ঈশ্বর দাওয়ায় বসে গল্প শোনে। গল্প শেষ হতেই সে বেরিয়ে গিয়ে বড় রাস্তার মোড়ে বাধানো অশথ গাছটার তলে বসে থাকে।
অনেকদিন আগে গাছটার গোড়া বাঁধানো হয়েছিল। ভেঙেচুরে গিয়েছে।
ফাটলের মধ্যে দু-একটা সাপও হয়তো আছে।
এটা লখার মার ঘরে ফেরার পথ নয়।
তবু লখার মা এই ঘুরপথে ঘরে ফিরতে গিয়ে গাছতলায় ঈশ্বরকে যেন আবিষ্কার করে।
বলে, বেশ মানুষ বটে তুমি। আমি ইদিকে ঘরে গেলাম দুটো প্ৰাণের কথা কইতে–আর এখানে এসে দিব্যি গ্যাট হয়ে বসে আছ!
ঈশ্বর বলে, তোমার কথা সব শুনেছি। রাবণ বধ আর সীতার অগ্নি-পরীক্ষা। চালিয়ে যাচ্ছ। বেশ।
চালিয়ে যাচ্ছি মানে?
মোর চলে না। তুমার চলে যাচ্ছে।
একলা মানুষ। একটা পেট।
ঈশ্বর হেসে বলে, দুটো মানুষ হলেই ঝঞাট ফুরিয়ে যায়। অন্য মানুষটা পেট চালাবার দায় নেবে।
লখার মা হেসে বলে, তুমি হও না ওই আরেকটা মানুষ। হবে?
ঈশ্বর বলে, অন্য একজনার হয়ে আছি যে গো–যার ঘরে আজ গল্প শুনিয়ে এলে।
বড় ছেলেমানুষ তোমার বৌ।
পাকা হবার সুযোগ পেল কই?
পাকিয়ে দেব?
থাক আমার কাঁচাই ভালো।
লখার মা মুচকে মুচকে হাসে।
বলে, পাকা শিকারি–কাঁচা বৌ।
ঈশ্বর বলে, পাকায় পাকায় কাঁচায় কাঁচায় ঠোকাঠুকি লাগে জান না? কাঁচায় পাকায় বেশ মিশ খায়।
অঃ। তাই তোমাতে আমাতে এত ঠোকাঠুকি চলছে।
ঠোকাঠুকি আবার শুরু হল কবে গো?
ওমা, তাই তো! মোটেই তো ঠুকি নি তোমাকে। শুরু করে দেব নাকি এবার থেকে?
তুমি ঠুকলে সইবে না।
ঝিমিয়ে যাচ্ছ কেন? জোয়ান মদ্দা মানুষ।
আর ঝঞ্ঝাট পোষায় না।
মজা চিনলে না, ঝঞ্ঝাট চিনলে না! বোকা মানুষ।
বোকা বলেই তো এই দশা।
লখার মা হেসে বলে, চালাক চতুর বানিয়ে দেব। সে বিদ্যে জানা আছে।
ঈশ্বর গম্ভীর মুখে বলে, বোকা থাকাই ভালো।
এমন সুস্পষ্ট প্রত্যাখ্যান পেয়েও লখার মা রাগ করে না। আঁচলের গিট খুলে পান দোক্তা মুখে পুরে বলে, বোকা তা নও, ভীরু কাপুরুষ। এমন নামকরা শিকারি এত ভীরু হয়!–বলে লখার মা পা বাড়ায়।
১৭. মানুষের আশ্রয় মিলবেই
মানুষ কি অবস্থার দাস?
ঈশ্বর ভাবে।
অথবা মানুষ অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা করে চলে বলে মনে হয় অবস্থাই মানুষকে চালাচ্ছে?
লখার মার সুস্পষ্ট প্রেম নিবেদন গোঁয়ারের মতো প্রত্যাখ্যান করেছে, কিন্তু নিজে সে এমনভাবে বিচলিত অভিভূত হয়ে পড়বে সে তো ভাবতেও পারে নি।
তার নিষ্ঠুরতা লখার মা কিভাবে নিয়েছে–এটাই যেন প্ৰাণান্তকর দুর্ভাবনা দাঁড়িয়ে যায় ঈশ্বরের।
ঘরে গিয়ে কাঁদছে?
কিভাবে প্রতিশোধ নেওয়া যায় ভাবছে? অথবা ব্যাপারটা তুচ্ছ করে শূন্যে উড়িয়ে দিয়ে যেমন ছিল তেমনিভাবে চলছে?
