মিনার্ভা।
মিনার্ভাকে তুমি জানলে না বুঝলে না ইয়ংম্যান।
মিসেস জনসনের ছোট বোনের নাম মিনার্ভা।
কুমারী জীবনে খুব নার্ভাস মেয়ে ছিল। বিয়ের পর তারই কপালগুণে যেন তারই নিরীহ গোবেচারি মিউ-মিউ করা স্বামীর ভাগ্যে শিকে ছিঁড়ে যায়–মার্কিন মুলুকের বিরাট এক যৌথ প্রতিষ্ঠানে মস্ত এক কাজ জুটে যায়। ইণ্ডিয়া সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আছে গ্রেগরীর মতো এরকম। একজন স্মার্ট যুবকই তারা চাইছিল। বছর দুই তাদের খরচে তাদের দেশে গিয়ে যথারীতি ট্রেনিং নিয়ে পোক্ত হয়ে ইণ্ডিয়াতে ফিরে আসবে।
স্বামীর সঙ্গে দু বছর আমেরিকায় কাটিয়ে আসতে গিয়ে কিভাবেই যে কেটে গেল মিনার্ভার লাজুকপনা, একেবারে পাল্টে গেল তার ভীরু নরম স্বভাব!
কলকাতায় ফিরে সুন্দর সাজানো বড় ফ্ল্যাটে রানীগিরি শুরু করতেই তার দাপটে অস্থির হয়ে উঠল গ্রেগরী থেকে শুরু করে বয় খানসামা বাবুর্চিরা। কিছুদিনের মধ্যে গ্রেগরী ফ্ল্যাট তুলে দিয়ে আশ্রয় নিল হোটেলে। মিনার্ভার অধিকার রইল হোটেল কিংবা ছোটাখাটো ফ্ল্যাটে ভাড়া নিয়ে বাস করবার সমস্ত খরচ চলবার ব্যবস্থা অবশ্য করা হল গ্রেগরীর পৈতৃক পয়সায়।
কিছুদিন মিনার্ভা খুব হৈচৈ করে কাটায়, তারপর কিছুদিন আবার কেমন ঝিমিয়ে যায়, বিষণ্ণ মনমরা হয়ে থাকে।
এ ভাবটা কেটে যাবার জন্যে সে কিছুদিন বোনের কাছে কাটিয়ে যায়। বেশ শান্ত স্বাভাবিক ও ধাতস্থ মনে হয় এখন তাকে। হাসিখুশি ভাবও দেখা যায়।
প্রভাস সেদিন একটু দেরি করে ক্লাবে পৌঁছে কোন টেবিলে কাদের সঙ্গে ভিড়বে চিন্তা করার জন্য টাইটা নিয়ে অযথা নাড়াচাড়া করছিল, মিনার্ভা এসে সাদর আহ্বান জানায়, আমাদের টেবিলে আসুন না? অনেকদিন আপনার কাছে পুরোনো দিনের শিকার কাহিনী শুনি নি।
প্রভাস টাই নাড়া বন্ধ করে হাত নামিয়ে মুখে একটা অদ্ভুত হাসি ফুটিয়ে অতি ধীর অতি মৃদু এবং অত্যধিক মার্জিত সুরে বলে, আমি একটা পেগ অফার করলে আপনাকে খেতে হবে কিন্তু!
আমি তো পেগ খাই না!
একটা ছোট কক্টেল?
তা দেবেন। সেজন্যে কি!
রবার্টসন বসেছে কোনার দিকের ঈষৎ আড়াল করা বড় টেবিলে। আরো কয়েকজন সেখানে বসেছে বটে কিন্তু প্রভাসের জন্য আসন মিনার্ভার দখলে ছিল। টেবিলের অপরদিকে একেবারে রবার্টসনের মুখোমুখি প্রভাসকে বসতে হয়। মিনার্ভা তখন রবার্টসনের কাঁধে হাত রেখে প্রভাসকে বলে, আমাকে পেগ খাওয়াবেন বলছিলেন, আপনার উচিত এ বেচারাকে একটা পেগ অফার করা। দেখুন দিকি, আপনার স্ত্রী কেমন ইভাকে বাগিয়ে নিয়ে গিয়ে একে একটি বসিয়ে রেখেছে।
রবার্টসন বলে, একলা কিরকম? তুমিই তো আছ!
