কি বলছ?
খন্তি উঁচিয়ে বনানী এমনভাবে কাছে এসে প্রশ্ন করে যে, মনে হয় খন্তি দিয়েই বুঝি তাকে মেরে শেষ করে দেবে।
প্রভাস আধ-পোড়া সিগারেটটা ফেলে দেয়। আরেকটা নতুন সিগারেট ধরায়।
একবার হাই তোলে।
এবার তোমার গঙ্গাসাগর যাওয়া হবে না মনে হচ্ছে। এবার বাদ দাও।
কেন?
লঞ্চ যোগাড় হল না।
আমার যাওয়া নিয়ে তোমার মাথা ঘামাতে হবে না। আমি এবার দিদিমা মাসিদের সঙ্গে যাব ঠিক করেছি। তোমার কেরামতি বুঝে গিয়েছি।
তারই ফলে বনানীর কলকাতা হয়ে গঙ্গাসাগর যাত্রা।
কলকাতায় বাপের বাড়ি হয়ে গঙ্গাসাগরের মেলায় যাবে ঠিক করে কিন্তু বনানীর মেজাজ বিগড়ে যায়।
কথায় কথায় চটে গিয়ে বকাঝকা চালায় কেবল চাকর দাসীর উপরে নয়, আশ্ৰিত আশ্ৰিতা আত্মীয়স্বজনের উপরেও।
প্রভাসও অবশ্য তার মেজাজ থেকে রেহাই পায় না। তবে সে নিজেকে বাঁচিয়ে চলতে জানে।
তার এই মেজাজের কল্যাণেই মালীর বৌ অহল্যা বনানীর সঙ্গে গঙ্গাসাগর ঘুরে আসার সুযোগ পেয়ে যায়।
বাগানের উড়িয়া মালী সুভদ্ৰা নন্দন কলকাতার এক সায়েবের ছোটখাটো কিন্তু মনোরম বাগান। থেকে উৎখাত হয়ে প্রায় স্রোতে ভেসে প্ৰভাসের প্রকাণ্ড বাগানের মালীর পদটার আশ্রয়ে এসে ঠেকেছিল।
অহল্যাকে সঙ্গে নিয়ে। অহল্যার জন্যেই সে উৎখাত হয়েছিল।
গুরুতর বৈষয়িক ও পারিবারিক কারণের অজুহাতে কয়েকদিনের ছুটি নিয়ে দেশে গিয়ে সে একেবারে তেল সিঁদুরে মাখামাখি রূপোর বালা মল পৈছা গল-শিকল পরা কাপড়ের বস্তার মতো। বার তের বছরের ব্ৰীড়াপীড়িতা এবং বিনিয়ে বিনিয়ে ক্রন্দনরতা অহল্যাকে সঙ্গে নিয়ে মালীর কাজ করতে ফিরে আসবে এটা সাহেব সহ্য করতে পারে নি।
বেতন কিছু আগাম দেওয়া ছিল, সঙ্গে সঙ্গে সায়েব তাদের ভাগিয়ে দিয়েছিল। সঙ্গে ছিল অহল্যার বড় ভাই লক্ষ্মণ কিন্তু সেও কলকাতায় নবাগত।
তবে শহরে দেশ-ভাই আছে অনেক।
তাদের সাহায্যে এখানে ওখানে কাজ আর আশ্রয় পেয়ে দিন গুজরানের ব্যবস্থা হচ্ছিল কিন্তু অহল্যাকে নিয়ে কোথাও বেশিদিন টিকে থাকা সম্ভব করতে পেরেছিল না সুভদ্ৰানন্দন।
শেষ পর্যন্ত স্থায়ী আশ্রয় পেয়েছিল প্রভাসের কাছে।
প্রভাসের বাগানও প্রকাণ্ড, এক কোণে মালীর থাকার জন্যে কুঁড়েঘরের ব্যবস্থাও আছে। অহল্যাকে সাথে নিয়ে ওইখানে আশ্রয় পেয়ে সুভদ্ৰানন্দন সমস্ত বাগানটাকে তিন বছরে যেন বাহারে লতাপাতা আর রঙিন ফুলের প্রদর্শনীতে পরিণত করেছিল।
বনানীর সেটা পছন্দ হয় নি। এত পয়সা দিয়ে চারা বীজ কলম সার ইত্যাদি কিনে এত সময় আর পরিশ্রম খরচ করে শুধু বিলিতি ঢঙের একটা ছককাটা শোভা সৃষ্টি করা।
একদিন চাকরবারকে ডেকে, নিজে দাঁড়িয়ে থেকে মালীকে ধমকধামক গালাগালি দিতে দিতে রঙিন ফুল আর বাহারে পাতা গাছ নির্মমভাবে গোড়া উপড়ে কেটে ফেলিয়ে দিয়ে বাগানের খানিকটা অংশ সাফ করে দেয়।
