তাকে ঘরে ডেকে আমিনা বিবি একেবারে সামনে এসে এবং তার মেয়ে মায়ের দু-এক হাত পিছনে এসে দাঁড়ালে সে বড়ই আশ্চর্য হয়ে যায়।
কেবল তাই নয়। দুয়ারের কাছে নিজেকে মোটে আধখানা আড়াল করে আরেকজন তরুণীও যে দাঁড়িয়ে আছে এটাও তার চোখে পড়ে।
ঈশ্বর অনুমান করতে পারে, ওই তরুণীটি শান সায়েবের ছেলের বৌ।
গরিব মুসলমান চাষী মজুরের বাড়ির মেয়েদের কথা স্বতন্ত্র, নামেই কেবল তারা পর্দা মানে। তাছাড়া উপায় নেই।
কিন্তু শান সায়েবের পরিবারের মেয়েরা এমন অনায়াসে তার সামনে বেরিয়ে এল!
আমিনা বিবি বয়সে প্রৌঢ়া, তার কথা নয় আলাদা। ফুলজান নিছক বাঁদী, তার কথাও নয় বাদ দেওয়া যায়।
কিন্তু অল্পবয়সী মেয়ে বৌ পর্যন্ত তার কাছে পর্দার মান রাখলে না।
আমিনা বিবি বলে, নুরুলের বাবার কাছে তোমার কথা শুনেছি। তুমি লোক ভালো জানি। তুমি ছেলের মতো বাতচিত করবে, বেইমানি বজ্জাতি তোমার নাই।
এটুকু কৈফিয়ত দরকার ছিল।
ঈশ্বর বিব্রতভাবে বলে, বলুন না কি জন্যে ডেকেছেন।
আমিনার মুখে শান্ত স্নিগ্ধ লাবণ্য বয়সের ভাটার টানের ছোঁয়া লাগা। কিন্তু কথা সে বলে ঝাঁঝালো সুরে। বলে, মেয়েটা জ্বালিয়ে মারল বাবা। যত সব শয়তানি বুদ্ধি। বন দেখে আসার ঝোঁক চেপেছে। বলে কিনা যাবেই যাবে জান কবুল।
বন দেখতে যাবে?
হাঁ। একদম ক্ষেপে গিয়েছে। শান সায়েব গিয়েছে জমিজমার তদারকে। কবে ফিরবে ঠিক নেই। নুরুল বিষম আব্দার ধরেছে যে, সে একবার নদীর ওপারের আসল বন থেকে বেড়িয়ে আসবে।
অনেক দূরের বড় এক শহরের একটি ছেলের সঙ্গে তার বিয়ের কথা চলছে।
বিয়ে হলেই তো সব ফুরিয়ে যাবে।
জীবনে আর হয়তো এত কাছের বনটা দেখার সুযোগ সুবিধা মিলবে না।
নুরুল ঝেঁঝে বলে, একলা যাব নাকি? ফুলজান যাবে, লখার মা যাবে, রোস্তম যাবে—
বড়মিঞাদের কে ঠেকাবে?
কত আদমি কাঠ পাতা আনতে বনে যায়। রোজ যায়–ঘুরে আসে। এক রোজ গেলে মোদের বড়মিঞা গাপ করবে।
আমিনা গলা নরম করে। নরম সে আগেই হয়েছিল, নইলে কি আর এমনভাবে ঈশ্বরকে। ডেকে পাঠিয়ে তার সঙ্গে আলাপ করে।
সে নরম সুরে মেশালো ভাষায় বলে, বহুত আচ্ছা।
কিন্তু মেশালো ভাষায় একটা চরম শর্ত মেয়ের উপর চাপায় আমিনা বিবি। ঈশ্বর যদি তাদের সঙ্গে যেতে রাজি হয় তবেই তারা বন দেখতে যাবার অনুমতি পাবে।
ঈশ্বর যাবে–সাথী হিসাবে নয়।
বন্দুক সাথে নিয়ে।
রক্ষী হিসাবে।
নুরুল মিষ্টি হাসি হেসে ঈশ্বরকে বলে, বল না ভাইজান ওই হিসাবে যাবে? বন্দুক নিয়ে যাবে?
ঈশ্বর বলে, যাব।
কত কি যে ঈশ্বর ভাবে।
নিজের মনের ভাবতরঙ্গের কূল-কিনারা খুঁজে পায় না।
ঠিক যেন স্বভাব-কবি স্বভাব-শিল্পীর সর্বাঙ্গীণ স্বীকৃতি, যশ আর সমাদর লাভ করার অবস্থা।
সে এত বড় শিকারি!
