বনানীকে ধিক্কার দেবার বদলে স্বামীকেই খেদের সঙ্গে বলে, ধিক্ ধিক্ কাণ্ডজ্ঞান জন্মাবে না কুনকালে তুমার মুখ বুজি থাকতি শিখবেনি কুনকালে।
কয়েকজন এসে দাঁড়িয়েছিল।
প্রাচীরঘেরা বাগান হোক, গেটে পাহারা থাক, ইটের ঘায়ে একজনের মাথা ফাটানো হলে কিছু লোক টের পাবে এবং তারা কয়েকজন এসে আহতকে ঘিরে দাঁড়াবেই।
নদেরষ্টাদের মা বলে, মিছি মিছি অমন করে কেন মারবে বাছাঃ মুখ বুজে চুপ করে থাকলেও মারত।
অহল্যা বলে, ওরকম মারলি কি সইতাম গো? ইট কাঠ বাঁশ কি মোদের নাই? মানুষটা চুপ থাকলি মারত না। যার বাগান সে তার বাগানে যখন সাধ হবে কপি ফলাবে তুমার তাতে কি?
মেঘনাদও এসে দাঁড়িয়েছিল।
সে বলে, তাই কি হয়? মনিব লাথি মারুক, মাথা ফাটাক মনিবের ভালোটা দেখতেই হবে। কাজ হবে না জেনেও কাজের মানুষ কি চুপ করে রইতে পারে?
অহল্যা জোরের সঙ্গে বলে, কাজের কথা মোটে না, একজনার পেরানের সাধের কথা।
বাংলা উড়িয়া মিশিয়ে সে কিছুক্ষণ একটানা কথা বলে যায়। মানে বুঝতে মোটেই কষ্ট হয় না। উপস্থিত কয়েকজনের। সুভদ্রা-নন্দনের মাথা দিয়ে তখনো রক্ত চুইয়ে পড়ছিল, তবু যে অহল্যা বনানীর পক্ষ টেনে কথা বলে এটাই সকলকে শুধু বিস্মিত নয়, স্তব্ধ ও ক্ষুব্ধ করে রাখে।
অহল্যা বলে যে, বাগানটা বাবুর একার নয়, বাগান নিয়ে যা খুশি করবার অধিকার গিন্নিমারও আছে। ফুলের বদলে গিন্নির যদি অসময়ে সবজি ফলাবার ঝোঁক চাপে—সেটা মানতে হবে। ফুলের বদলে কপি ফলবে কি ফলবে না সে আলাদা কথা। কপি যদি না-ই ফলে, লোকসানটা কার? গিন্নিই তো সব খরচ যোগাবে। বাজারে বেচার জন্যে কি এই কপি চাষের শখ? কপি চাষ করে বাজারে বেচে কিছুই লাভ করা কি উদ্দেশ্য ছিল গিনিমার? একটা শখ জেগেছে। নিছক শখ। মেটাতে দিলেই তো মিটে যেত তার বাগানের একটু অংশে কপি চাষ করার শখ। সুতরাং কি দরকার ছিল মালীর বাহাদুরি করতে যাওয়ার, উপদেশ ঝেড়ে গিন্নিমার মাথা বিগড়ে দেবার?
অহল্যা যে এ অবস্থায় এমন চট করে ব্যাপারটা এতখানি গভীরভাবে ধরতে পারে তাতে আশ্চর্য হবারই কথা তবে কিনা এই জ্ঞানটুকুই সাধারণ অভিজ্ঞতা থেকেই তার এসেছে
বাবু এবং গিন্নিমায়েদের একের উপর অন্যের মেজাজ খিচড়ে গেলে, দুজনের ঝগড়াঝাটির মধ্যে সেটা ভালোভাবে মিটমাট হয়ে না গেলে, বাবুরা আর গিন্নিমায়েরা যে যাকে পায় তার উপরেই ঘরোয়া কলহের জমানো রাগের ঝালটা ঝাড়ে–এটুকু অহল্যা অনেক দিন থেকেই জানে।
তাই তো তার এত জ্বালা। মুখ বুজে চুপটি করে থাকলে কি বেচারার মাথা ফটিয়ে গায়ের ঝাল ঝাড়ার সুযোগ গিনিমা পেত।
মালীরও অবশ্য নিজস্ব হিসাব নিকাশ বিচার বিবেচনা আছে। সে-সবও অভিজ্ঞতা থেকে জন্মেছে।
কাতরানি বন্ধ করে সে ঝেঝে বলে যে, কপি যখন ফলত না তখন দোষটা হত কার? ইতিমধ্যে ভাব হয়ে যেত বাবু আর গিনি-মায়ের, দুজনে মিলে একচোট নিত না তার ওপর?
