থানায় গিয়ে তার জমা বন্দুকটা ফেরত নিয়ে ঈশ্বরকে ক্লাবে যেতে হয়।
রামসুখলালের কাছ থেকে জেনে বুঝে নিতে হয় সকালে কখন আসবে, কোথায় যাবে, কি করবে ইত্যাদি খুঁটিনাটি সমস্ত ব্যাপার।
রামসুখলাল বলে, আসল বনের ভিতর যাবার ঝোঁক চেপেছে।
অ্যাভেঞ্চার কাকে বলে জান, কখনো নাম শুনেছ? এ হল একরকম ক্ষ্যাপামি, বোকার মতো যেচে গিয়ে কষ্ট করা, বিপদে পড়া। ওই যে বলে না সুখে থাকতে ভূতে কিলোয়ঠিক সেই ব্যাপার। যাক গে, বনে যাবার ঝোঁক চেপেছে, নিয়ে যেতে হবে। এ দায়টা তোমার। গভীর বনে নিয়ে যাবে কিন্তু বিপদ যেন না ঘটে।
রামসুখলাল সিগারেটের মতো সরু একটা সিগার ধরিয়ে হেসে বলে, সত্যি কথা বলি ভাই, রাতারাতি সবাই তোমায় স্পেশাল অফিসার বানিয়ে দিয়েছে। কোন পথে বনের ভিতরে কোথায় যাওয়া হবে, কিভাবে যাওয়া হবে–সব তুমি প্ল্যান করে ঠিক করবে। লেডিজরা চান যে পিকনিকও করবেন, বনটাও ভালো করে দেখে আসবেন।
ঈশ্বর বলে, দফা সেরেছেন আমার।
রামসুখলাল বলে, দরকার মনে করলে দু-চারজন লোকও তুমি সঙ্গে নিতে পার। ওদের দেনাপাওনা তুমি যেমন বলবে আমি তেমনি মিটিয়ে দেব। সকলের ফুর্তির ব্যাপার, পাঁচ-দশ টাকার জন্যে যে আটকাবে না সে তো বুঝতেই পারছ।
ঈশ্বর বলে, দু-চারজন বাড়তি লোক লাগবে বৈকি। সত্যি সত্যি বনের ভেতরে যেতে হলে ওদের ছাড়া চলবে না। মোরা নমাসে ছমাসে বনের মধ্যে যাই, ঠিক পথ খুঁজে বেছে নিবার সাধ্যি আছে মোদের? আজ যে পথে দিব্যি এগোনো যায়, মাসেক পরে সে পথের চিহ্ন খুঁজে মেলা দায়। পথ পেলেই বা কি?–হোথায় হামা দিয়ে, হোথায় বারের মতো এ গাছে চড়ে আরেক গাছের ডাল ধরে ঝুলে, দু পা এগোতে প্রাণান্ত। মেয়েদের কথা বাদ দেন, আপনি আমি ব্যাটা ছেলেরা গুলোর জ্বালায় হিমশিম খেয়ে যাব সুখলালবাবু।
রামসুখলালের নিশ্বাস ফেলার সময় ছিল না, তবু সে দাঁড়িয়ে থেকে কৌতূহলের সঙ্গে জিজ্ঞাসা করে, গুলো? সে আবার কি?
ঈশ্বর চমৎকৃত হয়ে বলে, শুললা জানেন না? সজারুর কাটা দেখেছেন? ওইরকম দেখতে বড় গাছের গোড়া থেকে সিধে ওঠে–চাদ্দিক ছেয়ে যায়। আঃ, দেখতে কি সুন্দর সুখলালবাবু। কিন্তু শুলোর জ্বালায় চলতে ফিরতে বড় মুশকিল হয়।
গাছকে খাড়া রাখতে, বনকে টিকিয়ে রাখতে শুলোর কি ভূমিকা ঈশ্বরেরও তা জানা ছিল না, রামসুখলালকে ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে বলবে কি! ভিজে নরম মাটিতে বড় ভারি গাছের শিকড় যে শুলোর জন্যে শক্ত অবলম্বন পায়, সামান্য ঝড় বাতাসেই গাছ উপড়ে গিয়ে কাত হয়ে পড়ে না, কজনেই বা এ রহস্য জানে।
খুব ভোরে রওনা দেবার কথা ছিল কিন্তু মেয়েদের নিয়ে কারবার তো, প্রথম ব্যাচ তৈরি হতে হতেই দিগন্তে গাছের আড়াল ছেড়ে সূর্যের আবির্ভাব ঘটে যায়। টিম্বার কোম্পানির লঞ্চ দুই দফায় সকলকে নদীর ওপারে ময়নাদলে পৌঁছে দেয়।
সত্যিকারের বনে বনভভাজন করতে যাবে বলেই কি মেয়েরা এমন বিচিত্র বেশ ধারণ করেছে, মেমসায়েবদের আয়ারা পর্যন্ত?
