বনানীকে দশজনের চেয়ে চেয়ে দেখা নিজের চোখে চেয়ে দেখেই প্রভাসের অহঙ্কার ও আনন্দ উল্লাসের যেন সীমা থাকে না। বনানীকে ভালবাসার জন্য, আদর করার জন্য এক অদম্য অদ্ভুত ব্যাকুলতা ও উন্মাদনা জাগে। বাড়িতে যাকে সর্বদা কাছে পাওয়া যায়, আদরে সোহাগে আপন করা যায়, আলিঙ্গনের বাঁধন মানতে যে সুখী হয় অনাত্মীয়া অলভ্যা প্রিয়ার মতোই তার চলাফেরা প্রভাস মন্ত্রমুগ্ধের মতো চেয়ে দ্যাখে।
তবু কেন পেগ চালিয়ে যায়। কোনো তত বাধা নেই মদ গেলার পালা সাঙ্গ করে সজ্ঞানে ওই বনানীকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি ফেরার–নানা বেশে সাজিয়ে অথবা সমস্ত সাজ খুলে ফেলে দুটি চোখ দিয়ে প্রাণ ভরে ওর রূপ দেখার।
কিন্তু প্রভাস জানে, বাড়ি যখন ফিরবে, বনানীর সঙ্গেই হয়তো ফিরবে, ততক্ষণে মন থেকে মিলিয়ে যাবে এই রঙিন মোহ নেশার রঙে জগৎ সংসারের মতো বনানীও অন্যরকম হয়ে যাবে।
মাতাল হয়তো সে হবে না, রোজ সে মাতাল হয় না। কিন্তু বনানীর জন্য এখানকার এখনকার এই মোহের ঘোরটাকে বাড়ি ফিরে মনে হবে হাস্যকর ছেলেমানুষি মমি।
ক্লাবে বনানী নানারকম কানাঘুষা শোনে। সে সমস্তের মোট কথাটা এই যে, চাষী মজুরেরা নাকি ক্ষেপে যাবার ফিকিরে আছে।
ইভা তাকে বলে, তোমার ভদ্রলোকটির হয়েছে দুদিক দিয়ে মুশকিল। একদিকে জমিদারি, আরেকদিকে কারখানা। অথচ ওর কিন্তু বেশ নিশ্চিন্ত ভাব। শুধু কারখানার ভাবনায় বার্টির রাত্রে ঘুম হয় না।
বনানী বলে, ঘুম পাড়িয়ে দিলেই পার।
একসাথে বাড়ি ফেরার সময় প্রভাস প্রায় প্রকৃতিস্থ থাকলেও বনানী ওসব কথা তোলে নাসকালবেলার জন্যে মুলতুবি রেখে দেয়। একথা ওকথা বলতে বলতে একসময় সহজভাবে জিজ্ঞাসা করে, আজ বাড়ি গিয়ে আর না খেয়ে পারবে না?
প্রভাস সরলভাবে বলে, বাড়ি গিয়ে চেষ্টা করে দেখি। কথা দিয়ে হয়তো কথা রাখতে পারব না।
বাড়ি ফিরে দোতলার মন্দিরের পাশে খোলা ছাদে আকাশের নিচে চুপচাপ বসে প্ৰভাস খানিকক্ষণ নিজের মনে কি যেন সব ভাবে।
তারপর মেঘনাদকে ডেকে বোতল গ্লাস দিতে বলে বনানীকে ডেকে পাঠায়। বনানীর সামনে নিজের হাতে গ্লাসে মদ ঢালে। বনানী লক্ষ করে, পেগের হিসাব বাতিল করে সে খুশির হিসাবে
মদ ঢেলেছে।
বনানী গা এলিয়ে দেয় না। জোরে একটু নিশ্বাস পর্যন্ত ফেলে না।
আশ্চর্য এই, এ অবস্থাতেও সে তুলতে পারে না যে, তার বড় খিদে পেয়েছে। প্রভাস ডেকে না পাঠালে সে খেতে বসে যেত।
প্রভাস গ্লাসে চুমুক দিয়েও আশ্চর্য রকম ধীর শান্ত স্বাভাবিক গলায় কথা বলে–বনানী ভাবে, আর কতক্ষণ বজায় থাকবে এই শান্ত সুস্থ ভাব?
