কিন্তু গৌরী কতখানি খুশি হয়েছে বা কৃতজ্ঞতা বোধ করছে আন্দাজও করা যায় না।
তবে ভরসা এই যে, এমনি ঝিমিয়ে গেলেও গৌরী খাওয়াদাওয়া ভালোমতোই করছে। মাছের ঝাল ঝোল অম্বল পেলে তো বেশ পেট পুরেই ভাত খায়।
নির্জীব মনমরা হয়ে থাক, রোগা হয়ে যায় নি। নতুন বাচ্চাটা বিয়োবার ধাক্কা সামলে নিয়ে ঈশ্বরের নতুন চাকরির কল্যাণে শীতকালের পাঁচরকম তরিতরকারি আর কম দামি একটু মাছ দিয়ে ভাত রুটি খেয়ে সে বেশ পুষ্ট হয়ে ওঠে।
ডিম খাবি, মুরগির ডিম? আজিজ বলছিল রোজ দু-তিনটে দিতে পারে। এমনি দেবে, পয়সা নেবে না।
গৌরী একটা হাই তোলে।
খেলে হয়, উপকার হবে। হাসপাতালে তো কত খাইয়ে দিয়েছিল।
গৌরী আবার হাই তুলে শুধু বলে, নাঃ ঘেন্না করে!
শীত জোরালো হতে থাকে। কনকনে উভুরে হাওয়া বয়। বর্ষায় ফুলেওঠা ঘোলাটে হলুদ নদী রোগা হয়ে আসে কিন্তু দুর্দান্ত কোটালের জোয়ার প্রায় একই রকম ফেনিল সুন্দর ভয়ঙ্কর রূপ নিয়ে সমুদ্রের দিক থেকে গর্জন করতে করতে ধেয়ে আসে।
ছুটির পর কারখানার বন্দুক ও কার্তুজের বেল্ট জমা দিয়ে যেতে হয়। ঈশ্বরের প্রাণে আশা জেগেছিল যে, রবার্টসন যখন নিজে থেকে ডেকে এনে চাকরি দিয়ে তাকে খাতির করেছে, এবার হয়তো নিজের বন্দুক আর লাইসেন্স সে ফেরত পাবে।
একদিন রবার্টসনকে সেলাম ঠুকে সে আব্দারটা জানিয়ে দেয়। রবার্টসন গম্ভীরভাবে শুধু মাথা নাড়ে।
খোলসা করে কারণটা বুঝিয়ে বলে না, শুধু জানায় যে ওই বন্দুকের লাইসেন্স রদের সরকারি হুকুমটা বাতিল করা নাকি সম্ভব নয়। তাকে কাজে বহাল করার জন্যে কমিশনার সাদারল্যান্ড সায়েব নাকি খুব বিরক্ত হয়েছেন।
স্টোরকিপার ধীরেনবাবুর কাছ থেকে যেটুকু জানা যায় তা থেকে ব্যাপারটা মোটামুটি আন্দাজ করা কঠিন হয় না। মাথা তো ঠিক ছিল না, ঈশ্বরের লাইসেন্স বাতিল করাতে এত উঁচু সরকারি দপ্তরে এমন সব কথা বানিয়ে বানিয়ে জানানো হয়েছিল আজ আর রবার্টসনের উল্টো গাইবার মুখ নেই অন্তত দু-এক বছর কাবার না হলে।
নিজের বন্দুক কিন্তু ঈশ্বর ফিরে পায়–মেয়েলি আব্দারের জোরে।
শিকারি হিসেবে তার যে কত নাম হয়েছে সেটা ঈশ্বর প্রায় ভুলে যেতে বসেছিল। তার অব্যর্থ লক্ষ্যভেদের ক্ষমতায় ক্লাবের দেশী বিলিতি মহিলাদের অন্ধবিশ্বাস আরার এদিকটা তার চেতনায় স্পষ্ট করে তোলে।
একটা টুলও দেওয়া হয়েছে তার বসে থাকার জন্যে।
মুখ চেনা মানুষেরা দলে দলে কাজে আসে। সেজেগুজে বন্দুক নিয়ে তাকে বসে থাকতে দেখে তারা হাসে।
কেন এই হাসাহাসি?
সে কি সং সেজেছে?