হয়তো তাড়িয়েই দিত তাকে। আগে থেকে জানিয়ে রাখল, দোষ কেটে গেল।
অহল্যা ধমক দিয়ে বলে, দোষ কাটল কুথায়? মু তো দেখছি খালি মাথাটা ফাটল।
মালী জোরে পেঁচিয়ে বলে, খাঁটি কথা বলিছিনু মাথা ফাটল, উপায় কি।
আধঘণ্টার মধ্যে ব্যস্তসমস্ত হয়ে ডাক্তার দত্ত ছুটে আসে। সোজা অন্দরে যায় বটে কিন্তু কয়েক মিনিট পরেই বনানীর সঙ্গে মালীর ঘরের সামনে এসে হাজির হয়।
তেল হলুদের মলম লাগিয়ে ময়লা দুৰ্গন্ধ ন্যাকড়া দিয়ে মালীর মাথাটা অহল্যা বেঁধে দিয়েছিল, সেটা খুলে ছুড়ে ফেলে দিয়ে ডাক্তার দত্ত বলে, বুড়ো বয়সে গাছে ওঠার শখ তোর গেল না হারামজাদা?
অহল্যার কাছে এই মাত্র তালিম পেয়েছে। মালী আর তাই কথা কয় না। কাঁচাপাকা গোঁফ দাড়ির ছাঁটাই করা জঙ্গলে ঢাকা পুরু মোটা কালো ঠোঁট ফাঁক করে শুধু একটু বিনয়ের হাসি হাসে।
অহল্যাও নীরবে একটু হাসে।
তাই বটে, ঠিক কথা। এটাই মেনে নিতে হবে। বুড়ো বয়সে গাছে উঠতে গিয়ে পড়ে যাবার ফলে মালীর মাথা ফেটেছে।
পান-দোক্তায় মালীর দাঁত কালচে পড়া, কিন্তু কী ঝকঝকে দাঁত অহল্যার।
মাড়ির দাঁত দুটোর বেদনা যেন আরো বেশি টনটনিয়ে ওঠে বনানীর।
কি দিয়ে দাঁত মাজিস রে অহল্যা?
নিমের দাঁতন মা।
মালীর মাথায় ব্যাণ্ডেজ বেঁধে দিতে দিতে ডাক্তার দত্ত বলে, বিশেষ কিছু হয় নি, দু-চারদিনেই সেরে যাবে।
মালীকে বলে, কদিন পান্তা খাবি না, বাসি কিছু খাবি না, বুঝলি? ভাত খাবি–গরম গরম খাবি।
বলতে বলতে পিচকারি ঠিকঠাক করে নিয়ে ওষুধ ভরে মালীর বাঁ হাতের গোড়ায় একটা ইনজেকশন দিয়ে দেয়।
ইনজেকশন নেওয়ার অভিজ্ঞতা মালীর ছিল।
মাস কয়েক আগে বনানী নিজে দাঁড়িয়ে তাকে দিয়ে রজনীগন্ধার বেড়টায় সংস্কার করানোর সময় তাকে সাপে কামড়েছিল।
মারাত্মক রকমের বিষাক্ত জাতসাপ নয়, কমজোরী বিষ–ওলা সাপ, যে বিষ আস্তে আস্তে নিজেকে জাহির করে দেহে ঢুকে রক্তমাংস হাড়মজ্জায় জড়িয়ে মিশে থাকতে চায়। সাত দিন ধরে ডাক্তার দত্তই তাকে রোজ তিনটে করে ইনজেকশন দিয়েছিল।
রাগের মাথায় মালীর মাথায় ইট মেরে রক্তপাত ঘটিয়েছিল। নিজেই আবার ডাক্তার ডাকিয়ে এনে মাথায় ব্যাণ্ডেজ বাঁধবার ব্যবস্থা করে।
সুভদ্ৰা-নন্দন যাতে বাসি পান্তা ইত্যাদি না খায় সেজন্যে কয়েকদিন নিয়মিত গরম গরম মাছ দুধ পাঠায়।
খাওয়া পার করেই অবশ্য তার চাকরি কিন্তু চাকরবার মালীর খাওয়া তত বাড়তি ভাত রুটি ঘাস পাতার তরকারি আর পাতলা করে রাধা খানিকটা ডাল দিয়েই চালিয়ে দেওয়া যায়।