প্ৰভাসকে জিজ্ঞাসা করতে হয় কোন জাতীয় মদের পেগ রবার্টসন পছন্দ করবে এবং রবার্টসনকেও জবাব দিতে হয় যে, ছোট একটা হুইস্কি হলেই যথেষ্ট হবে।
তারপর রবার্টসন এমনভাবে কথা বলে যেন তাদের মধ্যে কোনোদিন কোনোরকম বিবাদ বিসম্বাদ হয় নি, কিছুকাল দুজনের দেখা সাক্ষাৎ যেন বন্ধ ছিল–এই মাত্র।
নিয়ম রাখতে রবার্টসনকেও পেগ অফার করতে হয়, কিছু পানীয় পেটে যাবার পর দিলদরিয়া ভাবটা এসে গেলে তাদের আলাপের প্রাথমিক আড়ষ্টতাটুকুও কেটে যায়।
তাদের ভাব হওয়া দরকার। প্রভাসও যে এটা সত্যই মেনে নিয়েছে সে বিষয়ে সুনিশ্চিত হতে বেশি বিলম্ব হয় না রবার্টসনের।
পেগ আনতে হুকুম দিয়ে রবার্টসন গভীর সহানুভূতির সঙ্গে বলে, বেশ একটু কাহিল লাগছে। ব্যাপার কি?
প্রভাস হেসে বলে, সেই চিরন্তন ব্যাপার ঝাট। ঘরে ঝাট, বাইরে ঝাটকত আর সইতে পারা যায় বল? তোমাকেও তো তেমন তাজা মনে হচ্ছে না?
রবার্টসন মুখ খোলার আগেই মিনার্ভা বলে ওই যা বললেন ওরও ঘরে-বাইরে ঝাট। ওকে আজ সবাই ঘেরাও করেছিল? খবর পেয়ে এমন ঘাবড়ে গিয়েছিলাম আমি।
মিনার্ভা ছোট কক্টেল খেতে রাজি হওয়ামাত্র প্রভাস অর্ডার দিয়েছিল, ইতিমধ্যেই সেটা এসে গিয়েছে এবং মিনার্ভা এক চুমুকে গিলে ফেলেছে।
কত যে শক্ত সতেজ তাজা মনে হচ্ছে তাকে।
রবার্টসন নিজেই বলে, তুমি ছোট একটা অফার করেছ, আমি এবার বড় একটা আনিয়ে দিই। ছোটতে ওর মাথা ঘুরে যায় তারপর বড় একটা এলে সব ঠিক হয়ে যায়।
মিনার্ভা চটে বলে, কেন মিছে আমার নিন্দে করছ?
রবার্টসন মিষ্টি সুরে বলে, নিন্দে করছি? প্রশংসা করছি তোমার ছোটর পর বড় একটা খেয়েও তুমি ঠিক থাকতে পার।
প্রভাস কৃত্রিম গাম্ভীর্যের সঙ্গে যোগ দেয়, এত কম বয়সে ওরকম ঠিক থাকতে না পারাই কিন্তু আপনার উচিত।
মিনার্ভার মুখে খুশির হাসি ফোটে।
বাঁকা কথা, ফাঁকা কথা। সবাই জানে রাত বাড়তে বাড়তে মিনার্ভার আরো কয়েকটা ককটেল চলবে রোজই চলে। অথচ মিনার্ভার খুশির ভাবটা কৃত্রিম নয়।
আগে ক্লাবে বনানীর পদার্পণ ঘটত কদাচিৎ বিশেষ কোনো উৎসব অনুষ্ঠানের ব্যাপার। থাকলে। ক্লাবের সভ্য হলেও সে বাইরের নিমন্ত্রিতাদের একজনের মতো আলগোছে গা বাঁচিয়ে বিশেষ অনুষ্ঠানে যোগদানের দায় সেরে বিদায় নিত।
ক্লাবের দৈনন্দিন মেলামেশা খেলাধুলা গল্পগুজব আনন্দ করার সঙ্গে কোনোদিন তার সম্পর্ক ছিল না।
আজকাল মাঝে মাঝে আসে, ক্লাবের সান্ধ্য জীবনে অংশগ্রহণ করে। কারো সঙ্গে মেলামেশা আলাপ আলোচনায় তার এতটুকু দ্বিধা সঙ্কোচের ভাব দেখা যায় না।
জমকালো রূপ, বেশভূষাতেও এদেশী আভিজাত্যের মার্জিত রুচির চরম নিদর্শন–নিজেকে জাহির করার জন্যেই বনানী যেন এভাবে সেজেগুজে ক্লাবে আসে।