আজিজ, মন্টা ও সাধু একসাথে কথা কইতে কইতে আসে।
একেবারে ঈশ্বরের সামনে এসে তারা নিজেদের মধ্যে কথা বন্ধ করে দাঁড়ায় এবং মুখে একটা উদাস ধরনের অমায়িক ভাব ফুটিয়ে তার দিকে তাকায়। হাত দেড়েকের মধ্যে আসার পর এতক্ষণে ঈশ্বর যেন তাদের নজরে পড়েছে।
১১. বড়দিনের আমোদ উল্লাস
এবার বড়দিনের আমোদ উল্লাসের পরিকল্পনা করা হল নতুন রকম।
ধৰ্মগত আচারগত নিয়ম অনুষ্ঠান যথারীতি পালন করা তো আছেই, নতুনত্বের ব্যবস্থা হল সকলে মিলেমিশে আমোদ ফুর্তি করার ব্যাপারে।
গতবার ক্লাবে শিল্প-প্রদর্শনী, ম্যাজিক এবং সিনেমা দেখাবার ব্যবস্থা করা হয়েছিল নাচ গান ও বিশেষ খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা তো ছিলই।
কিন্তু কিছুতেই যেন জমানো গেল না একদিনের একবেলার আনন্দ করা।
সমস্ত উৎসব অনুষ্ঠান কেমন যেন একটা প্রাণহীন হালকা আলগা ব্যাপারে পরিণত হয়ে গেল।
অনেক পরামর্শের পর ঠিক করা হয়েছে যে, এবার গহন গভীর বনের ভিতর গিয়ে বনভোজন করা হবে।
বনের নামে নিজেদের মনকে চোখ ঠারার ব্যাপার হবে না, শহরের পাশের শহরতলির গায়ের মতো বনের পাশের ঝোপঝাড়ের জঙ্গলে গিয়ে কাজ সেরে এসে মনে করা হবে না যে, অরণ্যকে জয় করে আসা গিয়েছে।
খাঁটি খ্রিল যাতে পাওয়া যায় সেজন্যে যাওয়া হবে দুর্গম অঞ্চলে, সত্যিকারের বনের বুকে।
হিংস্র ভয়ঙ্কর প্রাণীদের যেখানে আসল আস্তানা।
নিরাপত্তার ব্যবস্থা অবশ্য করা হবে ভালোভাবেই।
তাদের নিজস্ব বন্দুক তো থাকবেই। তাছাড়াও চার-পাঁচজন পাকা শিকারি বন্দুক নিয়ে সঙ্গে যাবে।
বয় খানসামা যাবে দশ-বারজন।
সুতরাং ভয়ের কোনো কারণ নেই।
বড়মিঞা থেকে শুরু করে বনের সমস্ত হিংস্র প্রাণী দূরে ঝোপঝাড়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকবে।
ইভা বলে, লুকিয়ে থাকবে? অত ভীরু নয় রয়েল বেঙ্গল টাইগার। নরম মাংসের ঝাঁক দেখে তেড়ে আসবে, মিস্টারদের গুলি ফস্কে যাবে, আমাদের ঘাড় মটকাবে।
আগের দিন বিকালের দিকেই বনভোজনের জল্পনা-কল্পনা নিয়ে ক্লাব-বাড়ি মুখর হয়ে ওঠে–মেয়েরা অনেকে এখন থেকেই বনাভিসারের থ্রিল অনুভব করতে শুরু করেছে। বনের চেয়ে বনবাসী বাঘের ভয়টাই অনেকের মধ্যে দেখা যায়।
মিসেস বাগচী বলে, ঈশ্বরকে সঙ্গে নিলে হত না? বন-জঙ্গল বাঘ-ভালুকের ব্যাপার ও খুব ভালো জানে। কি রকম হাতের তাকদুজনের রাইফেল ফস্কে গেল, ওর গুলিতে বাঘটা মরল।
মিসেস বাগচী বড়ই বাঁচালিকা, হালকা আবোল-তাবোেল কথা সব সময় মুখে লেগেই আছে। তার কোনো কথায় সাধারণত কেউ কান দেয় না; কিন্তু তার আজকের প্রস্তাবটি প্রায় সকলেই সমস্বরে সমর্থন করে।
বিশেষভাবে মেয়েরা।
মিসেস জনসন বলে, ওকে নিলে দোষ কি? সেটির দিকটা তো আছেই, তাছাড়া খাঁটি দেশী শিকারি কু দিয়ে ওরা নাকি কিভাবে হরিণের পাল ভুলিয়ে ডেকে এনে শিকার করে। মারতে চাই না, হরিণের পাল দেখতে চাই।
