পয়সাকড়ির ব্যাপার নয়।
গৌরী মুখ বাঁকিয়ে বলে বটে নাকি। এমনি খাঁটিয়ে নেবে তো? খাতিরে খাটতে তুমি ওস্তাদ আছ বটে।
শুনে ঈশ্বর আহত হয়।
গৌরীও তাকে বোকা ভাবে?
সত্যই সে কি তবে বোকা?
সে অবশ্য অসাধারণ শিকারি। কিন্তু মানুষটা সে বোকা। তার বিশেষ গুণটা চালাক মানুষেরা নিজেদের কাজে লাগায়।
সে বোকার মতো সেটা মেনে নেয়।
বোকামি হয়তো সে অনেক করেছে–সেজন্য গৌরী পর্যন্ত তাকে বোকা ঠাউরেছে। কিন্তু শান সায়েবের মেয়ের বন দেখে আসার শখ মেটাবার জন্য একটা দিনের খাটুনি ব্যয় করা নিশ্চয় তার বোকামি হবে না।
সে বলে, খেয়াঘাটে কাজ দিয়েছিল।
সিন্নি পাঠিয়েছিল সে-সব বুঝি মনে নাই?
গৌরী অদ্ভুত রকম গা-জ্বালানো হাসি হেসে বলে, মনে আছে গো, সব মনে আছে। কিন্তু লাভটা তোমার হল কি?
হয় গৌরীর কথা মেনে নিতে হয়, না হলে লাভ লোকসানের হিসাব দিতে হয়।
গৌরীর হিসাব এবং তার হিসাব যে একেবারে পৃথক হয়ে গিয়েছে সেটা টের পেয়ে ঈশ্বরের প্রায় হৃদকম্প উপস্থিত হয়। সে কোনোমতে বলে, পয়সায় না দিক অন্যভাবে দেবে। অত বোকা আমায় ভাবিস না।
গৌরী আবার তার গা-জ্বালানো হাসি হেসে বলে, তোমার মত চালাক মানুষ জগতে আছে!
গৌরীর মুখ দেখে ঈশ্বর হাত গুটিয়ে নেয়। রোগে শোকে দুঃখে বেদনায় এমন চেহারা হয়েছে গৌরীর।
সে কিনা রাগের মাথায় জ্ঞান হারিয়ে চাপড় কষিয়ে দিতে যাচ্ছিল গৌরীর ওই শীর্ণ গালে!
মনসুরের নৌকায় তারা নদী পাড়ি দেয়।
নুরুল, ফুলজান, লখার মা, রোস্তম আর ঈশ্বর।
ওপারে পৌঁছে কাদায় পা ড়ুবিয়ে নেমে তাদের তীরে উঠতে হয়।
খানিক হেঁটে গিয়ে খালের জলে পায়ের কাদা ধুয়ে নেয়।
গাছের নিবিড় ছায়ায় ঢাকা খাল। এ খাল কেন কাটা হয়েছিল তার মানে কেউ বোঝে না।
বড় গাছের গুঁড়ির শিকড়ের দিকের ফেলনা অংশ দিয়ে ঘাটের মতো ব্যবস্থা করা হয়েছে। কে বা কারা করেছে কেউ জানে না।
ঘাট বলাও ভুল। দুজন মানুষ কোনো রকমে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়াতে পারে।
খালেও নদীর জল। তবে স্রোত নেই, ঢেউ নেই। নদীর জোয়ার-ভাটা শুধু যেন জল বাড়াকমার মারফতে জানান দিতে আসে-যায়।
বড়দিনের সময় ক্লাবের বাবু-বিবি সায়েব-মেমের বড় দল বনভোজনে এসে বনের প্রান্তদেশে উঁকি দিয়েই ফিরে গিয়েছিল, আসল বনের সঙ্গে পরিচয় করার আগ্ৰহ কারো দেখা যায়। নি।
নুরুল বন দেখতে এসেছে। ফাঁকি বরদাশত করতে সে রাজি নয়। বনের গভীরে তারা এগিয়ে যায়, ঈশ্বরের একটিমাত্র বন্দুক আর রোস্তমের ধারালো ভেজালীর ভরসায়।
বনে যে কত রকমের গাছ।
গায়ে গায়ে লেগে পরিপুষ্ট হয়ে মাথা তুলেছে, সবুজের সে কি ঘন নিবিড় মিতালি, শাখায় পাতায়!
