মেয়ে আর ফুলজানকে সাথে নিয়ে শান সায়েব চলে গিয়েছিল, ফাকা আসরে আরো কজনের সঙ্গে দাঁড়িয়ে রোস্তম ফুঁকছিল বিড়ি।
লখার মা ডাকছে শুনে সে ধীরে ধীরে গিয়ে উঠোনের এক কোণে দাঁড়ায়। এমন শান্ত নিরীহ গোবেচারি মনে হয় বাইশ-তেইশ বছরের জোয়ান ছেলেটাকে।
লখার মা বলে, ঘরে গেলে না যে? খানাপিনা দরকার নাই।
রোস্তম বলে, সে হবেখন। তোমার সাথে দরকার ছিল।
বলোই না শুনি। একটু ফারাক রেখে ওইখানে বসে পড়ো—খিচুড়ি খেয়ে নাও পেট পুরে। পাতা দাও না কেউ বেচারাকে।
কেউ নড়ার আগেই সকলকে প্রায় তাক লাগিয়ে দিয়ে গৌরী বুনো ঘাসের বোনা একটা আসন নিয়ে এসে রোস্তমের জন্যে বিছিয়ে দেয়, কলাপাতা পেতে দেয়। বাচ্চাটা কাঁদছিল, ঘরে গিয়ে তাকে কোলে তুলে নিয়ে আবার সে দরজার কাছে বসেপেয়ারা গাছের ডালে ঝুলানো
ডে-লাইটের আলো সোজাসুজি যেখানে পড়ে নি।
আসরে যায় নি কিন্তু বেড়ার গায়ে একটা ফাঁককে আরো বড় করে নিয়ে এপাশে আড়ালে বসে সে লখার মার পালা গান শুনেছে—বাচ্চাটাকে পিসির জিমা করে দিয়ে।
সারাদিন হুজুগে কেটেছে—গৌরীর শান্ত স্বাভাবিক ভাব দেখে শ্রান্তি ক্লান্তি মিলিয়ে গিয়ে ঈশ্বরের প্রাণ যেন জুড়িয়ে যায়।
কয়েক মুহূর্ত ইতস্তত করে গৌরীর পেতে দেওয়া আসনে বসে রোস্তম যেন প্ৰায় লাজুকপনার মতো তার নরম বিনয়ের ভাব কাটিয়ে উঠে নালিশের সুরে লখার মাকে জিজ্ঞাসা করে, চাষী মজুরের লড়াইটা অত বেশি ঘটলে কেন?
লখার মা জবাব দেয়—খুশি হল হেঁটে দিলাম। চাষী মজুরের লড়াইয়ের খবর শুনতে তো কেউ আসে নি সে খবর এমনিই তারা পায়। কেন, গাউনি কিছু মন্দ হয়েছে? চাষী মজুরের কথাটা পালা গানে মিশেল খেয়ে রইল, আসর জমে গেল, আবার কত চাও?
রোস্তম সংশয় ভরে এক হাতে মাথা চুলকোতে চুলকোতে আরেক হাতে বেগুন ভাজা দিয়ে খিচুড়ির গেরাস মুখে পুরে দেয়।
১৩. গঙ্গাসাগরের মেলা
বনানী গঙ্গাসাগরের মেলায় যাবে।
নদী বেয়ে দক্ষিণে কয়েকঘণ্টা পাড়ি দিলেই সাগর। গঙ্গা যেখানে এসে সাগরে পড়েছে সেখানটা বেশি দূর নয়।
বড় একটা নৌকা নিয়েই পাড়ি দেওয়া যেত গঙ্গাসাগরে। কিন্তু ফর্সা গিন্নি রেলে চেপে পাড়ি দেয় উত্তরদিকে কলকাতায়। কলকাতা থেকে ঘুরপথে গঙ্গাসাগরে যাবে।
অনেক সধবা ও বিধবা প্রৌঢ় বৃদ্ধা মুখ হাঁড়ি করে থাকে, কপালকে দোষায়।
চারজনকে মোটে সঙ্গে নেয়। ঈশ্বরের পিসি, নয়ানাদের মা, লখার মা আর তার বাগানের উড়িয়া মালীর বৌ অহল্যাকে।
অহল্যাকে এত অনুগ্রহ করার কাহিনীটা বলার মতো। সে অনেক ব্যাপার।
প্রভাসদের কোম্পানির একটা স্টিম-লঞ্চ ছিল। কাগজে কলমে একদিনের জন্যে লঞ্চটা ধার করে চার-পাঁচদিন লঞ্চটা প্রভাস এইরকম পারিবারিক প্রয়োজনে ব্যবহার করে এসেছে।
