তার রাগ আর আফসোসের জ্বালাটা টের পেয়ে লখার মা মুখ ভার করে খানিকক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর বলে, সংসারে ভালো করতে চাইলে মন্দ হয়। শোকটা বুকে চেপে রেখে গুমরে গুমরে পাগল হয়ে যাচ্ছিল, মরে যাচ্ছিল। চোখ নেই, দেখতে পাও নি? আর কটা দিন টিকিয়ে রাখতে পারতে শুনি একবার?
ঈশ্বরের মুখ একটু হাঁ হয়ে যায়।
লখার মা আঁঝের সঙ্গে বলে, ভেতরে ভেতরে পুড়ছিল, পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছিল। কদিন বাদে চিতায় তুলে পোড়াতে হত।
বিহ্বল ঈশ্বর বলে, কবরেজমশায় তো কিছু বললেন না!
লখার মা আরো বেশি ঝেঝে উঠে বলে, তোমার ওই গণশা কবরেজ ছাই বোঝেছেলের শোকে মানুষ মরছে, তাকে হজমী গুলি খাওয়ায়!
ঈশ্বর নিরুপায়ের মতো বলে, কিন্তু কিরকম শুরু করেছে দেখেছ তো?
লখার মা বলে, দেখছি না তো কি। এই তো আমি চাইছিলাম। তুকতাক কিছু করি নি গো, মন্তরটন্তর খাটাই নি। বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলছি, বাচ্চাটার কথা টেনে এনেছি, নিজে একটু কেঁদেছি। চাপা শোকটা শুধু উথলে দিয়েছি আর কিছু করি নি।
ঈশ্বরের মুখের ভাব দেখে অভয় দিয়ে বলে, প্রাণভরে কাঁদুক না কদিন, পাগলামি করুক না। যত খুশি?–চাপা আগুনটা বেরিয়ে যাক প্ৰাণ থেকে। সোয়ামির আদরPখকো বৌ, ছেলেপুলের মা—দুদিন বাদে সব ঠিক হয়ে যাবে।
তাকতুক করে গৌরীর মাথা বিগড়ে দিয়েছে ভেবে বড়ই রাগ হয়েছিল ঈশ্বরের, লখার মার ব্যাখ্যা শুনে এখন সে গভীর কৃতজ্ঞতা বোধ করে।
ঠিক যেন ছেলেমানুষের মতো গলে গিয়ে আরেকদিন গায়না শোনাবার আব্দার জানিয়ে বসে ঈশ্বর।
বলে, কিছু দিতে পারব না—তাই লজ্জা করে।
লখার মা হেসে বলে, পাঁচজনা শুনতে এসে দেবেমোর কিছু পেলেই হল। মোকে কিছু নাই বা দিলে—একটা খোল আর ব্যায়লা আনতে পারবে? কেমন জমিয়ে দিই দেখ।
ঈশ্বর একটু ভেবে বলে, খোল আর ব্যায়লা? আচ্ছা আনব।
নিজে একলা চেষ্টা না করে বন্ধুদের শরণ নেয়—তাতে কাজটা হাসিল হয় সহজেই।
গুণীর অভাব নেই গ্রামাঞ্চলে—কবি গায়ক, খোল বাজিয়ে, বেহালা বাজিয়ে, বশি বাজিয়েসবরকম আছে। সবাই এরা পেশাদার নয়–প্রাণের চাপে খেয়ালখুশির স্বাধীন সাধক। সুর তাল লয় মানের শিক্ষাটা খানিক গুছিয়ে নিয়ে নিজেই নিজের গুরু হয়ে গুণের বিকাশটা পছন্দমতো এলোমেলোভাবে ঘটিয়ে চলে নিজের ভাবে নিজে বিভোর হওয়াটাই হয়ে দাঁড়ায় আসল কথা।
তালকানা রাখালের বেসুরো বাঁশির মেঠো সুর ক্ষেত মাঠ কুঁড়েঘরের ঝিমানো গা-এলানো আলস্যমধুর পরিবেশ ছাড়া কানেও লাগে না, প্রাণেও লাগে না-ওইসব গুণীর সঙ্গীতবিদ্যারও তেমনি স্থান কাল পাত্রের বিশেষ সমাবেশ ছাড়া কদর নেই।
দু-চারজন ছাড়া—তারা বিদ্যার মতোই সাধনা দিয়ে গুণটা আয়ত্ত করে, শুধু ভাবাবেগ টেনে দিয়ে বেসুর বেলা ফকির পালা চালায় না।
অনেকের মতে, নিরঞ্জনের খোলে নাকি সত্যিকারের বোল ওঠে, কোমল মধুর গম্ভীরে মিশিয়ে আশ্চর্য তার খোল বাজানোর কায়দা।
কেউ যদি জিজ্ঞাসা করে, এমন মিঠে হাত কোথায় পেলে দাদা?
