ভাঙা কুঁড়ে ডোবা পুকুর কলাবাগান ঝোপঝাড় ঘেরা ছোট মাঠটুকুতে চাঁদোয়া খাটানোমাত্র আসরের চেহারা যেন বদলে যায়।
পালা শুরু হবার খানিক আগে ছোট মেয়ে নুরুলকে সাথে নিয়ে শান সায়েবকে হাজির হতে দেখে অনেকে আশ্চর্য হয়ে যায়।
নুরুল বড় হয়েছে, অন্য মেয়ের বেলা শান সায়েব দু-এক বছর আগেই তার জন্যে কড়া পর্দার ব্যবস্থা করে দিত। কিন্তু কে জানে ছোট মেয়েটার জন্যে কী এক অদ্ভুত অন্ধ মায়া থেকে শান সায়েবের একটা আশ্চর্য উদারতা ও উদাসীনতা এসেছে—ভাবটা এই যে, মেয়ে যেন তার বড় হয় নি, ছোটই আছে।
নুরুল গিয়ে মেয়েদের মধ্যে বসে। ঈশ্বর ব্যস্ত হয়ে শান সায়েবকে সাথে নিয়ে সবার সামনে বসিয়ে দেয়।
মেয়েটা বড় দিক করে ঈশ্বর। না এনে রেহাই পেলাম না।
ছেলেমানুষ, শখ জাগে তো!
বেলা তিনটে নাগাদ রু করে লখার মা রাত দশটা পর্যন্ত আসরটা মাতিয়ে রাখে।
ক্লাব-বাড়ির পেটা ঘড়িতে তিনটে বাজার শব্দ একটু অস্পষ্ট শোনা গিয়েছিল, চারিদিকে রাত্রির স্তব্ধতা ঘনিয়ে আসার পর দশটার ঘণ্টা যেন কলাবাগানের ওপাশেই বাজছে মনে হয়।
ভিড় হয়েছে অসম্ভব। বড় জমায়েতের সম্ভাবনা টের পাবার পরেই দেখতে দেখতে গোটা কয়েক পানবিড়ি চা সিগ্রেটের দোকান গজিয়ে উঠেছেঝুলি কাধে দু-চারজন ফেরি করাও শুরু করেছে পান বিড়ি চানাচুর।
পূজাপার্বণ উপলক্ষে যাত্রাগানের আসর ছাড়া এত মানুষের ভিড় জমে না।
নতুন রকম পালা গান শোনায় লখার মা। খানিক কথা, খানিক ছড়া, খানিক গান।
কাঠামো সেই রূপকথা লোককথার কিন্তু কাহিনী বেশ মজার। বানানো কথা-কাহিনী জমানোর চিরন্তন কায়দায় প্রথম দিকেই বিষম মুশকিল সৃষ্টি করে শেষে তার আসান করা হয়েছে কি হবে কি হবে ভেবে শেষ পর্যন্ত সবাই যাতে উৎসুক হয়ে থাকে।
সুন্দরী বন-কন্যা, মায়াবিনী নয়, মায়ার পুতুলী। বনের বাঘ তার আদর পেলে পোষা বেড়ালের মতো খুশি হয়। হায়রে বিপাক, এই কন্যার কিনা মন মজলো দুজনের জন্যে একজন। কারখানার খাটুয়ে জোয়ান মজুর, আরেকজন ক্ষেত চষে ফসল ফলানো চাষীর ছেলে।
বন-কন্যার টানে দুজনেই বনে আসে কিন্তু কখনো কোনোদিন এক সময়ে একসঙ্গে আসে না, এক বেশে আসে না। হিংস্র পশু রা বনে তারা আসে নিজের নিজের অস্ত্র নিয়ে মজুর জোয়ান মস্ত একটা হাতুড়ি আর চাষী জোয়ান ঝকঝকে বাকা একটি কাস্তে হাতে নিয়ে।
দুজনের জন্যেই বন-কন্যার সমান টান। যে যখন কাছে থাকে, মনে হয় সে-ই তার প্রাণের মানুষ।
একা যখন থাকে তখন দুজনের জন্যেই তার মন কেমন করে, ছটফটানি জাগে-দুজনকে নিয়ে চলে স্বল্প-কল্পনার ভাঙা গড়া।
