লখার মা গলা নিচু করে না, গৌরী শুনবে কি শুনবে না সেটা গ্রাহের মধ্যে না এনে জোরে জোরেই আফসোসের সুরে বলে, তোমার পরে এমনভাবে বিগড়ে গিয়েছে মনটা? ভাবছি কি জান? চোখের সামনে মোরা যদি পিরিত চালাই, এমনিভাবে তাকিয়ে দেখবে, গাহ্যির মধ্যে আনবে না।
ঈশ্বর হালকা সুরে বলে, চালাও না পিরিত।
লখার মাও মুখের ভাব গলার সুর পালটে নিয়ে হেসে বলে, তুমাকে বলিহারি যাই। মেয়েছেলে বুঝি পিরিত চালানো শুরু কর?
দোষ কি?
অনেক দোষ। সেটুকু বুদ্ধি ঘটে নাই বলেই তো বৌটার এমন দশা হয়েছে।
গৌরীর মধ্যে একটা অদ্ভুত পরিবর্তন ধরা পড়তে থাকে। লখার মা যে শুধু দরদ দেখাতে আসে না সেটা জানাই ছিল—কি তুকতাক সে খাটাচ্ছে কে জানে।
গৌরীর গুম খাওয়া উদাস ভাবটা তাড়াতাড়ি কেটে যেতে থাকে কিন্তু সেই সঙ্গে দেখা দেয় অন্য এক মারাত্মক উপসর্গ।
এতদিন পরে শেয়ালে-নেওয়া ছেলেটার জন্যে তার শোক ক্ৰমে ক্ৰমে উথলে উঠতে থাকে–একেবারে পাগলামি দাঁড়িয়ে যায়।
বর্ষার নরম মাটির ভিটেতে সিদ কেটে ঢুকে শেয়াল যখন পাশ থেকে বাচ্চাটাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল শোকে তখন আরো বেশি কাতর হয়ে আরো বেশি পাগলামি জুড়লেও খাপছাড়া হত না। দোনলা বন্দুক আর কার্তুজের বেল্ট খুলে মেঝেতে ফেলে রেখে পাশেই নাক ডাকাচ্ছিল অথচ কিছু টের পায় নি–এই দেখে ঈশ্বর বরং কয়েকদিন নাওয়া-খাওয়া বন্ধ রেখেছিল, বুক চাপড়ে কপাল চাপড়ে নিজেকে ধিক্কার দিয়ে দিয়ে কেঁদেছে আর হাহুতাশ করেছে।
সেই তুলনায় গৌরীই বরং শক্ত ছিল, মড়াকান্নায় পাড়া মাত করে দেবার বদলে নিজের মনে একটু কদাকাটা করে গুম খেয়ে গিয়েছিল।
গর্ভে আরেকটির আগমন ঘটার জন্যে কি? এতকাল পরে কি যে হল গৌরীর পেটের ওই সন্তানকে কোলে পাবারও এতদিন পরে—বাচ্চাটার জন্যে সে সারাদিন শুধু বিনিয়ে বিনিয়ে কাঁদে, যতক্ষণ জেগে থাকে ততক্ষণ কাঁদে।
চুলে একটু তেল দিয়ে পিসি জোর করে টেনে নিয়ে গিয়ে ঘাটে চুবিয়ে তাকে চান করিয়ে আনে, ভিজে কাপড় ছাড়িয়ে দেয়। এই সময়টুকু গৌরী কাঁদে না, উদাস নয়নে একদিকে চেয়ে থাকে।
খেতে ডাকলে সাড়া দেয় না।
পিসি জোর করে টেনে নিয়ে গিয়ে ভাতের কাঁসির সামনে বসিয়ে দিলে আবার সে ফোপাতে শুরু করে।
শ্যালে নিয়ে গেল গো–শ্যালে! কোন লজ্জায় পোড়ার মুখে ভাত গুঁজব!
