এটা ঈশ্বরের বিনয় কিনা বোঝা যায় না।
জল্পনা কল্পনা হয়েছিল অনেক, মেয়েরা বার বার জোরগলায় অসীম ধৈর্য ও দুঃসাহসের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, বন দেখতে যখন যাওয়া হচ্ছে তখন ভালোভাবে বনের ভিতরটা না দেখে তারা ফিরবে না।
প্রান্তদেশের আলগা ছাড়াছাড়া অংশটুকু বাদ দিলে আসলে বনের মধ্যে সিকি মাইলও এগোনো হয় কিনা সন্দেহ।
জীবিকার সন্ধানে মানুষ নাকি প্রতিদিন গভীর বনে প্রবেশ করে–এই নাকি তাদের নিত্যি চলাচলের পথ! ঝোপ ঠেলে, গাছের ডাল সরিয়ে, কঁটা লতার বাঁধন থেকে শাড়ি ছাড়িয়ে, মাঝে মাঝে প্রায় হামা দেবার মতো কুঁজো হয়ে মানুষ কতদূর এগোতে পারে।
শীতের কুয়াশাবিহীন উজ্জ্বল দিন, কিন্তু বন যেন রাত্রিকে গাঢ় ছায়ার রূপ দিয়ে বুকে ধরে রেখেছে, স্থানে স্থানে প্রায় অন্ধকার।
অনেকগুলি টর্চের আলো জ্বললে কি হবে, গা তবু শিরশির করে।
মিসেস বাগচী বলে, বাবা, দুমকার ওদিকেও শালবন দেখেছি, সে তো এরকম নয়!
বনানী বলে, এ যে সুন্দরী বন–কিরকম সুন্দরী টের পাচ্ছ না?
খানিক এগিয়েই পাওয়া গিয়েছিল একটু ফাঁকা স্থান।
গাছ সেই স্থানটুকুতে গায়ে গায়ে জড়িয়ে ঘন হয়ে ওঠে নি, লতায় পাতায় চালার মতো আচ্ছাদন তৈরি করে নি।
অনেকগুলি ফাঁক দিয়ে ঝলক ঝলক রোদ ঘরের লেপা মেঝের মতো সমতল মসৃণ মাটিতে এসে পড়েছে। এদিকে প্রকাণ্ড একটা ইটের স্থূপ, তার সামনেই কচুরিপানা আর সুন্দর নীল ফুলে। ঠাসা প্রায়-ভরাট হয়ে আসা একটা প্রকাও মজা দিঘি।
সেইখানেই সমাপ্ত হয় তাদের বনাভিযান।
মহাসমারোহে শুরু হয়ে যায় পিকনিকের বিশেষ রান্নাবান্নার ব্যবস্থা।
বয় খানসামা সঙ্গে এসেছে কিন্তু তারা তফাতে দাঁড়িয়ে বসে নিজেদের মধ্যে হাসিগল্পের আড্ডা জমায়–পিকনিকের রান্নাবান্না নিজেরা খেটেখাটে না করলে কি সঙ্গত হয়, না মজা লাগে?
ইটের স্তুপ আর পুম্পিত কচুরিপানায় ঢাকা ভরাট হয়ে আসা দিঘির গল্পটা ঈশ্বর সবে বনানীকে শোনাতে আরম্ভ করেছিল। ইভা, মিসেস বাগচী, সরসীরা কলরব করে ওঠে, আরো জোরে বল ঈশ্বর, শুনতে পাচ্ছি না।
ঈশ্বর বিব্রত হয়ে বলে, আজ্ঞে, আমি শুধু শোনা কথা বলছিলাম। একটু জোরে জোরেই বল না, আমরাও তোমার শোনা কথা শুনি।
ভুঁড়িমোটা বাগচী একটু হেসে বক্তৃতা দিতে রু করে, ঈশ্বরের শোনা কথা শুনে কি লাভ হবে? আসল কথাটা আমি বলছি। এখানে কোনো রাজার বাড়ি ছিল অথবা কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের মন্দির বা মঠ ছিল, আজ আর ঠিক করে বলা যায় না। ইটের কোনো স্ট্রাকচার মানেই সভ্যতার নমুনা। প্রাচীনকালের কোনো নগর হয়তো এখানে ছিল। ধ্বংস হয়ে যাবার পর বন ক্ৰমে ক্ৰমে সেটাকে গ্রাস করে এগিয়ে এসেছে। এখানে মাটি খুঁড়ে রিসার্চ করার বড় রকম একটা প্ল্যান হয়েছে–লাখ দশেক খরচ হবে। দুঃখের কথা আপনাদের বলব কি, দুবছর ধরে চেষ্টা করেও প্ল্যান আজ পর্যন্ত স্যাংশন করানো গেল না।
