এখন সন্ধ্যা নামছে।
নিজের তার ঘুম পাচ্ছিল। তবু লখার মা বলে, রাতভর না ঘুমোলে ঘুমিও না, ভোরবেলা খসড়াটা মোর চাই।
রোস্তম বলে, দেব। বেশি কাটছাট কোরো না কিন্তু।
না। লক্ষ্মী ছেলের মতো মোর কথাটাও খেয়ালে রেখ কিন্তু।
কদিন বাদে রামসুখলাল ক্লাবের পিয়ন দিয়ে লখার মাকে ডেকে পাঠায়।
লখার মা যায় না।
বলে পাঠায়, নানা কাজে সে নাকি বড় ব্যস্ত মোটেই তার সময় নেই মানুষের সঙ্গে দেখা করার।
অগত্যা রামসুখলাল নিজেই তার ঘরে আসে।
নিয়ে আসে গুরুতর প্রস্তাব।
প্রভাসের বাড়িতে যে পালাগানটি গেয়েছে সেটি ক্লাবে গাইতে হবে–আজ সন্ধ্যায় কিংবা আগামীকাল ছুটির দিন সকাল ছাড়া যে কোনো সময়।
তাড়াতাড়ি করার কারণ–কলকাতা থেকে কয়েকজন সিনেমা আর্টিস্ট ক্লাবের অতিথি হয়ে এসেছে–পালা গানটা শুনবার জন্যে তারা খুব উৎসুক।
পরশু তারা কলকাতায় ফিরে যাবে। পরদিন পাড়ি দেবে বোম্বাই।
লখার মা আশ্চর্য হয়ে বলে, সোনাতলার কেলাবে সিনেমার আদমি?
রামসুখলাল হাসে। তাকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে দেয়। সিনেমায় অভিনয় করতে নেমেছে কি এখানকার ক্লাবের কোনো সভ্য অথবা সভা? তা নয়, আসল কথা হল এই যে, ক্লাবের দু-একজন দিলদরিয়া খুঁটি সিনেমা কোম্পানিতে টাকা লাগিয়েছে। কাজেই তাদের জোর আছে।
যদি তারা কেউ মনে করে যে, লখার মার গল্প বলা লাগিয়ে দিলে বেশ লাগসই হবে, লখার। মা সিনেমা স্টার বনে যাবে বৈকি।
লখার মা ভয় পায়, বিব্রত হয়ে পড়ে। ক্লাবে গিয়ে বাবুদের মেমদের সায়েবদের গল্প শোনাতে হবে। তার সাধ্যে কি কুলোবে এই অসাধ্য-সাধন সম্ভব করা।
রামসুখলালকে বলে দিলেই হত সে যাবে না।
ভেবেচিন্তে কুল কিনারা না পেয়ে সে ঈশ্বরের সঙ্গে পরামর্শ করতে যায়, কি করা উচিত।
ঈশ্বর বলে, ডরাও কেন? তুমি যা বলবে, যেমন বলবে, তাই ওরা খুশি হয়ে শুনবে।
তারপর হেসে বলে, তবে একটা কথা তোমায় বলি, কোনি দেখাবার চেষ্টা কোরো না। বাবুর বাড়িতে যেমন বলেছ তেমনি গল্প বলবে। সেটাই ওরা শুনতে চায়।
গান শুনতে চায়?
কি জানি।
১৬. নানা জাতের এতগুলি মানুষ
নানা স্তরের নানা জাতের এতগুলি মানুষকে নিয়ে বন নদী গ্রাম এবং গ্রামকেন্দ্রিক স্বয়ং-স্ফূর্ত শিল্পকেন্দ্র নিয়ে আমাদের এই সচলায়তনের কাহিনী ফাঁদা হয়েছিল।
এতদূর এগিয়ে দেখা যাচ্ছে, ব্যাপার বড় গুরুতর।
মানুষকে বাদ দেবার প্রশ্নই অবশ্য ওঠে না। সব গল্পই মানুষের কাহিনী, পুরাণে দেবতারা যতই জাঁকিয়ে বসে থাকুন। মানুষ ছাড়া দেবতারও গতি নেই।
কিন্তু একটা অঞ্চল? একটা বিশেষ এলাকা।
হলুদ নদী সবুজ বন, গ্রাম আর একটা শিল্পকেন্দ্রকে বাদ দিলে সঙ্গে সঙ্গে এতগুলি মানুষ একেবারে বাতিল নিশ্চিহ্ন অর্থহীন হয়ে যায়।
অনেক স্তরের অনেক মানুষ।
কিছু বিলিতি আর বিলিতি মেশাল মানুষ পর্যন্ত।
অঞ্চল বা এলাকা আসল?
