একসময় দুপুর ঝিমিয়ে আসে।
কাকের চিৎকারে অন অবসাদ ঝরে পড়ে।
চিৎপাত ব-এর মতো বেঢপ হলুদ বাড়ির ছাদে রেডিওর এরিয়েলের বাঁশ খানিকটা হেলে আছে। অনুর মনে হয় বর্বর বাতাস বাড়ির মাথায় রেফ দিয়ে গিয়েছে।
ভালো লাগে অনুর।
খুব ভালো লাগে। যে ঘরকে রাগী দুপুরের দংশন যন্ত্রণায় নিষ্পেষিত জঠর বলে মনে হতো, যে জঠরে মেঝের লাল ফরাশে শুয়ে শুয়ে এক সময় সে ভয়াবহ দুঃস্বপ্নে শিউরে উঠতো,—সেই ঘর, যন্ত্রণা, দুঃস্বপ্ন, বৈচিত্র্যময় উঠতি আনন্দের অবাধ্য গতির সঙ্গে পাল্লা দিতে না পেরে বিবর্ণতার নিলয়ে বিলীন হয়ে গিয়েছে কবেই। ছত্রাখান জগতের এই ব্যাকুল আহ্বান নিঃশব্দ জানালায় দাঁড়িয়ে শোনার চেয়ে রৌদ্রের হিংস্রতায় পোড়া, পথ হারিয়ে পাগলের মতো ঘোরাঘুরি করা, কিংবা রাস্তার পাশের পাইপকলে মুখ লাগিয়ে এক নিশ্বাসে তৃষ্ণা নিবারণ করা তার কাছে গভীর আন্তরিকতার এক একটা চিহ্ন বলে মনে হয়।
এইসব প্রকীর্ণ চিহ্নের প্রতি অনুরক্ত অনু এখন আর মার জন্যে ভরা দুপুরে অকারণে দুমড়ে-মুচড়ে একাকার হয় না। অসংখ্য হাত বাড়ানো। পাকুড় আর গরান গাছের গরিব চেহারার মাঝখানে সে তার মার সুদ স্নিগ্ধ মুখের সেই পরম নির্ভরযোগ্য আলো দেখতে পায়।
কিন্তু গেনদু, মিয়াচাঁন, ফকিরা কিংবা ফালানি—এদের কারো মুখেই আলো খুঁজে পায় না অনু; এদের মুখের ধারালো অন্ধকারে রক্তনে রৌদ্র বিদ্যুতের মতো ঝলসে ওঠে কখনো কখনো, এইমাত্র। চৌ-পহর দিন এরা বিষদাঁত হাতড়ে ফিরছে। সামান্য একটা ব্যাঙকে যখন এরা পা দিয়ে চটকায় কিংবা এতোটুকু হালকা ঝিঝিপোকা কি প্রজাপতির ফিনফিনে শরীরকে শতেক টুকরো করে কুটকুটিয়ে ছিঁড়তে থাকে তখন এদের চোখমুখে উল্লাসের যে আগুন ঝলসে উঠে অনু তা দেখে ভয় পায়। এইতো কয়েকদিন আগেই মাঞ্জা দেওয়া করকরে লাল সুতোর টান মেরে একজনের কান উড়িয়ে দিয়ে ছুটে পালিয়েছিলো গেনদু, বিজয়োল্লাসে ফেটে পড়েছিলো। চলতে চলতে অকারণে ঢিল ছুঁড়লো কখনো। যদি কারো মাথায় গিয়ে পড়ে, কিংবা রক্তপাত ঘটে, তাহলে তার আনন্দ দেখে কে।
মিয়াচাঁন, বারিখান তাকায়া দ্যাখ, অক্করে টেডি মাইয়াগ রহম।
গেনদুর কথায় অনুও তাকালো ঐদিকে।
বেঢপ খাড়া চারতলা লাল বাড়ি রাস্তার একপাশে তালগাছের মতো ঠায় দাঁড়িয়ে। দোতলার মাঝখানে ঝোলানো বারান্দায় একটি ছেলে নিচের দিকে ঝুঁকে রাস্তা দেখছে। অনুর মনে হলো ইটের তৈরি এক অবিশ্বাস্য ক্যাঙ্গারু পেটের থলিতে শিশু নিয়ে পরম নিশ্চিন্তে নিরুপদ্রব বিকেল পোহাচ্ছে।
বাড়ির সামনে শাদা ন্যাকড়ার মতো কি একটা পড়েছিলো, চোখ পড়লো তিনজনেরই। গেনদু ছুটে গিয়ে তুলে নিলো।
হিহি করে হাসতে হাসতে হাত বাড়িয়ে ধরে বললে, এলায় ছেরিগ দুদে বান্দনের জামা! আয়না মিয়াচাঁন, তরে লাগায়া দেহি!
