরে ছেলেমানুষ। শেষটায় নাম ঠিক করল। সুপ্ৰভা। আমার সুরাইয়া থেকে সুনিয়ে সুপ্ৰভা।
সুপ্ৰভা হাই তুলতে তুলতে বলল, তোমার সুরাইয়া থেকে সু নিয়ে আর বাবার হাসানুজ্জামানের হা নিয়ে সুহা নাম রাখলে ভাল হত। নতুন ধরণের হত।
সুহার কি কোন অর্থ আছে না-কি?
তাহলে হাসু। হাসুর অর্থ আছে—যে হাসে। আর আমিতো সে রকমই-সব সময় হাসি।
তুই সব সময় হাসিস?
হুঁ। স্কুলে আমার নাম কি জান মা? আমার নাম মিস এল জি।
এলজি মানে?
এলজি হল লাফিং গ্যাসের সংক্ষেপ। আমাদের ক্লাসের আরেকটা মেয়ে আছে তার নাম মিস এইচ এম।
এইচ এম মানে?
এইচ এম মানে হনুমানমুখী। ওর মুখটা দেখতে হনুমানের মত।
তোরা কি স্কুলে পড়াশোনা বাদ দিয়ে সব সময় ঠাট্টা ফাজলামী করিস?
সুরাইয়ার গলা কেমন যেন কঠিন হয়ে আসছে। কথা বার্তা আর চালানো ঠিক হবে না। বিপদ মাপার যন্ত্রটায় একটু পর পর লালবাতি জুলছে। বিপদ মাপা যন্ত্র বলছে—দুই নম্বর সতর্ক সংকেত। ঘুমিয়ে পড়ার ভান কর। সুপ্ৰভা ঘুমের ভান করল। ভারী নিঃশ্বাস ফেলা শুরু করল। ঘুমের ভান সে খুব ভাল করতে পারে। ঘুমের মধ্যে মানুষ যেমন বিড়বিড় কথা বলে সে তাও পারে। মনে হয় বড় হলে সে খুব নামকরা অভিনেত্রী হবে।