অন্য সকলের চেয়ে রংদার জমকালো শাড়ি জামা পেলে খুশি হয়, একটু অহঙ্কারও জাগে কিন্ত নিজেদের মধ্যে শাড়ি জামার পাল্লা চালাবার আগ্রহ তাদের বিশেষ নেই-আসলে পাল্লা চালায় তারা যাদের চাকরানী তারাই। যে যা-ই মনে করুক, আয়াদেরও কঠোর নীরস জীবন যাত্রা। দিবারাত্র অন্য নারীর ছেলেপুলে সামলে তার মন যুগিয়ে চলা একটা সংসারে স্ত্রী এবং মার কত আসল দায় যে তাদের নিজেদের ঘাড়ে নিয়ে পালন করতে হয়। এ কাজটাই স্ত্রীলোকের জীবনের অভিশাপের মতো।
মেয়েরা সবাই শাড়ি পরেছে। কত দামি কী বিচিত্র শাড়িই যে সবাই গায়ে জড়িয়েছে, রঙিন পেলবতার আলগা ছন্দে লীলায়িত হতে চায়, রঙ্গময়ী প্রকৃতিকে পরাস্ত করতে চায়।
কিন্তু আশ্চর্য এই, মিসেস জনসনের অল্পবয়সী আয়া আমিনার সস্তা একরঙা ছাপা শাড়িটাই যেন সকলের সমস্ত শাড়ির দৰ্প হরণ করেছে।
মিসেস জনসনের গায়ে কায়দা করে জড়ানো কলকাতার তৈরী কাশ্মিরি শাড়িটা পর্যন্ত যেন। খেললা হয়ে গিয়েছে আমিনার সস্তা শাড়িটার কাছে!
আমিনার দেহে তাজা নবযৌবনের রঙে রঙিন হয়ে কি তার সস্তা শাড়িটা হারিয়ে দিয়েছে রংচঙা এতগুলি দামি শাড়িকে!
একমাত্র বনানীর শাড়িটিকে ছাড়া।
কী চমকার যে মানিয়েছে শাড়িটা তার বান-ডাকা নদীর মতো উথলে-ওঠা উছলে-পড়া যৌবনের মোটাসোটা গড়নের জমকালো দেহটায়।
বার বার সকলের নজর আমিনা আর বনানীর দিকে যায়।
ইভা সাধারণ একটি দামি সিল্কের শাড়ি পরে এসেছিল—তার রূপের তুলনা মফস্বলের এই ছোট শহরের ধারেকাছে মিলবে না-তাই কি তার শাড়ির শোভায় রূপ বাড়াবার আগ্রহ নেই?
ইভা সরলভাবে সাগ্রহে বনানীকে জিজ্ঞাসা করে, এ শাড়িটা আবার কবে কিনলে?
বনানী জবাব দেয়, এটা আমার বিয়ের শাড়ি, ট্রাঙ্কে তোলা ছিল।
ক্লাবের পক্ষ থেকে আগেই তিনজন দেশী শিকারি ঠিক করে ফেলা হয়েছিল। ঈশ্বর অন্য ধরনের আরো দুজন পেশাদার শিকারিকে চুক্তি করে সঙ্গে এনেছিল! নিজাম সেখ আর গজেন দাস।
ওদের সম্বল গাদা বন্দুক। তা হোক।
কয়েকটা দামি রাইফেল ও ভালো দোনলা বন্দুক সঙ্গে যাচ্ছে। বন্দুকের অভাবে বিপদে পড়তে হবে না।
ওরা দুজন পথ দেখিয়ে গহন বনে নিয়ে যেতে গাইডের কাজ করবে–বন ওদের খুব ভালো রকম চেনা।
ঈশ্বরের চেয়ে বেশিরকুম চেনা কিনা কে জানে। ঈশ্বর বলে যে বনে ওদের নিত্যি যাতায়াত, তার চেয়ে বন ওদের ঢের বেশি জানাচেনা বৈকি।
