মেয়েদের ভিড় জমে কিন্তু লখার মার গল্প বলা যেন তেমন জমে না।
পাওনা গণ্ডা আর ভালোমন্দ খাওয়া জোটে ভালোই কিন্তু লখার মা কিছুমাত্র কৃতজ্ঞতা বোধ করছে বলে তো মনে হয় না।
ঈশ্বরের বাড়ির সামনের মাঠে মস্ত জমায়েতের হৃদয় জয় করে লখার মার খুব নাম ছড়িয়েছে। তার গ্ৰাম্য কথকতার জনপ্রিয়তার খবর উপরতলাতেও কিছু কিছু পৌঁছে গিয়েছে।
মেঘনাদের কাছে বনানী সব শুনতে চায় কত লোক হয়েছিল, কথকতার বিষয় কি ছিল ইত্যাদি বিবরণ। মেঘনাদ অন্য সব খবর জানায়, শুধু ফাঁস করে না পালা গানটির আসল মজা মজাদার ছড়াগান আর রূপকথার বানানো কথায় কেমন চানাচুরের ঝাল মসলার মতো মেশানো ছিল চাষী মজুরের প্রাণের জ্বালার ঝাঝ।
মেঘনাদ কি কম চালাক! কাহিনীটা একেবারে উল্টো দাড় করায়, বনের পরী খেয়ালের বশে মজা করতে খেলা শুরু করেছিল দুজনের সাথে।
বনানী বলে, হা হা জানি। সাধুর শাপে রাজার ছেলে দিনের বেলা কাঠুরে হয়ে যেত, রাত্রে হত শিকারি। সোনামুখীর কাছে সব শুনেছি।
শুনে মেঘনাদ চমৎকৃত হয়ে যায়। ইতিমধ্যে সোনামুখী তবে এসেছিল অর্থাৎ বনানী তাকে ডেকে পাঠিয়েছিল। কিন্তু সোনামুখীর কাছে সব জেনে নিয়ে থাকলে কিছু না জানার ভান করে তাকে আবার জিজ্ঞাসাবাদ করা কেন?
বনানী একদিন লখার মাকে ডেকে বলে, রোববার বিকেলের দিকে একটা আসর বসাব ভাবছি। অন্য সব ব্যাপার থাকবে নানা রকম–তার মধ্যে ঘণ্টাখানেক ঘণ্টা দেড়েক তোমার কথকতা লাগিয়ে দেব। কয়েকজন শুনতে চেয়েছে–ভালো করে বলতে হবে কিন্তু সেদিন গৌরীদের বাড়ির বাইরে যেমন বলেছিলে। জোড়াতালি দিয়ে চালিয়ে দিও না যেন।
ঈশ্বরের কুঁড়ে নয়, গৌরীদের বাড়ি।
বনানী এত শুনেছে এত জেনেছে–ঈশ্বরের কুঁড়েঘরের একত্তি উঠোনে কুলোয় নি বলে। সেদিন কেন আর কিভাবে সামনের ফাঁকা জমিতে আসরের আয়োজন হয়েছিল, সে বর্ণনা কি শোনে নি বনানী?
লখার মা জিজ্ঞাসা করে, সবাই বড় ঘরের মানুষ? শুধু মেয়েছেলে না ব্যাটাছেলেও থাকবে?
বনানী হেসে বলে, শুধু মেয়েছেলে ব্যাটাছেলে নয়–দু-পাঁচজন সায়েব-মেমও থাকবে। তাই তো ডেকে পাঠিয়ে আগে থেকে জানিয়ে রাখলাম ভালো করে তৈরি হয়ে এস! তোমার ওই পালাটা বোধহয় চলবে না, অনেকক্ষণ সময় লাগবে না?
ছোট করে চালিয়ে দিলে হয়, সে ঠিক করে নেয়া যাবে। মেমসায়েবরা মোর কথা বুঝবে?
বুঝলে বুঝবে, না বুঝলে না বুঝবে, শুধু শুনে যাবে। দশজনের কাছে বড়াই করবে, খাঁটি ফোক্ কালচারের নমুনা দেখেছে।
লখার মা খানিকক্ষণ নিজের মনে ভেবে বলে, ওদের তিনজনাকেও চাই কিন্তু মা–সেদিন যারা খোল ব্যায়লা বাজিয়েছিল, ধুয়ো ধরেছিল। একলা জমাতে পারব না।
কত দিতে হবে ওদের?