প্রতি বছর ফর্সা গিনি অর্থাৎ বনানী সারা বছর তার মন-যোগানোর প্রতিযোগিতায় পাসকরা বিশ-বাইশজন পুণ্যার্থিনীকে নিয়ে চার-পাঁচদিনের জন্যে গঙ্গাসাগরের মেলায় যেত।
গঙ্গাসাগরে যাওয়া ছাড়াও বছরে দু-একবার সমুদ্র ভ্রমণে যাবার জন্যে লঞ্চটা প্রভাস ধার করত, তবে দু-একদিনের বেশি লঞ্চটা দরকার হত না।
বেশি বেড়ানো, বিশেষত প্রভাসের সঙ্গে বেড়ানন, ফর্সা গিন্নির সয় না।
কোনোবার কিছু কয়লার খরচ লাগত। কোনোবার কিছুই লাগত না। লঞ্চের চালক খালাসীরা বেতন পেত কোম্পানির কাছ থেকে।
বোধহয় ফোর্থ হ্যান্ডে কেনা বহু পুরোনো লঞ্চ, বছর তিনেক আগে লঙ্কটা বিগড়ে যায়, বাতিল হয়ে যায়।
তিন বছরের মধ্যে ডাইরেক্টরদের সভায় নতুন একটা লঞ্চ কেনার প্রস্তাব প্রভাস তুলতেই পারে নি।
সে অবশ্য প্রধান। কিন্তু বুঝেশুনে তো চলতে হবে প্রধানকেও লঞ্চের প্রস্তাব তুলতে চাইলে অন্য তিনজন দেশী এবং একজন বিদেশী ডাইরেক্টর যদি জোরের সঙ্গে তেজের সঙ্গে খারিজ করে দেয় প্রস্তাবটা, একবাক্যে ঘোষণা করে যে, স্টিম-লঞ্চে তাদের কোনো প্রয়োজন নেই, নৌকা এবং কোম্পানির স্টিমারেই তাদের চালান এবং আনান, দুই কাজই বেশ ভালোমতো চলছে—পারিবারিক প্রয়োজনে নতুন স্টিম-লঞ্চ কেনার জবরদস্তি করা কি তার পক্ষে সম্ভব?
রবার্টসনদের কোম্পানিরও একটা লঞ্চ ছিল, আজো সেটা চলতি আছে।
দু বছর ওই লঞ্চ ধার করে প্রভাস ফর্সা গিনি ও পুণ্যার্থিনীদের গঙ্গাসাগর ঘুরিয়ে এনেছে।
বাঘ মারা নিয়ে দুজনের হাতাহাতি মারামারির পর মিটমাট হয়ে গিয়েছে, রীতিমতো ভাব হয়েছে বলা যায়, কিন্তু এ বছর প্রভাস লঞ্চটা ধার চেয়েও পায় নি।
সোজাসুজি প্রত্যাখ্যান। রবার্টসন অবশ্য তাকে অপমান করে নি। লঙ্কটা কেন দেওয়া যাবে না তার যুক্তিসঙ্গত কারণ ব্যাখ্যা করে তাকে সুমিষ্ট ভাষায় বন্ধুত্বপূর্ণ পত্র লিখে ব্যাপারটা জানিয়েছে।
লঞ্চটা নাকি গিয়েছে ডায়মণ্ডহারবারে। কয়লা বোঝই নিয়ে ফিরবে। কিন্তু কবে ফিরবে কিছুই ঠিক নেই। এরকম অনিশ্চিত অবস্থায় রবার্টসন কি তার প্রিয় বন্ধু প্রভাসকে লঞ্চটা ধার দেওয়া সম্পর্কে কোনো প্রতিশ্রুতি দিতে পারে?
সকালে প্রভাস পত্র পায়, সারাদিন নিজের মনে গুমরায়। বিকালে দু-এক পেগ খেয়ে, ফর্সা গিন্নি বাড়ির কোন অংশে আছে আর কি করছে বনানীর চাকরানীকে ধীর শান্ত গলায় জিজ্ঞাসা করে জেনে নিয়ে একেবারে রান্নাঘরে গিয়ে হাজির হয়। রাঁধুনীকে একপাশে দাঁড় করিয়ে রেখে ফর্সা গিন্নি কোমরে রঙিন আঁচল জড়িয়ে মস্ত উনানে চাপানো প্রকাণ্ড কড়ায়ে আলু পেঁয়াজ ভাজছে দেখে থমকে থেমে গিয়ে কি বলবে কি করবে সেটাই বোধহয় চিন্তা করে।