সে বন্দুক হাতে সঙ্গে থাকলে মানুষ ওই বন আর ওই বনের দুরন্ত বাঘকে পর্যন্ত ভয় করা দরকার মনে করে না।
বনের মধ্যে বড়দিনের উৎসব করতে যাবার জন্যে ক্লাবের সভ্যরা তাকে রক্ষী হিসাবে সঙ্গে পাবার জন্যে কি করেছিল কি বলেছিল কিছুই জানা নেই ঈশ্বরের।
নদীর ওপারে ওই গহন গভীর সবুজ বনের ভিতরে পিকনিক করতে গেলে তার হাতে বন্দুক দিয়ে তাকে যে সঙ্গে নেওয়াই চাই–ক্লাবের বিশিষ্টা মহিলা সভ্যারা কত জোরের সঙ্গে, কত আবেগের সঙ্গে এ দাবি তুলেছিল জানলে হয়তো ঈশ্বর হার্টফেল করে মরে যেত।
এটুকু অবশ্য সে বুঝতে পেরেছিল যে, নিরাপত্তার জন্যেই পাকা দেশী শিকারি হিসাবে ভাড়া করে তাকে বড়দিনের পিকনিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এবং তার বন্দুক ফেরত দেবার ব্যবস্থাও হয়েছিল ওই কারণেই।
আজ সে প্রথম টের পায় তার কি রকম খ্যাতি রটেছে।
সে অসাধারণ সবাই এটা বিশ্বাস করে। ক্লাবের মানুষ থেকে শান সায়েবের বাড়ির মেয়েরা পর্যন্ত চাষী মজুর সমাজের সকলে।
কয়েকজন তাকে নানাভাবে মোটামুটি একটা কথাই জিজ্ঞাসা করেছে, কোন পীরের খাতির পেয়েছ যে, তোমার গুলি ফস্কায় না ঈশ্বর?
ছাড়া ছাড়া প্রশ্নের মানেটা এতদিন সে ধরতেই পারে নি।
এসব মানুষ বিশ্বাস করেছে যে, সে অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী।
শুধু গৌরীর যেন ওসব বিশ্বাসের বালাই নেই। তার কোনোরকম বিশেষ ক্ষমতায় কিছুমাত্র বিশ্বাস থাকা তো দূরের কথা, তাকে মানুষ বলে গণ্য করতেও গৌরী যেন রাজি নয়।
লখার মার চিকিৎসায় ফল হয়েছে সন্দেহ নেই। ফলটা ভালো হয়েছে না মন্দ হয়েছে সেটাই ঠিকমতো বুঝে উঠতে পারে না ঈশ্বর।
গৌরীর কান্না থেমেছে, পাগলামি কমে গিয়েছে অবশ্য রসকষ সব শুকিয়ে গিয়ে বিশ্রীরকম কাঠখোট্টা বনে যাওয়া যদি আরেকরকম পাগলামি না হয়।
ভোঁতা নয়, নির্বিকার উদাসীন ভাব নয়, বদমেজাজী ঝগড়াটে স্বভাব নয় রূপলাবণ্যের সঙ্গে তার সবটুকু মায়ামমতা কোমলতা মিষ্টতা যেন নিঃশেষ হয়ে গিয়েছে।
কেঁঝে উঠে কথা কয় না, তবু তার কথার ঝাঝে গা যেন জ্বলে যায় ঈশ্বরের।
এও তার কপাল বৈকি। কচি সবুজ নরম চারাটি শুকিয়ে হয়েছে কাঁটায় ভরা কাঠি, খোঁচা আর আঁচড়ই শুধু জোটে।
শান সায়েবের বাড়ি হয়ে ঘরে ফিরে ঈশ্বর থাকে নানা চিন্তায় আনমনা। গৌরী তার শুকনো কাশির ধমক সামলে শুকনো গলায় বলে, মিছিমিছি ভেবে মরছ কেন? সেরে তো গিয়েছি।
রাগ হলেও ঈশ্বর নিজের ভাবনাচিন্তার মোদ্দাকথাটা বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করে। নুরুলের বনে বেড়াতে যাবার শখের কথাটাও বলে।
সব শুনে গৌরী প্রশ্ন করে, পয়সাকড়ি দেবে কিছু?