নিরঞ্জন কপালে হাত ঠেকিয়ে গুরুকে নমস্কার জানিয়ে বলে, সব কিছুই শিখতে হয় রে ভাইগুরুর দয়ার সাথে সাধনা মিললে তবে কিছু হয়!
ময়নাদলের সুলতান বেহালায় ওস্তাদ। বয়স হয়েছে অনেক, কত হয়েছে সঠিক হিসাব কেউ। জানে না, তবে চেহারা দেখে অনুমান করে নেওয়া যায় যে, সত্তরের এদিকে নয়। শরীর শক্তই আছে কিন্তু বয়সের ছাপ পড়েছে সর্বাঙ্গে।
তার ওস্তাদ কে ছিল সুলতান বলে না, জিজ্ঞাসা করলে বেহালার ছড়টা উঁচু করে আকাশটা দেখিয়ে দেয়।
এককালে পেশাদার বাজিয়ে হিসাবে নানা দলে যোগ দিয়ে অনেক ঘুরেছে, এখন আর যায় না।
তিন তিনটে জোয়ান ছেলে চাষবাস ছাড়াও অন্যভাবে খেটেখুটে রোজগার করছে, দুটো পয়সার জন্যে বেহালা নিয়ে ভাড়া খেটে তার দরকার কি! শখের বাজনা বাজিয়ে যাবে-আল্লা যদ্দিন না করে পাঠান।
সে নিজে গিয়ে ধরলেই হয়তো নিরঞ্জন ও সুলতান রাজি হত, বিশেষত লখার মাযে-আসর জমাবে। কিন্তু দেশী বন্দুক হাতে নিয়ে বনের বড়মিঞার সামনে পড়তে সে না ডরাক, দুজন নামকরা গুণীকে ঘরে ডাকবার সাহস তার হয় না।
সুলতানকে রাজি করানোর জন্যে সে শরণ নেয় শান সায়েরে, সাধু মণ্টা না নিরঞ্জনকে বাগিয়ে আনার দায় নিলে সে পরম স্বস্তি বোধ করে।
ব্যস্ত হয়ে এমনিভাবে ছুটোছুটি করার নামই যে প্রচার চালানো, খবর ছড়ানো তা কি আর জানা ছিল বেচারা ঈশ্বরের
ঘড়ি বাজার হিসাব নেই, দুপুর একটু গড়িয়ে এলে লখার মার ক্ষু করার কথা। ক্লাবের পেটা ঘড়িতে বারটা বাজার আওয়াজ ক্ষীণ হয়ে এসে পৌঁছতে না পৌঁছতে কী ভিড়টাই যে জমতে শুরু করে ঈশ্বরের কুঁড়েঘরের দাওয়া আর উঠানটুকুতে!
গোটা চারেক মাদুর পাটি যোগাড় করা হয়েছিল সেগুলি পাতাও হয় নি তখন পর্যন্ত।
মেয়েরাও আসে দলে দলেপাড়ার বা এ-গাঁয়ের মেয়েরাই শুধু নয়, তাড়াতাড়ি হেঁসেল সেরে ঘরদুয়ার সংসারের ঝাঁট ঠেকান দিয়ে আশপাশের গা থেকেও মেয়েরা আসতে শুরু করেছে। টের পাওয়া যায়।
পান চিবোতে চিবোতে হেলেদুলে মন্থর পদে হাজির হয়ে লখার মা বলে, এ কি কাণ্ড করেছ। গো, আঁ?
দিশেহারা ঈশ্বর বলে, আমি কি করলাম?
পনের-বিশজনার বেশি কাউকে তো ডাকি নি আমি!
লখার মা দাওয়াটুকুর কোণে জায়গা দখল করে গ্যাট হয়ে বসা দু-তিনটি প্রৌঢ়ার মাথা ডিঙিয়ে ও-পাশের বেড়ার গায়ে পিক ফেলে বলে, যাক গে যাক, কি আর করা যাবে। এ উঠোনে চলবে নাকো—আরো লোক আসছে। বাইরে মাঠে আসর পাতো, সবাই ঘাসে বসবে, করবে কি!