স্বামীর বলার বহরে খুশি হয়ে মিসেস বাগচী উচ্ছসিতভাবে বলে, সত্যি, ভারতীয় কালচারের নতুন একটা দিকও হয়তো আমরা এখানে খুঁজে পেতাম।
বনানী কেন যে এমন অভদ্রভাবে রেগে যায় কেউ বুঝতে পারে না। সে চেঁচিয়ে বলে, দয়া করে একটু থামবেন মাস্টারমশাই মাস্টারনীরা, একটু গলা বন্ধ করবেন? আপনাদের লেকচার অনেক শুনেছি, পরেও অনেক শুনব, ঈশ্বরের শোনা কথাটা একটু শুনতে দিন।
বিব্রত ঈশ্বর বন্দুকটা একবার এহাতে নেয়, একবার ও-হাতে নেয়।
১২. খাতির ও সম্মান বেড়ে গিয়েছে
সকলের কাছে খাতির ও সম্মান বেড়ে গিয়েছে সন্দেহ কি! ঈশ্বরের বুক দশহাত ফুলে ওঠে।
চেনা মানুষ ও একটু যেন অন্য সুরে মন যুগিয়ে কথা কয়, যেচে যেচে পান বিড়ি তামাক খাওয়ায়, মাঝেমধ্যে দোকানে চা বিটও ভাগ্যে জুটে যায়।
কদিনেই টের পেয়ে যায় এই খাতির ও সম্মানের মর্ম-ফুলকো বেলুনের মতো ফেঁসে যায়। ঈশ্বরের আত্মাভিমান।
ক্লাবের সায়েব মেম বাবু বিবিদের মধ্যে তার পার আছে—এই গুজবটাই হল আসল কথা। প্রত্যাশী মানুষেরা তাকে খাতির করতে আগ্রহ দেখায়, প্রতিদানে তার মারফতে যদি এই সুবিধাটা আদায় হয়, ওই কাজটা হাসিল করা যায়।
ব্যাপার তলিয়ে বুঝে মাথা ঘুরে যায় ঈশ্বরের।
বড় একটা সুযোগ এসেছে জীবনে। একটু চালবাজি চালিয়ে, স্রেফ মুখের কথার পাঁচ কষানো আশ্বাস ভরসায় ভুলিয়ে খেলিয়ে, অনেকের কাছ থেকে সে এটা ওটা আদায় করতে পারে নগদ টাকা-পয়সা পর্যন্ত।
এইভাবেই কি প্রশস্ত হয় ঘুষ আদায়ের পথ? বড়কর্তাদের কাছে শুধু নয় তাদের গিন্নিদের মহলে পর্যন্ত তার খাতিরের সীমা নেই, সুবিধা করে দেবার ক্ষমতা তার আছে–এই বিশ্বাসে ভর করে আশা কুহকিনী অনেকের কানে মন্ত্ৰ জপছে ঘঁড়ি কলসী বেচতে হলেও ঈশ্বরকে খুশি করে নিজের কাজ হাসিল করে নাও।
লখার মারও কি এইরকম কোনো মতলব আছে? পিসির কাছে খবর পায় যে, লখার মা ঘন ঘন গৌরীর কাছে আসছে–বসলে যেন আর উঠতে চায় না। মুখের তো কামাই নেই মাগীর মুখ হাত নেড়ে নানারকম ভঙ্গি করে কী যে সে গৌরীকে শোনায় পিসি অবশ্য তা বলতে পারবে না—পিসি ধারেকাছে ঘেঁষতে গেলে এমন কড়া ধমক দিয়ে লখার মা তাকে দূর দূর করে ভাগিয়ে দেয়। ঘরদুয়ারটাই যেন তার!
ছুটির দিনও লখার মা আসে। ঘরের দাওয়ায় বসে ঈশ্বরের সঙ্গে হাসিমশকরা জুড়ে দেয়, মাঝে মাঝে ঘরের মধ্যে নির্বাক উদাসীনা গৌরীর দিকে তাকায়।
তার মজার কথা হাসির কথা শুনে গৌরীর মুখে একটু হাসি ফুটেছে দেখতে চায় কিনা কে জানে!
