মেদবহুল দেহ নিয়ে জনসন সর্বদাই অস্বস্তি বোধ করে। জনসনের বুড়ি মায়ের মতত শুকনো শীর্ণ নয় কিন্তু জুনিয়ার মিসেস জনসনের প্রায় তারই মতো লিকলিকে চেহারা।
জনসন বলে, ঈশ্বর যাবে বৈকি নিশ্চয় যাবে। আরো কয়েকজন দেশী শিকারিও যাবে।
একজন মন্তব্য করে, ঈশ্বরের বন্দুক নেই, লাইসেন্স নেই।
জনসন কথাটা তুচ্ছ করে উড়িয়ে দিয়ে বলে, বন্দুকের কি অভাব আছে? আমার পুরোনো শটগানটা না হয় ওকে দেব।
পরদিনের অরণ্যাভিযানের জন্যে শিকারি হিসাবে ঈশ্বরকে ভাড়া করে ফেলার জন্য সাইকেল চেপে লোক রওনা হয়ে যায়। সে যখন ফিরে আসে, সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হয়ে গিয়েছে।
তার রিপোর্ট শুনে সকলে থ বনে যায়।
তাদের সঙ্গে শিকারি হিসাবে বনে যেতে ঈশ্বর সরাসরি অস্বীকার করেছে–লাখ টাকা কবুল করলেও সে যাবে না। লাইসেন্স বাতিল করে বন্দুক কেড়ে নিয়ে শিকারি মহলে তাকে অপদস্থ করা হয়েছে–সকলের কাছে তার মাথা কাটা গিয়েছে।
মিসেস জনসন জিজ্ঞাসা করে, ডিয়ার, কাল সকালবেলাই আমাদের রওনা দিতে হবে। ঈশ্বরের বন্দুক আর লাইসেন্সের ব্যবস্থা কি করে হবে?
জনসন হেসে বলে, হবে হবে, সব ঠিক হয়ে যাবে।
এভাবে বেইজ্জত করার পর সাহেবরা কোন মুখে আবার তাকে ডেকে পাঠায়!
খুব নাকি গরম মেজাজ দেখিয়েছে ঈশ্বর!
রবার্টসন রেগে আগুন হয়ে ঘোষণা করে যে, ফ্যাক্টরি খুললেই ঈশ্বরকে সে ফায়ার করবে।
জনসন তাকে ধমক দিয়ে বলে, শাট আপ!
তখন রামসুখলাল ধীরভাবে মৃদুস্বরে আরো একটা সম্ভাবনার কথা জানায়। যে কজন দেশী শিকারিকে আগে থেকেই সঙ্গে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল, তারাও শেষ পর্যন্ত এসে পৌঁছবে কিনা সন্দেহ আছে।
মিসেস জনসন আঁতকে উঠে বলে, ও মাই গড়, আমি তোমাদের পিকনিকে যাচ্ছি না।
ইভা বলে, আমিও না। বীরপুরুষদের ভরসায় বনে মজা করতে গিয়ে বাঘের পেটে যাই আর কি!
মিসেস বাগচী খিলখিল করে হেসে ওঠে। বাঘের পেটে যাওয়া কম মজা নাকি? তবে আমি যেতে রাজি নই!
জনসন ধীরভাবে বলে, ঈশ্বর অন্যায় কথা বলে নি–শিকারির একটা প্ৰেষ্টিজ আছে। বৈকি।
যাই হোক তোমরা ভেব না, ঈশ্বর আমাদের সঙ্গে যাবে, অন্য শিকারিরা যাবে। আমি ব্যবস্থা করছি।
রাতারাতি যেন মন্ত্রবলে অঘটন ঘটে যায়। রাতারাতিই বা কেন। সন্ধ্যায় জনসন মেয়েদের প্রতিশ্রুতি দেয় যে, ঈশ্বর বন্দুক ফিরে পাবে এবং অতিরিক্ত রক্ষী হিসেবে তাদের সঙ্গে বনভোজনে। যাবে। রাত দশটা নাগাদ থানা থেকে লোক তার ঘরে গিয়ে হাজির হয়।
পুলিশের বড়কর্তা এবং জেলার বড় হাকিমও ক্লাবের মেম্বার, সুতরাং বন্দুক বাজেয়াপ্ত করার পরোয়ানা বাতিল করার হুকুম জারি করানো এবং বন্দুকটা ফিরিয়ে আনতে সেই রাত্রেই ঈশ্বরকে থানায় পাঠানোর ব্যবস্থা করা কঠিন হয় না।
ডাক শুনে ডিবরি জ্বেলে বাইরে বেরিয়ে থানার সত্যচরণকে সাধারণ বেশে একা দেখে খানিকটা স্বস্তি বোধ করলেও ঈশ্বর শঙ্কিতভাবে জিজ্ঞাসা করে, কি হয়েছে?