লখার মাকে পুষবার মতো অবস্থা যদি তার থাকত।
প্রেম মেনে নিলে ভরণপোষণের দায়টাও মানতে হবে জেনেই তো সে তার সরল সহজ প্রেম নিবেদন অগ্রাহ্য করেছে।
সবাই ওই কথা বলে।
গৌরীকে কিছুদিনের জন্য বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেবার কথা। কিছুদিন বাপের বাড়ির আদর ভোগ করে এলেই গৌরী সামলে সুমলে সুস্থ স্বাভাবিক হয়ে আসবে।
কিন্তু গৌরী যেতে রাজি নয়।
একদিনের জন্যও যেতে রাজি নয়।
ঈশ্বরের কথা শুনে নয়, খানিকটা নিজের গরজেই লখার মা গৌরীকে বুঝিয়ে রাজি করার চেষ্টা করেছিল।
গৌরীর বিশ্রী মন মেজাজের জন্য বাড়িতে ঈশ্বরের নিদারুণ অশান্তি ভোগের ব্যাপারটা লখার মার ভালো লাগছিল না একটা মানুষের জন্য প্রাণে দরদ জাগলে তার দুর্দশা দেখে মন খারাপ হয়ে যায় বৈকি।
গৌরী বাপের বাড়ি গেলে কিছুদিনের জন্য ঈশ্বর রেহাই পাবে এটাই ছিল লখার মার আসল গরজ।
সে কল্পনাও করতে পারে নি বাপের বাড়ি যাওয়ার কথা বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করতে গেলে গৌরী এমন রেগে যাবে, গলা ফাটিয়ে পেঁচিয়ে তাকে এতসব অকথা-কুকথা শুনিয়ে দেবে।
লখার মাকে নিয়ে গৌরীর মনে এমন গভীর বিদ্বেষ জমা হয়েছে ঈশ্বরও সেটা ধারণা করতে পারে নি। গৌরী যেন সেটা তাকে হাড়ে হাড়ে টের পাইয়ে দেবার জন্য উঠেপড়ে লাগে।
ঈশ্বরের সঙ্গে লখার মার নাম জড়িয়ে ঠিক বদনাম না রটলেও রসিক মানুষেরা একট হাসি-তামাশা কি আর চালায় না দুজনকে নিয়ে।
তারই জের টেনে গৌরী স্পষ্ট বলে যে, ঈশ্বরের মতলব সে বোঝে তাকে ভাগিয়ে দিয়ে। খালি বাড়িতে দুজনের মনের সুখে বজ্ঞাতি করার মতলব।
রাগ সামলাতে না পেরে ঈশ্বর একদিন তার গালে একটা চাপড় কষিয়ে দিয়ে বলে, খালি বাড়ি মানে? পিসি রয়েছে কুনো রয়েছে
কে কার কথা শোনে।
চাপড় খেয়ে এমন কাণ্ড শুরু করে গৌরী, মাঝে মাঝে একটু বিরাম দিয়ে ঝিমিয়ে নিয়ে দিবারাত্র বাড়িঘর এমনভাবে মাতিয়ে রাখে যে, তাকে শাসন করতে আর সাহস হয় না ঈশ্বরের।
হয় একেবারে খুন করে ফেলতে হয়, না হলে চুপ করে থাকতে হয়।
শাসন করে লাভ নেই।
লখার মা আসে না।
পথেঘাটে দেখা হলে বলে, না বাবা, আর গিয়ে কাজ নেই। এবার গেলে খ্যাক করে কামড়ে দেবে।
আমি কি করি তবে?
পুরুষমানুষ সামলে নাও।
ঈশ্বর মনে মনে হাসে, প্রাণের জ্বালার হাসি।
লখার মাকেও একটা চাপড় কমিয়ে দিয়ে দেখতে সাধ জাগে লখার মা কি করে।
পুরুষমানুষ!
কে জানে সে কি অপরাধ করেছে পুরুষ হয়ে জন্মে!
এদিকে নদীতে নিয়মিত চলাচল শুরু হয় স্টিমারের গৌরী বিয়োয় আরেকটা বাচ্চা।
বাচ্চা বিইয়ে গৌরীর শরীরে এক আশ্চর্য পরিবর্তন ঘটতে থাকে।
তার মন-মেজাজে নয়–শরীরে।
লখার মা আসে না কিন্তু তার তো দশজনের সঙ্গে কারবার সংসারে চলাফেরার হরেক রকম কায়দা-কানুন জানা আছে।
