এমন নজর এমন তাক তোমার! তাই তো ভাবি, সাধে কি সায়েব সুবো থেকে বাবুরা পর্যন্ত তোমায় খাতির করে!
ঈশ্বর বলে, বাচ্চা বাঘ। গলা খাকারি দিলেই পালিয়ে যেত।
লখার মা খানিকক্ষণ চুপ করে থাকে। বনের ভিতরে ঘন নিবিড় ছায়া, ঈশ্বরের মুখের ভাব ভালোভাবে ঠাহর করে দেখার উপায় নেই। চোখের পলকে একটা বাঘকে ঘায়েল করেও তার এরকম শান্ত নির্বিকার ভাব কতখানি আন্তরিক যাচাই করা সম্ভব হয় না লখার মার পক্ষে।
হঠাৎ সে আব্দারের সুরে বলে, বাঘটা মোকে দেবে?
মরা বাঘ দিয়ে করবে কি?
চামড়া দিয়ে আসন বানাব।
চামড়া ছোট হবে।
তা হোক। একজনার বসার মতো হবে তো!
তাই বা মোকে দিচ্ছে কে! ঈশ্বর হেসে বলে, নিও বাঘটা–সেজন্যে কি।
কত বাঘ মেরেছি–আরো ঢের মারব।
হাসি বন্ধ করে বলে, আমি চামড়া ছাড়াতে পারব না কিন্তু। মরা বাঘ নিয়ে গিয়ে চামড়া ছাড়িয়ে টেন করাতে খরচা আছে মনে রেখ।
লখার মা হেসে বলে, সে খরচা তুমি দেবে না জানি।
ঈশ্বর বলে, মোর গ্যাঁটে পয়সা নাই গো! তুমি চাইলে তাই–নইলে যাকে পেতাম যা পেতাম তাতেই বাঘটা বেচে দিতাম। কার্তুজের খরচা উঠে যা লাভ থাকে।
লখার মা বলে, বন্দুকের আওয়াজ শুনেছে, লোকজন এসে পড়বে, ওরাও ফিরে আসবে। চটপট বলি মনের কথাটা। খরচা উঠে আসবে। পিঁড়িতে বসে, মাটিতে বসে গল্প শোনাই। বাঘের চামড়ার আসন নিয়ে গেলে মোর কদর কত বাড়বে ভাব তো?
ঈশ্বর বলে, ও বাবা, তোমার ওই হিসেব!
লখার মা বলে, হিসেব ছাড়া কি জগৎ চলে? হিসেব করেছি বলে ভর হয়ে আছি, সমাজে আছি। নইলে বেশ্যা বনে যাওয়া ছাড়া গতি থাকত।
কত সহজে লখার মা মরা চিতাবাঘটা নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেখে ঈশ্বর সত্যই চমকৃত হয়ে যায়।
বন্দুকের আওয়াজ হবার কয়েক মিনিটের মধ্যে কয়েকজন মানুষ হাজির হয়।
তারা বনে এসেছে জীবিকার সন্ধানে।
বুড়ো জসিম বলে, অ্যাতো ছোট বাঘ মারলে ঈশ্বর?
ঈশ্বর বলে, বাঘ দেখলেই মারতে হয়।
বন্দুকের আওয়াজ শুনে নুরুল রোস্তমরাও ভড়কে যায়।
কিছুক্ষণের মধ্যে তারাও এসে হাজির হয়।
কাছাকাছিই ছিল নিশ্চয়–গাছগাছড়ার আড়ালে।
বনের গহনে বেশি দূর এগোবার সাহস পাবে কোথায়!
লখার মা তাদের বলে, সাথে এসেছিলাম, তাই আজ রেহাই পেয়ে গেলে। পাকা শিকারিকে আনলেই কি হয়! বাঘ ওদিকে ঘোরাফিরা করছে, শিকারি এদিকে নাম ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছন।
ঈশ্বর চমৎকৃত হয়ে শোনে।
কিন্তু মিথ্যা অপবাদের প্রতিবাদে একটি কথাও বলে না।
বাঘ এসেছিল।
চোখের সামনে দেখছ না বাঘটা?