বেশি দিতে হবে না গো মা–যা দেবে তাই খুশি হয়ে নেবে। টের পেয়েছে সে দিনকাল আর নেই। তবে কিনা পেশাদার মানুষ তো নয় যে, পয়সাটাই বড় দেখবে।
তাই তো ভাবছি–তিনজনাকে নে আসতে পারলে হয়। গুণী মানুষ, পাগলাটে স্বভাব। ভূতনাথ যা গাজায় দম দেয়–শিবঠাকুর হার মানবে। রোজ টানে না তাই রক্ষা!
বনানী ভয় পেয়ে বলে, তবেই তো মুশকিল করলে। আমি ভাবছিলাম অন্য প্রোগ্রামগুলি আরো ছাটাই করে তোমারটাই আসল আইটেম করব, দরকার হলে আরো আধঘণ্টা টাইম তোমায় বেশি দেব–
লখার মা হেসে বলে, ভাবছ কেন বৌরানী-মা? দায় নিয়ে তোমায় ড়ুবিয়ে দেব–লখার মা তেমন মানুষ নয় গো, নয়। নিজে গিয়ে বলে আসব–না এসে যাবে কোথা? কটা দিন একটু তালিম দিয়ে নিতে হবে। এ তো আর গেঁয়ো ভূতদের পালা শোনানো নয়–সুর যাবে এক খাতে, বাজনা চলবে আর এক ধাতে, তাল কাটবে ফটাস ফটাস, সবাই ভাববে ওটাই বুঝি পালাগানের কায়দা। সমঝদার মানুষের কাছে ফাঁকি চলবে না মোটে। ভদ্র মানুষ, চুপটি করে শুনে যাবে জানি মনে মনে হাসবে আর টিটকারি দেবে লখার মাকে।
বনানী ভরসা পেয়ে বলে, হ্যাঁ সেটা খেয়াল রেখ–যাই গাও খেলো যেন না হয়ে যায়।
ভেব না বৌরানী-মা, আসর জমিয়ে দেব।
তখন একটু সঙ্কোচের সঙ্গে বনানী এক অদ্ভুত প্রস্তাব করে। বলে তুমি যদি চাও, আমি অর্গান নয় তো পিয়ানো বাজাতে পারি।
সে তো খাপ খাবে না মোটে।
আমিও তাই ভাবছিলাম।
আসর লখার মা সত্যই জমিয়ে দেয়।
কটা দিন মোটে সময় ছিল। ঈশ্বরকে দিয়ে রোস্তমকে ডেকে এনে লখার মা রাতারাতি ফরমাশী পালাগান দাবি করে বসে। বড় কিছু দরকার নেই–একঘণ্টা সোয়া একঘণ্টার মতো জমজমাট পালা তৈরি করে দেওয়া চাই। লখার মা তার সঙ্গে কথা গান জুড়ে নেবে।
বিষয় হবে বর্ষা এবং বাঁধ ভাঙা বন্যা। রোস্তমকে সাবধান করে দিয়ে লখার মা বলে, শুধু চেহারাটা তুলে ধরবে, ব্যাপারটাকে রূপ দেবে ব্য। যত ভয়ঙ্কর করতে পার আপত্তি নাই। কিন্তু হুঁশিয়ার ভাই, কাউকে খেচাবে না, কে দায়ী তাই নিয়ে ছেলেমানুষি প্যানপ্যানি জুড়বে না।
রোস্তম বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে চোখ বুজে তার ফরমাশ শুনে যায়। মনে মনে বোধহয় বর্ষাকে। আর বাঁধ ভাঙা বন্যাকে ভাষায় রূপ দেবার কসরত এখন থেকেই শুরু করে দেয়।
লখার মা বলে, বুঝলে তো ভাই আসল কথা? কি জন্যে কে দায়ী তা সবাই জানে, কচি খোকা তো কেউ নয়। রেগেমেগে কেঁদে কুঁদে নালিশ করা তোমার আমার কমো নয়। গায়ের জ্বালায় সস্তা ঝাল ঝড়তে গেলে ইদিক নষ্ট, উদিক নষ্ট।
বনানীর সঙ্গে কথা কয়ে কয়ে, তথাকথিত ঘরে তৈরী মাখন গলানো খাঁটি গাওয়া ঘিয়ের লুচি তরকারি মিঠাই সন্দেশ খেয়ে নিরঞ্জনদের তিনজনের বাড়ি হয়ে ঘরে ফিরতে বেলা পড়ে এসেছিল।
