তবু প্রভাস স্বস্তি পায় নি। সে যদি বিগড়ে বিদ্রোহ করে, যদি সত্য ঘটনা প্রকাশ করে দেয় যে, প্রভাসের বন্দুক দিয়েই বাঘটা মেরেছে! হিসাব নিকাশ বিচার বিবেচনা করে তাকে নিজের মতো বন্দুক আর কার্তুজ দিয়েছে।
কয়েক বছর আগের একটা ঘটনা ঈশ্বরের মনে পড়ে।
শিকার কার তাই নিয়ে চূড়ান্ত লড়াইয়ের ব্যাপার।
উঁচু আদালত পর্যন্ত মামলা গড়িয়েছিল।
দুজনেরই ছিল একরকম বন্দুক, এক মার্কা কার্তুজ।
দুজনে ছুড়েছিল প্রায় এক সঙ্গে।
কার গুলিতে শিকার ঘায়েল হয়েছে কেউ বলতে পারে নি।
যারা উপস্থিত ছিল তারাও নয়।
উঁচু আদালতে মামলা যাওয়ার পর কে একজন নাকি এসে হাকিম সায়েবকে জানিয়েছিল, দুজনের দুটো বন্দুক আর শিকারের গায়ে বেঁধা গুলিটা পেলেই নাকি অখণ্ডনীয় প্রমাণ খাড়া করা যাবে গুলিটা কার বন্দুকের।
গুলির গায়ের চিহ্ন দেখেই নাকি বলা যায় সেটা কার, কোন বন্দুকের নল থেকে বেরিয়েছে।
ব্যাপারটা ভালো করে মাথায় ঢেকে নি ঈশ্বরের।
বাঘটা মারার পর প্রভাসের ব্যবহার থেকেই ঈশ্বর বুঝে যায় যে, গুলি পরীক্ষা করে কোন বন্দুক থেকে সেটা বেরিয়েছে বলা সত্যই সম্ভব করেছে শহরের বাবুরা।
পয়সাওলা বাবুরা নয়, মাথাওলা বাবুরা।
কি করে সম্ভব করেছে কে জানে!
প্রভাসের প্রথম গুলি ফস্কে যায়। সর্বাঙ্গ নিশপিশ করে, তবু ঈশ্বর ধৈর্য ধরে নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকে।
বাঘটা গর্জন করে এগিয়ে এসে তাদের নিচু মাচায় লাফ দেবার জন্যে ওত পাতে। এটা আশ্চর্য ব্যাপার কিছুই নয়।
গুলি-খাওয়া বাঘ আহত হয়ে এমন একটা অবস্থায় পৌঁছায় যে, মাথাটাই তার বিগড়ে যায়। তাকে তাকে থেকে শুধু মানুষ মারার ফিকিরেই ফেরে না, বন্দুকের আওয়াজ শুনে পালিয়ে না গিয়ে রুখে দাঁড়ায়।
ভীতসন্ত্রস্ত প্রভাসের দু নম্বর গুলি বাঘটার কয়েক হাত তফাত দিয়ে গিয়ে মালপত্র বয়ে আনার জন্য গরুর গাড়িটার জোয়াল-খোলা ষড়টার গায়ে গিয়ে বিধলেও ঈশ্বর ধৈর্য হারায় না।
কিন্তু বাঘটাকে তখন না মারলে আর উপায় ছিল না। এক গুলিতে না মারতে পারলে ক্ষ্যাপা বাঘটা তাদের দুজনকে নিশ্চয় সাবাড় করত।
লাফিয়ে পড়ার জন্যে যখন গুড়ি পেতেছিল সামনাসামনি মাত্র কয়েক হাত তফাতে হিংসায় জ্বলজ্বল করছিল দুটো চোখ।
ওই দুটো চোখের মাঝখান লক্ষ্য করে অগত্যা ঈশ্বর গুলি ছোড়ে।
প্রভাসের দেওয়া দামি রাইফেলের গুলিই ছোড়ে।
আকাশের দিকে লাফ দিয়ে উঠে চিৎ হয়ে পড়ে একবার শুধু হাত-পা সটান করার চেষ্টা করে বাঘটা। তারপর নিশ্চল হয়ে যায়।
প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই প্রভাস বলে, বন্দুকটা দে।
আঁকড়ে ধরে থাকতে ইচ্ছা হয় বন্দুকটা। আরেকটা কার্তুজ খরচ করে প্রভাসের মর্মস্থানে গুলি করতেও ইচ্ছা হয়।
নীরবে বন্দুক আর কার্তুজ সে প্রসকে ফিরিয়ে দেয়।
মনে হয়, কী এমন কম জোরের লাথিটা সে খেল?