তারপর লখার মা বলে, ভাগ্যে টের পেলাম তোমাদের গন্ধ পেয়ে বাঘটা ঘোরাফিরা করছে। জাগিয়ে দিয়ে বাঘটাকে মারতে বললাম।
নুরুল কাছে গিয়ে মরা চিতাটাকে দেখে এসে উচ্ছসিতভাবে বলে, এই জন্যে মা আমাদের একলা ছাড়তে চায় নি। হলই বা ছোট বাঘ, জানে মারতে না পারলেও জখম করে তো ছাড়ত।
লখার মা বলে, এ বাঘটা কিন্তু আমার।
নিশ্চয় নিশ্চয়।
বাঘ নিয়ে গিয়ে চামড়াটা টেন বানিয়ে মোকে দেবে। আসন করব।
বহুত আচ্ছা।
ঈশ্বর চুপ করেই থাকে। একবার শুধু লখার মার মুখের দিকে তাকায়।
কে জানে সরলতা দিয়ে মানুষকে বশ করার এ বিদ্যা কিভাবে আয়ত্ত করেছে লখার মা!
সমাজে থাকার জন্যে, বেশ্যা না হওয়ার জন্যে, কে জানে তার কি লড়াই!
মরা বাঘের জন্য নৌকায় অবশ্য এক পয়সাও বাড়তি ভাড়া লাগে না।
নৌকাটাই ভাড়া করা হয়েছে যত মানুষ বা মাল আঁটে সেই হিসাবে।
সুযোগ বুঝে ছোটখাটো মরা একটা চিতাবাঘের জন্যে বেশি কিছু চাওয়ার কথা ভাবতেই পারে না নৌকার বুড়ো মালিক।
মাঝিরা বরং সানন্দে হাসিমুখে বাঘটাকে নৌকাতে তুলতে সাহায্য করে।
শান সায়েব চামড়াটা তৈরি করিয়ে এনে ফুলজানকে দিয়ে ঈশ্বরের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়।
গৌরী বলে, একদিন আসবে, এই আসনে বসে নতুন গল্প শুনিয়ে যাবে তবে চামড়া দেব। কি গল্পই সেদিন শুনিয়ে গেল! রাবণ সীতার ম্যালেরিয়া!
তাদের ভাঙা ঘরের সামনে সেদিনকার জমজমাট আসরের কথা যেন ভুলেই গিয়েছে গৌরী!
তারপর মুখ কঠিন করে গৌরী বলে, তুমি যেন লখার মাকে বলতে যেও না কিছু।
ঈশ্বর বলে, মোর গরজ?
তবু লখার মা খবর পায়।
পরদিন দুপুরবেলা হাজির হয়।
গৌরী চিতাবাঘের চামড়াটা পেতে তাকে বসতে দেয়।
পান দেয়।
ঘরে দোক্তা ছিল না। দু পয়সার দোক্তা আনিয়ে দেয়।
দুটো-চারটে পয়সা গৌরী এখানে ওখানে খাপ খোপরে লুকিয়ে রাখে। এইরকম বিশেষ দরকারের জন্যে।
লখার মা আরাম করে বসে। পান চিবোতে চিবোতে দু-তিনবার ঘরের কোণেই পিক ফেলে।
গৌরীর চেহারা আরো খারাপ হয়ে গিয়েছে। মুখ দেখে মনে হয় অবিলম্বে আবার তাকে হাসপাতালে পাঠানো দরকার।
লখার মা ওদিক দিয়ে যায় না।
বাঘের আসনে জাকিয়ে বসে জিজ্ঞাসা করে, কি গল্প শুনতে চাস রে গৌরী?
গৌরী শুধু যে রেগে ছিল তা নয়, অন্য অনেক দিক দিয়েই টং হয়েছিল।
কিন্তু সে সহজভাবেই জবাব দেয়, তোমার যা খুশি তাই বল।
রাবণ-সীতার জ্বরের গল্প বলেছিলাম। কি করে জগতে ম্যালেরি জ্বর এল। তারপরের গল্পটা বলি?
বল।
লখার মা গল্প শুরু করে দেয়। সীতার অগ্নি-পরীক্ষার গল্প।
একটি কথাও লখার মা আজ বানিয়ে বলে না, বাড়িয়ে বলে না–রামায়ণে যেমন লেখা আছে, সকলের যেমন জানা আছে, সেই কাহিনীটুকুই বলে যায়।
রাবণ বধ থেকে শুরু করে সীতার অগ্নি-পরীক্ষা পর্যন্ত।
মেয়েরা যে যা পারে দেয়।
ঘন্টাখানেক মুখ চালিয়েই লখার মার তিন-চার দিন পেট চলবার ব্যবস্থা হয়ে যায়।