হাত গুটিয়ে হাঁটুতে মুখ খুঁজে ফুলে ফুলে কাঁদে।
এক হাতে গায়ের জোরে তাকে বুকে জাপটে ধরে রেখে পিসি আরেক হাতে কচুর ঘন্ট বা মোচার হেঁচকি অথবা পুঁই চচ্চড়ি এবং পাতলা ডালটুকু দিয়ে ভাত মেখে তার মুখে গুঁজে খুঁজে দিয়ে তাকে খাওয়ায়। মাখা ভাত মুখে গুঁজে দিলে গৌরী খায়।
কিন্তু শুধু তো কান্না নয়। ক্ৰমে ক্ৰমে আরো কয়েকটা দুৰ্লক্ষণ প্রকাশ পেতে থাকে।
মাঝে মাঝে হাততালি দিয়ে যা যা–দূর দূর করে সে কাল্পনিক শেয়ালকে তাড়ায়। বাচ্চার কঁথাকাণিগুলি পোটলা করে বাইরে ফেলে দিয়ে পেঁচিয়ে বলে, এগুলোও তবে নিয়ে যা শ্যাল, তুই-ই তবে মানুষ কর ওটাকে। আয় আয়, নিয়ে যা। ভয় হচ্ছে? রাতেই তবে চুপি চুপি এসে নিয়ে যাসমিনসে যখন ঘুমাবে।
বলে, মাই থেকে দুধ গেলে রাখবখন ভাঁড়টাতে—আদর করে খাইয়ে দিস।
কারখানায় ওভারটাইম ডিউটি সেরে একটু রাত করে ঘরে ফিরে ঈশ্বর পিসির কাছে এসব। বিবরণ শোনে। আরো শোনে যে, তার ফেরত পাওয়া বন্দুকটা আঁকড়ে ধরে সে নাকি সন্ধ্যা থেকে জানলার ঝাপ একটু কঁক করে ঠায় দাঁড়িয়ে ছিল।
পিসি ঘরে ঢুকে কথা কইতে গেলেই বলেছিল, চুপ চুপ আওয়াজ করিস নে পিসি, পালিয়ে যাবে।
কি পালিয়ে যাবে জিজ্ঞাসা করতে যাওয়ামাত্র বন্দুক উচিয়ে মারতে উঠেছিল পিসিকে।
গৌরীর অগোচরে বন্দুকটা ঈশ্বর সাবধানে লুকিয়ে রেখেছিল।
পরদিন ওভারটাইম কাজ না থাকায় সাধু মণ্টাদের সঙ্গে একটু আজ্ঞা দিয়ে সন্ধ্যার পর বাড়ি ফেরামাত্র সে কি কুরুক্ষেত্ৰ কাণ্ড! গৌরী একেবারে ক্ষেপে গিয়ে চেঁচাতে থাকে বন্দুক দাও, মোকে বন্দুক দাও। কোথায় রেখেছ বন্দুক, শিগগির দাও।
বন্দুক পুলিশে নিয়ে গিয়েছে।
কে সে কথা কানে তোলে! বন্দুক দাও, দাও বলে কেঁচাতে চেঁচাতে গৌরী যেন আঁচড়ে কামড়েই ঈশ্বরকে মেরে ফেলার জন্যে যুদ্ধ শুরু করে দেয়-গায়ে নেহাত মিেটা উর্দিটা ছিল বলে রক্তপাত ঘটে না।
পরদিন আরো যেন জোরালো হয়ে ওঠে বাচ্চাটার জন্যে তার শোক। সত্যিকারের মড়াকান্না রু করে দেয়।
সন্ধ্যা হতেই গুম খেয়ে যায়। একটু যেন ধাতস্থ হয়েছে মনে হয়।
কান্না থামিয়ে কি যেন ভাবে।
পিসিকে একবার জিজ্ঞাসাও করে, মাথাটা খানিক বিগড়ে গিয়েছিল নাকি গো পিসি?
পিসি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে।
বলে, পেটের কাটার জন্যে অমন হয় রেহয়। গিয়েছে যাক ভাবিস নে, উপায় কি? আরেকটা তো এয়েছে কোলে, আরো তত হবে। এবার সাবধানে সামলে রাখি।
গৌরী খিলখিল করে হেসে বলে, আবার হবে? ইস।
পিসি ভরসা দিয়ে বলে, হবে! তিনবার মা হয়েছিস, দশবার হতে বাধা নেই। কষ্টও পাবি না পরের বার।
গৌরীর জবাব শুনে পিসির আক্কেল গুড়ম হয়ে যায়।
গৌরী বলে, নাঃ, শ্যালকে দেবার জন্যে আর অত কষ্ট সইব না পিসি। বন্দুকটা ঘরে থাকলে ভালো হত। কঁথাকাণির পুঁটলিটা বাইরে রেখেছি, শ্যালটাকে এসে নিয়ে যেতে বলেছি, নিতে আসবে ঠিক। বন্দুকটা থাকলে গুলি করে মারতে পারতাম।
লখার মাকে ঈশ্বর জিজ্ঞাসা করে, কি তাকতুক করেছ বল দিকি? মাথাটা বিগড়ে দিয়েছ?
