তবু বুঝি বনানীর মন মানে নি।
নিন্দা রটেছে। সবাই বলছে, ছি ভদ্রঘরের বৌ ইট মেরে মাথা ফাটিয়ে দিল একটা মানুষের!
অহল্যা সেটা স্বীকার করছে না।
সে বলছে, মালী বাগানের কোনায় উঁচু নিমগাছটায় উঠে পড়ে গিয়ে মাথা ফাটিয়েছে।
এখন ফলের অসময়।
আম-জাম পাড়তে গাছে উঠে পড়ে গিয়ে মাথা ফাটিয়েছে বললে লোকে হাসবে।
অহল্যা তাই গল্প বানিয়েছে।
সে নিমের দাঁতন দিয়ে দাঁত মাজে।
তার জন্যে নিমের দাতন আনতে গাছে উঠে পড়ে গিয়ে তার স্বামীর মাথা জখম হয়েছে।
কলকাতা ঘুরে গঙ্গাসাগর হয়ে আসার মজা উপভোগ করতে প্রথমে অহল্যা রাজি হতে চায় নি।
মজায় যেন তার বিতৃষ্ণা জন্মে গিয়েছে।
বনানীর বাগানের কোণে বুনন ঘাসে ছাওয়া কুঁড়েঘরটিতে মুখ খুঁজে থাকতেই সে যেন ভালবাসে।
বনানী প্ৰায় আদরের সুরে বলে, লক্ষ্মীসোনা, পাগলামি করিস নে। বুড়ি দুটোকে সঙ্গে নিচ্ছি, জ্বালিয়ে মারবে। তুই থাকলে তবু আমায় একটু দেখাশোনা করতে পারবি।
গিন্নিমা এত নরম হয়ে এমনভাবে আব্দার করলে আর কি আপত্তি করা সম্ভব হয় অহল্যার পক্ষে, নিছক একটা মালীর বৌ।
অগত্যা তাকে বনানীর সঙ্গে যেতে হয়।
বনানী তাকে দুটো পুরোনো শাড়ি দেয়।
ছেঁড়া নয়। প্রায় নতুনের মতো।
তবু ওই দামি ভালো শাড়ি পরলে কী বিশ্রীই যে দেখায় অহল্যাকে।
১৪. ঈশ্বরের কাঁচা ঘর
একবার লিখছি ঈশ্বর, গৌরী, আজিজ, শান শায়েব, ফুলজান, মন্টা, সাধুদের কাহিনী। আবার আসছি প্রভাস, বনানী, ইভা, রবার্টসনদের কথায়।
ঈশ্বরের কাঁচা ঘর, লক্ষ্মণের খেয়াঘাট, উড়িয়া মালী আর অহল্যায় মিলেমিশে প্রভাসের বাগানটিকে এমন করার প্রাণপণ সাধনা যে কোনো সায়েবের বাগান তার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারবে না, ক্লাবে সন্ধ্যার দিকে নাচ, গান, হাসি, আনন্দ, তাস, বিলিয়ার্ড খেলা–বেশি রাত্রে হৈ-হুল্লোড়।
একেই কি বলে প্যারালাল মানে সমান্তরাল কাহিনী? বুদ্ধি খাঁটিয়ে চালাকি করে উচ্চ, মধ্য এবং নিম্ন অর্থাৎ চাষী মজুরদের হাজির করে ছককাটা গল্প রচনা করা?
এতকাল সাহিত্যচর্চা করে আমার কাণ্ডজ্ঞান তাহলে নিশ্চয় লোপ পেয়েছে বলতে হবে।
শ্ৰেণীবিভক্ত জীবন কোনো দেশে কস্মিনকালে প্যারালাল বা সমান্তরাল ছিল না, এখনো নেই, সোনার পাথরের বাটির মতোই সেটা অসম্ভব ব্যাপার।
কথাটা ভুল বোঝা সম্ভব–আরো স্পষ্ট করার চেষ্টা করি। আমি বলছি জীবনের কথা–শ্রেণীতে শ্রেণীতে ভাগ হয়ে হয়েও একত্র সংগঠিত সমগ্র সমাজের কথা। সমান্তরাল কাহিনী খুবই সম্ভব, একটু কায়দা করে বানিয়ে লিখলেই হল—কিন্তু সম্পর্কহীন সমান্তরাল জীবন?
ঈশ্বর, আজিজরা থাকে এক স্তরে, প্রভাস রবার্টসনরা আরেক স্তরে। তাই বলে জীবন কি। তাদের সম্পর্কহীন?
