ঈশ্বরও প্রভাসের সঙ্গে অন্দরের বারান্দার আড়ালে যায়–দু-তিন হাত তফাতে দাঁড়িয়ে থাকে।
প্রাণে তার আগুন জ্বলছিল।
তার মারা বাঘটা নিয়ে প্রভাস যত খুশি বাহাদুরি আর হৈচৈ করুক, তার কিছু বলার নেই। ওটা সে গোড়াতেই মেনে নিয়েছে। কিন্তু এই সমারোহের সম্পর্কিত মুশকিল ফুশকিল সব তাকে জানতে দিতে হবে।
কিন্তু সে যেন বাতিল হয়ে গিয়েছে একেবারে। তাকে যে টাকাটা প্রভাস দেবে বলেছিল তা দেয় নি। তার সঙ্গে এ পর্যন্ত একটা কথা বলে নি।
সস্তা দেশী বন্দুকটা নিয়ে সদর গেটে পাহারা দেবার হুকুম দিয়েছে।
তাকে এসে দাঁড়াতে দেখে প্রভাস রেগে গিয়েছিল কিন্তু মেঘনাদ ভারি চালাক। প্রভাসের ক্ৰোধ থেকে ঈশ্বরকে সে বাঁচিয়ে দেয়।
বলে, ঈশ্বরদা, তুমিও শোন।
ঈশ্বরকে ধমক দেবার জন্য প্রভাস প্রায় মুখ খুলেছিল–সামলে নিয়ে বিরক্তির সঙ্গে মেঘনাদকে বলে, কি বলবি চটপট বল। কি মুশকিল হয়েছে?
মেঘনাদ বলে, ওদের সবাইকে মিঠাই মণ্ডা দিলে সব শেষ হয়ে যাবে। ভদ্র বাবুরা এলে পায়েস ছাড়া কিছু দেয়া যাবে না।
প্রভাস রেগে বলে, আগে থেকে কেন তোরা জানাস না এসব? মিঠাই মণ্ড দিতে বলেছি, এখন না দিলে আমার মান থাকে? সবাই ছি ছি করবে না?
মেঘনাদ সবিনয়ে বলে, ওরা দল বেঁধে আসবে জানতাম না তো। মোদের একবার জিজ্ঞাসা না করেই আপনি হুকুম দিয়ে দিলেন।
প্রভাস যেন প্ৰাণপণ চেষ্টায় নিজেকে সংযত রেখেছে, ঈশ্বর সেটা টের পায়।
মিঠাই মঙা আনিয়ে নে। মহাদেবের কাছে টাকা চেয়ে নে।
উনি বলছেন, ক্যাশে একদম টাকা নেই। রসিক বলে দিয়েছে ধারে আর খাবার দেবে না। আগেকার বাকি মিটিয়ে না দিলে, আপনার স্লিপ নিয়ে গেলেও দেবে না।
প্রভাসের ফর্সা মুখ আরো লাল হয়ে যায়!
তবু বুদ্ধিমানের মতো বোবা হয়ে দাঁড়িয়ে না থেকে মেঘনাদ পরম মঙ্গলাকাঙ্ক্ষীর মতো তাকে উপদেশ দিতে যায়।
বলে, কি দরকার বাবু বজ্জাতগুলোকে মিঠাই মণ্ডা খাইয়ে! চেঁচিয়ে আপনার নাম করছে, নিজেরা বলাবলি করছে যে, আসলে বাঘটা মেরেছে ঈশ্বর।
প্রভাসের লাথি খেয়ে মেঘনাদের মেঝেতে আছড়ে পড়ার দৃশ্যটা ঈশ্বরের মনে যেন ছাপা হয়ে যায়, গাঁথা হয়ে যায়।
বহুদিন পর্যন্ত এ দৃশ্য বারংবার তার স্মরণে জীবন্ত ছবির মতো দেখা দিয়েছে।
হঠাৎ-মারা লাথি খেয়ে মেঝেতে আছড়ে পড়ে যায় মেঘনাদ। লাথির ব্যথা যত না লাগুক, আছড়ে পড়ার ব্যথা যে তার বেশ লেগেছে সেটা টের পেতে কষ্ট হয় না।
পরমাশ্চর্যের ব্যাপার, মিনিটখানেক মেঝেতে কাত হয়ে পড়ে থেকে ধীরে ধীরে মেঘনাদ উঠে। বসে।
ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়!
সবিনয়ে জিজ্ঞাসা করে, তবে কি করতে বলছেন বাবু?