এইখানটা—বন-কন্যার দোটানা প্রেমের কথা লখার মা এমনভাবে বসিয়ে রসিয়ে বলে যে, কমবয়সী মেয়ে বৌরা খিলখিল করে হেসে উঠে মুখে আঁচল চাপা দেয়, আবার এই নিদারুণ সমস্যা নিয়ে বন-কন্যার প্রাণের খেদ আর হাঙ্গর-কুমির ভরা নদীতে ঝাঁপ দিয়ে বা ক্ষ্যাপা হাতির পায়ের তলে পিষে মরে যাবার সাধটা এমনভাবে বর্ণনা করে যে, অনেকের চোখে জল এসে যায়।
হাঙ্গামা হয় কারখানায়। গুলি লেগে একটি হাত জখম হয়ে যায় জোয়ান মজুরটির।
ক্ষেতের ফসল নিয়ে আরেকদিন বাধে গোলমাল, পা খোড়া হয়ে যায় জোয়ান চাষী ছেলেটির।
দুজনে আগের মতোই ভিন্ন সময়ে পৃথক সাজে আসে, বন-কন্যা লক্ষ করে যে, দুজনেরই হাত বাধা, পা বাধা।
চোখের সামনে থেকে একটা পর্দা যেন খসে যায়–প্রণয়ী দুজন তো তার একই মানুষ।
সমস্ত আসরটা যেন স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে।
একুশ টাকার মতো চাঁদা উঠেছিল, সম্পন্ন চাষী ব্যবসায়ী ঠিকাদার ইত্যাদি কয়েকজনের কাছ থেকে আরো কিছু টাকার প্রতিশ্রুতি পাওয়া গিয়েছে।
ঠিকমতো ব্যবস্থা থাকলে আরো টাকা তোলা যেত কিন্তু এরকম আসর যে হবে সেটাই অভাবনীয় ব্যবস্থা হবেই বা কিসে, করবেই বা কে।
লখার মার তাল ঠিক আছে সব দিকেই। ভূতনাথকে ধুয়া ধরিয়ে দিয়ে একাকে সে গাইয়ে বাজিয়ে এবং যারা ছুটোছুটি করেছে খেটেছে তাদের জন্যে রাতের খাবারের ব্যবস্থা করার দায়টা সাধু মণ্টাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছিল।
কিন্তু দেখা যায় মতি ময়রার পোড়া লুচি নোন্তা শিঙ্গাড়া আর চিনির ঢিপি মণ্ডার ব্যবস্থা না করলেও চলত।
সোনামুখী বলে দিয়েছিল, বনানীকে দিয়ে হুকুম জারি করিয়ে মেঘনাদ ব্যবস্থা করেছে গরম গরম খিচুড়ি আর বেগুনভাজা আলুর দমের।
ঈশ্বর বলে, বাবু টের পেলে একচোট নেবে।
মেঘনাদ হেসে বলে, পাগল নাকি! বাবু একচোট নিলে গিনি-মা সাড়ে তিন চোট নেবে না?
একটা ডে-লাইট খুলে এনে টাঙিয়ে দিয়ে ঈশ্বরের ছোট উঠোনে যে যেখানে পারে খেতে বসে যায়।
খেতে খেতে ঈশ্বর লখার মাকে উদ্দেশ্য করে উচ্ছসিতভাবে বলে, এমন পালাও তুমি বানিয়ে বানিয়ে গাইতে পার লখার মা!
লখার মা একটু তফাতে বসেছিল, সকলকে অবাক করে দিয়ে সে জবাব দেয়, ক্ষেপেছ তুমি? এ পালা কেউ মুখে মুখে বানিয়ে বানিয়ে গাইতে পারে? খানিক খানিক জুড়ে দেয়া যায়, তার বেশি নয়।
সকলে উৎসুক হয়ে প্রত্যাশা করে থাকে। আসরে নেমে সঙ্গে সঙ্গে বানিয়ে না গেয়ে থাকলে ব্যাপারটা কি খুলে বলবে নিশ্চয় লখার মা।
অন্য সময় লখার মা কি হিসাব কষত কে জানে, আসল ব্যাপার চেপে গিয়ে সবটুকু গৌরব নিজে দাবি করার লোভ সামলাতে পারত কিনা সন্দেহ কিন্তু তার মনটাও রসাবেশ আবেগ উত্তেজনা উৎসাহ উল্লাসে বিশেষ একটা অবস্থায় ছিল। মুখ তুলে সোজাসুজি সে সকলকে শুনিয়ে বলে, পালা বানিয়েছে মোদের রোস্তম–শান সাহেবের ভাইপো। তবে কিনা অনেক কিছু পাল্টে দিয়েছি, জুড়ে দিয়েছি, ঢেলে সেজে নিইছি খুশিমতো।