পরকে বাদ দিয়ে তাদের কারো জীবনযাত্রা সম্ভব?
সম্পর্ক কি শুধু প্রেমে হয়! সংঘাত সম্পৰ্ক নয়?
১৫. আবার ভাব হয়ে গিয়েছে
আবার ভাব হয়ে গিয়েছে প্রভাস ও রবার্টসনের মধ্যে।
এটা ঘটিয়েছে জনসন, চারিদিকের অবস্থা সম্পর্কে সাদারল্যান্ডের সঙ্গে দুদিন নানারকম আলাপ আলোচনা চালাবার পর। দুজনেই প্রবীণ এবং অভিজ্ঞ, বুদ্ধিমান ও হিসাবী তো বটেই।
কিছুদিন থেকে বেশ চিন্তিত দেখাচ্ছিল দুজনকে। চিন্তার কারণও ছিল।
পঁচটি কারখানাতে অসন্তোষ ধোঁয়াচ্ছে, বড়রকম ধর্মঘট ও গুরুতর হাঙ্গামার সম্ভাবনা আর গণনার বাইরে নেই।
এদিকে দেখা দিয়েছে দুর্ভিক্ষের সম্ভাবনা।
গত বর্ষার আগেও বধের জরুরি সংস্কার কেন হয় নি বলে, প্রাণের জ্বালায় টেবিলে ঘুসি মেরে মেরে সাদারল্যাণ্ড জনসনের কাছে আফসোস করেছে।
এভাবে চলতে দিলে আর বেশিদিন তাদের টিকতে হবে না এদেশে।
আগেরবার কিছু ক্ষেতে লোনা জল ঢুকেছিল, এবার আরো ব্যাপকভাবে বেশি পরিমাণে লোনা জল ঢুকেছে–বন্যা যে হয় নি তাই রক্ষা।
ক্ষেতে একবার লোনা জল ঢুকলে বছর তিনেকের মধ্যে সে ক্ষেতে ফসল একরকম ফলেই না।
ফলনও এবার ভালো হয় নি। এমন উর্বর এলাকা, একটু খেটে বীজ ছড়িয়ে দিলে অকৃপণ উদারতার সঙ্গে মাটি তার শতগুণ ফিরিয়ে দেয় এবার কি হয়েছে কে জানে, চাষীর ভাগ্যে ফসল হয়েছে অতি বিরূপা সৎ-মার দানের মতো।
হয়তো খারাপ বীজের জন্য, অথবা হয়তো এলোমেলো বর্ষার জন্য আবাদ করার কোনো অজানা এবং অনাবিষ্কৃত ত্রুটির জন্য।
কিন্তু ঘনায়মান বিপদটা অতি বাস্তব। চারিদিকে চাষীর ঘরে ছড়িয়ে পড়া খিদের আগুন মজুরদের রেয়াত করবে না। অনেক মজুর পরিবারগতভাগে আধাচাষী বলেই শুধু নয়, দুর্ভিক্ষের চড়া বাজার ষোল আনা খাঁটি মজুরকেও কাহিল করে ফেলবে, মরিয়া করে তুলবে।
এ অবস্থায় উসকানি দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে তোেলার ফিকিরে সেলফিশ বজ্জাত অপরচুনিস্ট ফেউয়ের দল তো পিছনে লেগেই আছে!
প্রভাসের সঙ্গে সমস্ত কলহ বিবাদ আপসে মিটিয়ে ফেলার নির্দেশমূলক সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পেয়েও একটু ইতস্তত করেছিল রবার্টসন। বলেছিল, যেচে ভাব করতে গেলে আমার সম্মান কোথায় থাকবে? আমি নীচু হয়ে যাব না?
শুনে জনসনের কী রাগ।
—তোমরা ইয়ংম্যানেরা গোল্লায় যাচ্ছ দিনকে দিন। ফাঁকা প্রেজুডিস আর মেয়েলি হিস্টিরিয়া তোমাদের পেয়ে বসেছে। সম্মানের হানি হবে। নীচু হয়ে যাবে। দি ইজ পিওর ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্স। তুমি মহৎ উদার মানুষ, দয়া করে প্রভাসকে ক্ষমা করেছ–এই হবে তোমার অ্যাটিচুড।
তারপর সুর নরম করে হেসে বলে, অলরাইট, অলরাইট তোমার প্রেস্টিজ ঠিক বজায় থাকবে ভেব না। মিনার্ভা তোমাদের ভাব করিয়ে দেবে।
