বিব্রত মনে হয় না লখার মাকে ভিড় হয়েছে সেজন্যে কিছু নয়, আগে থেকে জানা ছিল না। এইটুকু যা অসুবিধা।
আফসোসের সঙ্গে সে বলে, একটা বড় ভুল হয়ে গেল গো—একবারটি খেয়াল হল না। মোর। গল্প তো বলব না আজ, অন্য পালা গাইবধায়া ধরার একজনকে ঠিক করতে ভুলে গেলাম।
বলতে বলতে নিরঞ্জনের সঙ্গে ভূতনাথকে আসতে দেখে সোল্লাসে চেঁচিয়ে ওঠে ও মেসো, শুনছ?–ইদিক পানে এস। তোমায় ডাকছি গো ভূতনাথ মেসো।
ভিড় ঠেলে নিরঞ্জন ও ভূতনাথ কাছে এলে মুখে মিষ্টি কিন্তু সকরুণ আবেদনের হাসি ফুটিয়ে বলে, আজকের দিনটা উদ্ধার করে দেবে মেসো? আগে জানাই নি বলে গোসা কোরো নামোর সাথে ধুয়ো ধরতে হবে।
রাগের ভান করে ঈশ্বরের দিকে একনজর তাকিয়ে সে যোগ দেয়, এ মানুষটা বাঘ মারতেই জানে, আর কোনো কম্মের নয়। পই পই করে কতবার বলে রেখেছি তোমায় একটা খবর দিতে, ভুলে মেরে দিয়ে বসে আছে।
ঈশ্বর চমৎকৃত হয়ে লখার মার মিছে কথা শুনে যায়, ভূতনাথ হেসে বলে, শিকারি মানুষ ওমনিই হয়।
শুধু গাইয়ে বাজিয়েদের মাথার ওপরে টাঙানোর মতো ছোটখাটো একটা চাঁদোয়া নেই জন্মের সম্বল তোলা শাড়িখানা পরেই হয়তো যে মেয়ে বৌরা এসেছে তাদের বসার জন্যে বিছিয়ে দেবার মতো দু-একটা বড় সতরঞ্চিও নেই।
ঈশ্বরের ঘরের বেড়া ঘেঁষেই মাদুর চাটাই পাটি কখানা বিছানো হয়। প্রধানত গাইয়ে বাজিয়েদের জন্যে-বাড়তি জায়গাটুকুতে খাতিরের মানুষ যে কজনকে বসানো যায়। বেড়ার দিকে পেছন করে লখার মা পালা গাইবে, ডাইনে বাঁয়ে আর সামনে ভাগ হয়ে বসবে মেয়ে পুরুষেরা—পিছনে কেউ থাকবে না।
একার পক্ষে এরকম আসর সামলানোই সুবিধাচারিদিকে ঘিরে বসা শ্রোতাদের আসরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে পালা গাইতে বড় বেশি ঘুরে ঘুরে পাক দিয়ে গাইতে হয়।
এত ভিড় হবে কেউ ভাবতে পারে নি। কারখানা কটা নয় বন্ধ আছে, ক্ষেত মাঠ নদী পুকুর বন জঙ্গলে জীবিকার সন্ধান করা থেকেও কি ছুটি পেয়েছে মানুষগুলি, ঘর গোরস্থালি শিকেয় তোলা সম্ভব হয়েছে মেয়ে বৌদের?
ঘেঁষাঘেঁষি করে বসলেও এদিকে মেয়েদের ভিড় ডোবাটার দিকে ঠেলে চলেছে, ব্যাটাছেলের ভিড়ও এদিকে বসাক সামন্তদের ঘরের বেড়া আর সামনের দিকে উঁইবাবুদের কলাবাগান পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছে কিনা কে জানে।
সামলাতে পারবে তো লখার মা? একটা না কেলেঙ্কারি হয়।
সন্ত্রস্ত ঈশ্বরের ভাব দেখে একটু হেসে মুখে আরেকটা পান গুজে দিয়ে দোক্তার কৌটো খুলতে। খুলতে লখার মা সহজ সুরে বলে, সামলাতে পারব না কি গো? হাসিয়ে দিয়ে মজিয়ে দেব সবাইকে।
সোনামুখী কখন এসে কোথায় বসেছিল তারা টের পায় নি। প্রভাসের পেয়ারের চাকর মেঘনাদের সঙ্গে তার অনেকদিনের ঘনিষ্ঠতার কথা জগৎ সংসারে কারো জানতে বাকি নেই। সোনামুখী নিজেকে কখনো কোথাও জাহির করে না, নিজেকে একটু আড়ালে আড়ালেই রাখে। এমনি যতই নিন্দা করুক, তার কথা নিয়ে হাসিতামাশা নাক সিঁটকানো চলুক, নেহাত জাত কুঁদুলী দু-চারজন ছাড়া গায়ে পড়ে তাকে কেউ খোঁচায় না।
কোথা থেকে উঠে কাছে এসে সোনামুখী লখার মাকে বলে, একেবারে কঁকা হল যে দিদি? মাথার পরে একটা কিছু নাই!