প্রভাস বলে, আমি কি ভাবি না? বুঝবার চেষ্টা করি না? অনেক ভেবেছি, এটুকু বুঝেছি যে, আমার মধ্যে একটা সাংঘাতিক গলদ আছে–কিন্তু আসল ব্যাপার আজো বুঝতে পারি নি। বিশ্বাস কর, শুধু নেশার জন্যে আমি মদ খাই না, অন্য কারণ আছে। এটা আমার কল্পনা নয়, বানানো কথা নয়। তুমি যখন গঙ্গাসাগরে গিয়েছিলে, আমি কলকাতায় তিনজন বড় স্পেশালিস্টের সঙ্গে কনসাল্ট করেছি। অনেকরকম পরীক্ষা দরকার ছিল, সে সব ভবিষ্যতের জন্য রেখে আমি শুধু মোটামুটি ওপিনিয়ন চেয়েছিলাম। ওদের মতও তাই–আমার মধ্যে একটা গোলমাল আছে। শারীরিক মানসিক কারণ জড়ানো গোলমাল–জটিল ব্যাপার। ব্যাপারটা ধরতে সময় লাগবে, চিকিৎসা করে সারাতেও সময় লাগবে।
বনানী চুপ করে থাকে।
আরেকবার গ্লাসে চুমুক দিয়ে প্রভাস বলে যায়, মানে জানি না কিন্তু ব্যাপারটা জানি। আমার কিছু ভালো লাগে না। কোনো অভাব নেই, স্বাস্থ্য খারাপ নয়, তোমার মতো এমন আমার বৌ তবু আমার কিছু ভালো লাগে না। দুঃখ কষ্ট কিছু নয়, জ্বালা যন্ত্ৰণা টের পাই না, জীবনটা শুধু বিস্বাদ লাগে। অসুখ নেই কিন্তু সুখ বলেও আমার যেন কিছু নেই। সোজা কথায় ব্যাপারটা কি দাঁড়ায় জান? ধর দিন-রাত সবসময় তুমি কিছু চাওকী চাও তা জান না।
বনানী চুপ করে থাকে।
মনে মনে হাসছ না তো?
বনানী এ কথার জবাব না দিয়ে বলে, কিছুদিন বাইরে গিয়ে থাকলে, বিশ্রাম করলে–
প্রভাস একটু হাসে। বাইরে যাই নি আমি?–কতবার গিয়েছি তুমিও তো জান। একা গিয়েছি, তোমায় সঙ্গে নিয়ে গিয়েছি, কিন্তু স্বস্তি পাই নি।
বনানী ভেবেচিন্তে বলে, এটাই হয়তো বৈরাগ্য–মানুষ যেজন্যে সংসার ছেড়ে চলে যায়, সন্ন্যাসী হয়ে যোগসাধনা করে।
প্রভাস গ্লাসটা খালি করে, বলে, সংসার ছাড়তে আমার একটুও ইচ্ছা করে না। আমি যে ভালো না লাগার কথা বলছি তার অন্যরকম মানে কোরো না। তোমার সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হলে আমি কয়েকদিনের মধ্যেই মরে যাব।
বনানী চুপ করে থাকে।
প্রভাস এবার খানিকটা বিহ্বলতা, খানিকটা ব্যাকুলতার সঙ্গে বলে, বিশ্বাস কর, সত্যি মরে যাব। লোকে হয়তো বলবে মদ খেয়ে খেয়ে মরেছে কিন্তু আসলে তোমার জন্যেই মরে যাব।
বনানী বলে, তা জানি। মাতাল হয়েও নইলে আমার ধমকে ঠাণ্ডা হয়ে যাও।
নেশা জমাট বাঁধছিল, প্রভাস খুশি হয়ে উঠে এসে বনানীর মাথায় গাল রেখে দাঁড়ায়, একটু জড়ানো সুরে বলে, আঃ, কী সুন্দর গন্ধ তোমার চুলে।
বনানী বলে, আমি কিছু খাই নি কিন্তু–আমার ভারি খিদে পেয়েছে।
বনানীও মাঝে মাঝে লখার মাকে ডেকে পাঠাত।
খেয়ালের বশে ডেকে পাঠায়। অলস এবং অসহ্য দুপুরটা তার রূপকথা গল্পকথা শুনে কাটিয়ে দেবার জন্যে। দুপুরবেলা প্রভাস কাছারিতে বসে, কারখানায় যায়। কোনোদিন বাড়ি ফেরে, কোনোদিন সটান ক্লাবে গিয়ে হাজির হয়।