না, মানুষ আসল?
পৃথক করার উপায় নেই।
বাংলায় এত বৃষ্টি, তবু দুর্ভিক্ষ। মরুভূমির মানুষ উট আর খেজুর সম্বল করে অন্য দেশে পাড়ি দিচ্ছে। হিমালয়কে বশ করে মানুষ তার কোলে বাস করছে।
ঈশ্বর তাই তার সস্তা দেশী বন্দুক দিয়ে রয়েল বেঙ্গল টাইগার শিকার করে কিন্তু অদৃষ্ট মানে।
গৌরীকে বলে, মোর কপালে বাঘটা ওদিন মোর গুলিতে মরেছিল। তাই এবার বেঁচে গেলি। ওদের বন্দুক মোর বন্দুকের দামের ফারাক জানিস? ওরা বন্দুক কেনে হাজার বার শ টাকায়। বাবা এই সেকেণ্ডহ্যাণ্ড বন্দুকটা কিনেছিল ছত্রিশ টাকা দিয়ে।
তাই দিয়ে তো তুমি এদের চেয়ে বেশি শিকার করছ।
সাধে করছি? পেটের দায়ে করছি। ওরা বোঝে না, গণ্ডগোল করে ফেলে–নইলে ওদের সাথে পাল্লা দিতে পারতাম এই বন্দুক নিয়ে? হায় রে মোর পোড়া কপাল!
সময় আর কবে ভালো গেল ঈশ্বরের! তবু তারই মধ্যে যখন একটা বড় দুঃসময় এসেছিল, শান সায়েব তাকে কাজ দিয়েছিল।
হঠাৎ একদিন শান সায়েব পীরপূজার সিন্নি পাঠিয়ে দিয়েছিল–দিন দুই তাদের সকলের পেট চলে যেতে পারে এত পরিমাণে।
সপরিবারে তার উপোস দেবার অবস্থা যে হয়েছিল এটা জেনেই শান সাহেব নিশ্চয় সিন্নি পাঠিয়েছিল।
নইলে হাজার খাতির থাকলেও কেউ কোনো একটা বাড়িতে অত সিন্নি পাঠায় না।
খেয়াঘাটটা হাতছাড়া হয়ে যাবার পর শান সায়েবের অবস্থা খারাপ হয়ে পড়েছিল।
ঈশ্বর ভাবে, মানুষটার জন্যে তার যদি কিছু করবার ক্ষমতা থাকত।
সিন্নি দিতে এসে ফুলজান গৌরীর সঙ্গে ভাব করে গিয়েছিল। মাঝে মাঝে সে গৌরীর কাছে আসে।
একদিন সে এসে জানায় যে, শান সায়েবের স্ত্রী আমিনা বিবি ঈশ্বরকে একবারটি ডেকে পাঠিয়েছে।
সে জানায় গৌরীকে। গৌরী জানায় ঈশ্বরকে।
আমিনা বিবিকে ঈশ্বর দু-একবার চোখেই শুধু দেখেছে। শান সায়েবের বদলে সে তাকে ডেকে পাঠিয়েছে শুনে চমৎকৃত হয়ে ঈশ্বর জিজ্ঞাসা করে, কি ব্যাপার গো?
গৌরী বলে, একটু নাকি পাহারাদারির দায় চাপাবে তোমার ঘাড়ে। ছুটির দিনে অবিশ্যি।
কারখানায় পাহারাদারি করে ঘরে ফিরেছে। বেলা আর নেই।
সেদিন ঈশ্বর যায় না। পানশিন আমিনা বিবির হঠাৎ এমনভাবে তাকে ডেকে পাঠানোর মানে কি ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ে।
পর্দা আছে কিন্তু সেটা বজায় রেখে আড়াল থেকে তার সঙ্গে কথা বলা অবশ্য দোষের হবে না।
কে জানে কি বলবে শান সায়েবের স্ত্রী।
পরদিন ছিল শনিবার।
সে হিসাবটাই ঈশ্বর করেছিল। সকাল সকাল ছুটি পেয়ে সে সোজা শান সায়েবের বাড়িতে গিয়ে হাজির হয়।