শঙ্করবাবু থানায় একবারটি তোমায় নেমন্তন্ন করেছেন।
কি আবার করলাম? শিকারে ভাড়া খাটতে না চাইলে থানায় যেতে হয় নাকি?
আরে না না, এবার কিছু কর নি। তোমার বরং কপাল খুলেছে যা কিছু করেছিলে সব মাপ হয়ে গিয়েছে। বন্দুকটা ফেরত পাবে, কাল সকালে সাহেবদের পার্টির সঙ্গে শিকার করতে যাবে।
ঈশ্বর ভাবে, স্বপ্ন দেখছে না জেগে আছে? তেজ দেখিয়ে চোটপাট করে ক্লাবের লোককে ভাগিয়ে দেবার জন্যে তাকে শায়েস্তা করার বদলে ক্লাবের সাদাকালো সাহেব বাবুরা তার মান রেখে মন যোগাতে চাইছে!
বাইরে কনকনে ঠাণ্ডা। শুধু ঘেঁড়া ফতুয়াটা গায়ে দিয়ে দুয়ার খুলে বাইরে এসে দাঁড়িয়ে তার রক্ত যেন জমে যাচ্ছিল।
সত্যচরণের গলা থেকে পা পর্যন্ত ঝোলানো লোম-ওঠা কালো মোটা গরম জামা।
ঈশ্বর সংশয়ভরে জিজ্ঞাসা করে, থানায় ধরে নিয়ে গিয়ে মারধর হবে না তো?
সত্যচরণ বিড়ি ধরানো স্থগিত করে হেসে বলে, আরে না না, পাগল নাকি? মারধরের জন্যে দরকার হলে কি এরকম খাতির করে ডাকতে আসতামঃ সঁচ-সাত জনে এসে ধরে বেঁধে নিয়ে যেতাম।
বিড়িটা ধরিয়ে বলে, দেরি করিস না। শঙ্করবাবু চটে যাবে।
গায়ে কিছু চড়িয়ে আসি। কী ঠাণ্ডা পড়ছে বাপ রে বাপ!
কনকনে শীতের রাত্রেও ঈশ্বরকে পশু মারতে বার হতে হয়েছে। কখনো নিজের প্রয়োজনে, কখনো শিকার পার্টির ভাড়াটে হয়ে।
বাপের আমলের একটা গরম জামা ছিল, ঈশ্বর একটা কম্বল জাতীয় চাদর কিনেছে। চাদরটা জীর্ণ হয়ে এলেও মোটামুটি ঠিক আছে। গরম জামাটা পোকায় কেটে ফুটো করে দিয়েছে এবং সব বোতাম গিয়েছে খসে। গৌরী মাথার দুটো সস্তা তামার কাটা খুলে তার জামার বুকটা আটকে দেয়। তার খোপা পিঠে এলিয়ে পড়ে।
থানার দিকে চলতে চলতে সত্যচরণ বলে, ভালুকের মতো দেখাচ্ছে।
ঈশ্বর বলে, বাঘ-ভালুকের দেশে ভালুক না সেজে উপায় কি!
খানিকক্ষণ চুপচাপ হেঁটে থানার সদর বারান্দার ডে-লাইটের আলোটা চোখে পড়ার পর সত্যচরণ বলে, আমায় কিন্তু কিছু দিতে হবে ঈশ্বর।
ঈশ্বর বলে, গায়ের খানিকটা মাংস খুবলিয়ে নিতে পার।
তা বলছি না। তোমার কিছু নেই সেটা জানি। বলছি কি, কাল অনেক কিছু পাবে। সাবদের বাবুদের ক্লাবের পিকনিক–সোজা ব্যাপার নয়। মজা তো লুটবেই, বাড়তি অনেক কিছু পাবে। আমি এটা পাইয়ে দিচ্ছি–আমায় যেন ভুলো না।
আগে তো পাই।
পাবে বৈকি, নিশ্চয় পাবে। ভালোমতো যাতে পাও সেদিকে, মোর নজর রইবে ভাই।–বলে সত্যচরণ নিজের বুকটা ঠুকে দেয়।