তার উদ্বেগের আন্তরিকতা লখার মার অন্তর স্পর্শ করে। মাথার পরে ভগবানের আকাশ আছে। কি করি বল বোন, তেরপল মেরপল পাই কুচ্ছা!
সোনামুখী অপরাধিনীর মতো জিজ্ঞাসা করে, করিয়ে দেব দিদি দোষ নেবে না তো?
করিয়ে দেব কথাটার মানে চোখের পলকে ঠাহর করে নিয়ে লখার মা হাসিমুখে ভর্ৎসনার সুরে বলে, ওগো মাগো সোনামুখী কেমন মানুষ তুই! পারবি জেনেও চুপটি করে ঘূপটি মেরে আছি? উপরে কিছু না খাটালে আওয়াজ উড়ে যায়। শুরু করতেই বেলা গেল, আধেক পালা সাঙ্গ হতেই আঁধার হয়ে যাবে। একটা দুটো আলোর ব্যবস্থা পর্যন্ত নেই রে।
আলোর ব্যবস্থা করিয়ে দেব দিদি? তা আবার বলতে হয় রে সোনা।
পনের-ষোল বছরের ভাগ্নেটাকে সোনামুখী সাথে এনেছিল। মা-মরা বাপ-ছাড়া ছেলেটাকে সে-ই মানুষ করেছে দু-তিন বছর বয়স থেকে। তাকে সে বলে, মন দিয়ে শোন দিকি পরশা। অনেক পয়সার সাইকেল দিয়েছি, দেখি কেমন কাজে লাগাতে পারিস। মানুষটাকে বলবি যা, আমি হেথায় ভিরমি গিয়েছি, নাড়ি ছেড়ে যাচ্ছে। বড় একটা তেরপল এনে খাঁটিয়ে দিতে হবে। সাঁঝের দিকে দু-তিনটে বাতি লাগানো চাই। কি বলবি বুঝেছিস।
পরেশ মাথা হেলিয়ে সায় দেয়। মেঘনাদের কাছ থেকে অল্পদামি সেকেন্ড হ্যান্ড সাইকেলটা আদায় করিয়ে দেওয়ার জন্যে মাসির কাছে পরেশ বড়ই কৃতজ্ঞ ছিল।
যা তবে চটপট। বলবি যে, দেরি হলে মোর নাড়ি ছেড়ে যাবে।
লখার মা আর ঈশ্বর চোখে চোখে তাকায়। কে জানে শেষ পর্যন্ত ত্রিপল আসবে কিনা, ডে-লাইট জ্বলবে কিনা সে আলাদা কথা। মেঘনাদের উপর সোনামুখীর হুকুম চালাবার বহরটা একবার দ্যাখ!
প্রভাসের পূজামণ্ডপে খাটাবার চাঁদোয়া এসে হাজির হয় চারটে ডে-লাইট। সেরেস্তায় মহাদেব বা অন্য কারো কাছে, দরবার করার বদলে মেঘনাদ সোজাসুজি বনানীর শরণ নেয়।
প্রভাস লাথি মেরে তাড়িয়ে দিলেও যায় না বলে মেঘনাদের উপর বনানীর বড় রাগ। বোধহয় সেই জন্যেই কোনো একটা আব্দার দিয়ে সে এসে ধন্না দিলে বনানী তাই আর না বলতে পারে না।
মহাদেবকে ডাকিয়ে জরুরি হুকুম জারি করে দেয়।
মহাদেব আমতা আমতা করে বাবুর কোনো কড়া হুকুমের কথা বিছু বলতে যাচ্ছিল, বনানীর ধমকে তার পিলে চমকে যায়।