প্রথমে তারা সেই বেঢপ বাড়িটা ছাড়িয়ে অনেকদূর এগিয়ে গেল, তারপর ঝুরিওলা এক বুড়ো বটের নিচে পঁাড়িয়ে বুকের দিক পিঠে দিয়ে মিয়ানের গায়ে শক্ত করে ফিতেগুলো এঁটে দিল গেনদু। বললে, নাচনা বে।
মিয়াচাঁন দম দেওয়া পুতুলের মতো তখনকার তখনই হাতপা ঘুরিয়ে, মাজা দুলিয়ে আগু-পিছু করে, বসে, দাঁড়িয়ে, লাফিয়ে লাফিয়ে, চর্কিবাজির মতো ঘুরপাক খেয়ে, সুর ধরে। তারপর তার নিজের কায়দায় নাচন শুরু হয়। আর গেনদু দুহাতে পেটের ওপর থাবড়া দিয়ে হেইহেই হেইহেই করে মালসাট মারতে থাকে।
ঘরমে আয়া বাবু শোনেকা বাস্তে–
শালীকো লেকে শো গয়া ঘরওলী সমঝকে। হায় হায় ঘরওলী সমঝকে!
অনু দেখলো বটগাছের চুড়ায় পাতা নেই একটিও, নুলো নুলো ডাল, সেখানে শকুনের দঙ্গল ঘোঁট পাকাচ্ছে। মেলা বসিয়েছে কাকের ঝক; কেউবা ঠুকরে পালকের উকুন খুঁটে দিচ্ছে, কেউবা শকুনের পিঠে গাড়িচাপা করে খেলছে।
হঠাৎ নাচ বন্ধ করে মিয়াচাঁন রুষ্টমুখে বললে, পহা ছাড়না বে, হুদাহুদি দেহামু নিহি?
গেনদু রসিকতা করে বললে, এউগা কিচ খায়ার পারি!
মিয়াচাঁন বললে, তয় অনুরে দেওন লাগবো–
অনু খুশি মনেই পকেট থেকে দশ পয়সা বের করে দিলো।
আপন মনে পেয়ারা চিবুতে চিবুতে একটি মেয়ে একা একা এই পথ দিয়েই হেঁটে যাচ্ছিলো; গেনদু ওদের দুজনকে পিছনে রেখে নিতান্ত ভালোমানুষের মতো কিছুটা সামনের দিকে এগিয়ে গেল, তারপর সহসা এক ঝটকায় মেয়েটার হাত থেকে আধ-খাওয়া পেয়ারা কেড়ে নিয়ে চেঁচো করে দে দৌড়।
সেই সঙ্গে মিয়াচাঁনও। চোরা চাহনিতে ভেতরে ভেতরে কখন যে দুজনের ভাবের আদান-প্রদান হয়ে গিয়েছে সে তা কিছুমাত্র অনুমান করতে পারে নি।
ছুটতে ছুটতে চোখের আড়াল হবার আগে সেই দূর থেকে চিৎকার করে গেনদু বললে, কাউলকা দেহা অইবো বন্দু হাম্মাদের ওহানে–-
একেবারে ভোজবাজির মতো উধাও হয় দুজন।
বিকেলের গা থেকে হাওয়ার আঁচল ধুলোয় খসে পড়ে গিয়েছিলো, ঘূর্ণি উঠলো মেয়েটাকে চক্রাকারে বেষ্টন করে। শুকনো বিবর্ণ পাতা হেঁড়া কাগজ আর ধুলোবালি তাকে মাঝখানে রেখে প্যাঁচানো স্কুর মতো শঙ্খিল গতিতে ওপরের দিকে উঠলো ফরফর করে পাক খেয়ে; এক মুহূর্ত তাকে দেখা গেল ঝাপসা, যেন পর্দা সরিয়ে সামনে এসে দাঁড়ালো।
দলের কেউ নেই, অনু এখন একা।
প্রথমে হকচকিয়ে গিয়েছিলো মেয়েটি, তারপর বিদ্যুৎগতিতে এক টুকরো ঝামা তুলে নিয়ে অন্ধের মতো যেদিকে পারলো ছুঁড়লো। যখন দেখলো গেনদু আর মিয়াচাঁন ভেলকিবাজির মতো চোখের পলকে হাওয়া হয়ে গিয়েছে, হাতের পাতায় চোখ ঢেকে সে হাউহাউ করে কেঁদে ফেললো।