লখার মার প্রশ্নের জবাবে ঈশ্বর বলে, ওরে বাবা, বনে কি অন্ত আছে গাছের। সব গাছের নাম আমিও জানি না। কতকগুলি নাম যা জানি বলছি শোন সুঁদরি, অর্জুন, পশুর, গরাণ, ঘোতল, হেতাল জানা, গড়ে, গেউয়া, কেওড়া বাণ, কিরপে, গোল, খলসি, নাটসে সিঙ্গেরা, বলই
লখার মা হেসে বলে, থাক, থাক। মাথা ঘুরিয়ে দিও না। চেনা গাছ তো দেখছি না একটাও?
ঈশ্বরও হেসে বলে, চেনা গাছ? আম জাম বট অশ্বথচাদ্দিকে রোজ যা চোখে পড়ে? গাঁয়ের ওসব গাছের চিহ্ন খুঁজে পাবে না এ বনে।
নুরুল আশ্চর্য হয়ে বলে, সত্যি ভাইজান? ওসব গাছ একটাও নেই?
ঈশ্বর বলে, একটাও নেই। গায়ের গাছ গায়ে, বনের গাছ বনে। এতটুকু মেশাল পাবে না।
লখার মা কথায় ওস্তাদ। ঝোঁপ বুঝে কোপ মারতে জানে।
সে বলে, তা তো হবেই বাছা। গাঁয়ে থাকে মানুষ আর বনে থাকে বড়মিঞা আর তাদের জা ভাইরা। গায়ের গাছ বনের গাছ ভিন্ন হবে না কো?
লখার মাও রয়েল বেঙ্গল টাইগারকে বলে বড়মিঞা!
ওই নামেই বড় বাঘ এই এলাকায় পরিচিত–হিন্দু মুসলমান সকলের কাছে। মেয়ে পুরুষ সকলের কাছে।
এমন ঘন সন্নিবিষ্ট গাছ কিন্তু কি পরিষ্কার বনের মাটি।
ঝরা পাতা ছাড়া কোনো আবর্জনা নেই।
জল কাদা নেই।
কোথা থেকে আজিজ এসে দলে ভিড়ে পড়লে ঈশ্বর তাজ্জব বনে যায়!
বনের মধ্যে তখন তারা বেশ খানিকটা এগিয়েছে।
ফুলজান হাসে, লখার মা হাসে, রোস্তম হাসে–মাথা আরো গুলিয়ে যায় ঈশ্বরের।
ঈশ্বর জিজ্ঞাসা করে, হেথা কি করছিলে তুমি?
আজিজ জবাব দেয়, কি করব? বিড়ি ফুঁকছিলাম।
তখন লখার মা গম্ভীরভাবে জিজ্ঞাসা করে, এগুলোকে কি বলে ঈশ্বর?
ঈশ্বরও গম্ভীর হয়ে বলে, এগুলো শুলো।
শুলোর জন্যই বনে ঢুকতে তাদের অসুবিধা হচ্ছিল।
কাটায় ভরা সরু গাছ। সমস্ত বন জুড়ে মাথা তুলছে।
গা কাটায় ভরা বলেই বোধহয় গাছের মাথাটা সুচালো।
এই কাটাওলা শুলো গাছের জন্যেই বনে চলাফেরা কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়।
বড় গাছ উদারভাবে পথ দেয়।
শুলো গাছ ছিঁচকের মতো পথ আটকায়।
নুরুল আর আজিজ এবং রোস্তম আর ফুলজান কোথায় যে উধাও হয়ে যায় বনের মধ্যে!
ঈশ্বর ভাবে, বাঘ ভালুক ওদের জখম করলে দোষ হবে তার।
লখার মা বলে, গিয়েছে, যাক! আমরাও একটু পিরিত করি এস না। তুমি বড় নীরস মানুষ।
ঈশ্বর বলে, এটাই তবে ওদের আসল মতলব ছিল?
লখার মা বলে, ছিলই তো। তুমি আছ, আমি আছি–দোষ কি?
ঈশ্বর বলে, দশজনে দুষবে সেই জন্যই দোষ–নইলে আর দোষ কি?
হঠাৎ গর্জন করে ওঠে ঈশ্বরের বন্দুক।
খানিক তফাতে অৰ্জুন গাছটার গুঁড়ির পাশে চিতা বাঘটা কাত হয়ে শুয়ে পড়ে।
লখার মার সর্বাঙ্গ থরথর করে কাঁপে।
বাবা, এমনি নজর তোমার! মোর তো চোখেও পড়ে নি!
ঈশ্বর নীরবে একটু হাসে।