প্রভাসের অনুগত প্ৰজা দু-একজন জাত চাষীকে এ কাজে কেন ডাকে না সে-ই জানে।
বাগানের একাংশের ফুলপাতার শোভা কাটা হয়ে সাফ হয়ে যাবার পর মালীকে হুকুম দেয়, কাল কুপিয়ে রাখবি, আমি কপির চাষ করব।
সুভদ্ৰানন্দন সবিনয়ে জানায় যে, কপির চাষের সময় পার হয়ে গিয়েছে, ফুলকপি বা বাঁধাকপি কোনো কপিই বাগানে এখন আর গজাবে না।
পায়ের কাছে আধখানা একখণ্ড ইট পড়েছিল। সেই ইটটা তুলে নিয়ে কাছে এগিয়ে গিয়ে বনানী সুভদ্ৰানন্দনের মাথায় ছুড়ে মারে।
মাথা ফেটে রক্ত বার হয়। সুভদ্ৰানন্দন কারাতে কারাতে মাটিতে বসে পড়ে।
বনানী কোনো দিকে তাকায় না, কোনো কিছু কানে তোলে না।
কাল সকালে যদি না বাগানটা চষে রাখি, তোদর সকলকে দূর করে দেব।
এটা প্রতিক্রিয়া।
নিজের জন্মদিনের উৎসবে নিমন্ত্রণ করে আনা অতিথিকে প্রভাস তার ভাড়াটে সশস্ত্র প্রহরীকে ডেকে এনে গুলি করার হুকুম দেবে, পাগলিনীর মতো দোতলা থেকে নেমে এসে প্রায় গায়ের জোরে তাকে সামলাতে হবে এই ধরনের ছোট বড় ঘটনার প্রতি-ঘটনা তো ঘটবেই। দিনের পর দিন সবকিছুর আত্মসর্বস্ব বখাটে কর্তা এবং তার একালে সেকালে খিচুড়ি পাকানো ফাকা সমারোহ ভরা জীবনযাত্রার ধাক্কা সয়ে ও সামলে চলে শেষ পর্যন্ত নিজেকে সামলাবার সাধ্য বনানী কোথায় পাবে।
সুভদ্ৰানন্দনের মাথা ফাটিয়ে দিয়েও, রাগের মাথায় তখনকার মতো বনানী যেন গ্রাহ্যও করে না।
গলগল করে রক্ত বেরিয়ে বেচারার খয়েরি ফতুয়া আর খাকি হাফপ্যান্ট ভেসে যাচ্ছে চেয়ে দেখেও গটগট করে অন্দরে ফিরে যায়।
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, আমাদের মোটাসোটা বনানী বরাবর ফর্সাগিন্নি নামে পরিচিতা। লোকসমাজে ওটাই তার ডাকনাম দাঁড়িয়ে গিয়েছে।
বনানী বললে হয়তো অনেকে তার পরিচয় জানবে না, বলে দিতে হবে যে, সে প্রভাসবাবুর বৌ–ফর্সাগিন্নি নাম শুনলে এরাও টের পেয়ে যাবে কার কথা বলা হচ্ছে।
অহল্যা কালো।
বিশ্রীরকম কালো–কোন হিসাবে আর কিসের তুলনায় বিশ্রী সেটা অবশ্য কেউ বলতে পারবে না।
বছর তিনেক জমিদার বাড়ির ফেলানো ছড়ানো অন্ন পেট পুরে খেয়ে প্রথম বয়সের দেহটি তার দিব্যি পরিপুষ্ট হয়েছে। চাকরবারদের জন্যে বরাদ্দ ওজন দরে কেনা সস্তা কাপড়কাচা সাবানের ভাগ দিয়ে অহল্যা হুকুমমতো শুধু কাপড় জামাই সাফ করে না, প্রাণপণে নিজের দেহটাও ঘষামাজা করে চামড়ার কালোত্ব ঘুচাবার দুরাশায় নয়, একটু পালিশ আর চাকচিক্য আনার জন্যে।
বনানী দালানের অন্দরমহলে আড়াল হবার পর বাঁশ আর পুরোনো টি খড় দিয়ে যত কম খরচে সম্ভব গড়া আশ্ৰয়-ঘরটা থেকে তার বৌ অহল্যা বেরিয়ে এসে এক ঘটি জল দিয়ে তার ফাটা মাথার রক্ত ধুইয়ে দেয়।