কয়েক মুহূর্ত প্রভাস স্থির দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে থাকে। তারপর বুড়ো মহাদেবকে ডেকে পাঠায়।
মহাদেব তার অবশিষ্ট জমিজমা ঘরবাড়ি ইত্যাদি দপ্তরের প্রধান কেরানি। অন্য এলাকায় হয়তো আজো মহাদেবকে সাহেব বলা হয়। মেদিনীপুরের কাছাকাছি প্রভাসের ঠাকুরদার জমিদারিতে মহাদেবের বাবাই ছিল নায়েব মশাই।
প্রভাসের বাবাকে মাঝ বয়সেই সেই জমিদারি আরেকজনের হাতে তুলে দিয়ে বিশ্রী একটা দায় থেকে রেহাই পেতে হয়েছিল।
মহাদেব এসে দাঁড়ালে প্রভাস মেঘনাদকে দেখিয়ে হুকুম দেয়, ওর পাওনাপত্র মিটিয়ে এখুনি বিদেয় করে দাও। রাম সিং-কে ডাকবে, বলবে যে, মাইনে বুঝে পাওয়ামাত্র গলাধাক্কা দিয়ে গেটের বাইরে তাড়িয়ে দেবে।
মহাদেব ধীরভাবে বলে, আজ্ঞে হা, ওর কোনো পাওনা নেই। মাইনের হিসেবে একুশ টাকার মতো আগাম নিয়েছে। আপনিই হুকুম দিয়েছিলেন।
প্রভাস গরম হয়ে বলে, ওর যা কিছু আছে সব আটকে দাও। একুশ টাকা শোধ করলে ফেরত পাবে।
মহাদেব তেমনি ধীরভাবে বলে, ওর কিছুই এখানে নেই, কি আটকাব? দুটো ধুতি, গেঞ্জি আর পুরোনো শার্টটা। ওর মালপত্র সোনামুখীর ঘরে আছে।
মোটা কাচের চশমাটা উপরে ঠেলে দিয়ে কয়েকবার কেশে মহাদেব যোগ দেয়, ঘরটা সার্চ করালে কিছু চোরাই মাল পাওয়া যাবে। কাজে লেগে থেকে যা পারে সরিয়েছে। সার্চ করে সব পাওয়া যাবে না–বিক্রি করে দিয়েছে হয়তো। তবু পুলিশ দিয়ে সার্চ করলে যে চোরাই মাল পাওয়া যাবে তাতেই ওকে ছমাস এক বছর জেল খাটাতে পারবেন।
মহাদেব মাথা চুলকোতে শুরু করে বলেই প্রভাস চুপ করে থাকে। মহাদেবের আরো কিছু বলার আছে। মাথা চুলকিয়ে তাকে মাথা ঘামাতে হচ্ছে বলবে কি বলবে না।
মাথা থেকে হাত নামিয়ে মহাদেব বলে, থাকগে যাক। বেশি কথায় দরকার নেই। ঘরটা সার্চ করিয়েই ওকে জেলে দেওয়া চলবে।
ঈশ্বরকে চমকপ্রদভাবে আশ্চর্য করে দিয়ে প্রভাস সোজাসুজি মেঘনাদকে জিজ্ঞাসা করে, তুই যে একেবারে চুপচাপ আছিস? একটা কথা বলছি না যে?
মেঘনাদ আরেকটু মাথা হেঁট করে। স্পষ্ট উচ্চারণে বলে, দোষ-ঘাট চুরি-চামারি সত্যি করেছি বাবু। অভাবের জ্বালায় করেছি। পুলিশ দিয়ে ঘর সার্চ করিয়ে জেলেই যদি দিতে চান, কি বলব বলুন।
প্রভাস বলে, যাক গে, জেলে দেবার হাঙ্গামা করে কাজ নেই, ওকে সোজাসুজি গেটের বার করে দাও। আর যেন ঢোকে না আমার বাড়িতে।
মেঘনাদ যেন খুশি হয়েই বিদায় নেয়।
কাজ থেকে খতম হবার জন্যে তার খুশির ভাবের মানে ঈশ্বর বুঝতে পারে না।
মহাদেব কয়েক মিনিটের মধ্যে ফিরে আসে। একজনকে এক কাপড়ে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিতে আর কতক্ষণ সময় লাগে।
মহাদেব ফিরে এলে প্রভাস আঙুল উঁচিয়ে ঈশ্বরকে দেখিয়ে বলে, ওকে এক মাসের মাইনে বাড়তি দিয়ে হিসেব মিটিয়ে বিদেয় করে দাও। বন্দুকটা রেখে।
১০. ঈশ্বরের ভাগ্য
কিন্তু ঈশ্বরের ভাগ্য যেন ঘুরে গিয়েছে মনে হয়।