পরদিন মহোৎসব হয়।
বাপকে ছাড়িয়ে ঠাকুরদার মতো সে গ্রাম ও গ্রামান্তরকে লুচি মিষ্টান্ন ভোগ দেয়।
সাত শ মন গম আর সাতাশি মন আটা পচে যাচ্ছিল বন্ধু গুণধর বাগচীর গোপন করা গুদামে।
অনেক বড় বড় পদস্থ মানুষের সঙ্গে বাগচীর দহরম মহরম আছে। সে নিজে এসে প্ৰভাসকে আলিঙ্গন করে।
লোককে দেখাবার জন্যে অস্থায়ীভাবে বাঘের মৃতদেহে পচন নিবারণের ব্যবস্থা করা হয় তারপর চামড়া ছাড়িয়ে নেওয়া হবে।
এ অঞ্চলে শিকার করা বাঘ প্ৰায় সকলেই বহুবার দেখেছে, জ্যান্ত বাঘও দু-একটা অনেকে। দেখে নি এমন নয়।
তবু চারিদিক থেকে দলে দলে সব বয়সের মেয়েপুরুষ ভিড় করে এই বাঘটাকে দেখতে আসে।
প্রত্যেককে লুচি দেওয়া হচ্ছে এ খবরটা ছড়িয়ে যাওয়ার ফলে এরকম ভিড় হয় অথবা এগারজন মানুষকে যমালয়ে পাঠিয়েছে যে জীবটা তাকে দেখবার স্বাভাবিক কৌতুহলের ফলে এটা ঘটে, তা অবশ্য ভেবে দেখার বিষয়।
প্রতি বছর দু-চারটে বাঘ বিগড়ে গিয়ে মানুষ খেতে শুরু করে। কোনোটা দু-একজন মানুষ মেরেই ঘায়েল হয়, কোনোটা দশ বিশজনকে মেরে চারিদিকে ত্রাসের সঞ্চার করে।
সুতরাং মানুষখেকো বাঘও এ অঞ্চলে নতুন কিছু নয়।
বিশেষ বিশেষ শ্রেণীর লোকের কাছ থেকে প্রভাস অকুণ্ঠ প্ৰশংসা, জয়গান অথবা আশীৰ্বাদ শুনবে আশা করেছিল।
সবই কিছু কিছু সে শোনে।
কিন্তু অনেকেরই কেমন যেন কুণ্ঠিত ভাব। নীরবে আসে, বাঘ দেখে লুচি মিষ্টান্ন খেয়ে নীরবেই আবার চলে যায়!
এলবাৰ্ট নেলসন টিম্বার ফ্যাক্টরির একদল মজুর বাঘ দেখতে এসেই বরং সমবেতকণ্ঠে এমন প্রচণ্ড আওয়াজে জয়ধ্বনি তোলে যে, প্রভাস চমকে উঠে ভড়কে যায়।
আওয়াজটা জয়ধ্বনি বুঝতে পেরে তার স্বস্তি ফিরে আসে!
তখন সামনে এগিয়ে গিয়ে সে হুকুম জারি করে, লুচির সঙ্গে এদের পায়েস দিও, মিঠাই দিও, মণ্ডাও দিও।
মজুর-দলের নেতৃস্থানীয় ভূষণ জানায়, আমাদের কারখানার দুজন সাথীকে এ বাঘটা মেরেছিল। কোম্পানির কাজে গাছে মার্কা মারতে গিয়েছিল, তখন মেরেছে। সাবরা সেটা মানছে। না। বলছে যে, বনে যারা কাজ করতে যাবে তাদের সেটির জন্য মাইনে-করা লোক রাখা হয়েছে বন্দুক চালাতে ওস্তাদ পাকা লোক, আগে সৈনিক ছিল। বাঘ ওদের মেরে থাকলেও কোম্পানি দায়ী নয়।
ঈশ্বর চেঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করে, তোমরা কি বলছ?
ভূষণ বলে, আমরা বলছি মেশিনে অ্যাকসিডেন্ট হয়ে মরাও যা, কোম্পানির কাজে বনে গিয়ে বাঘের হাতে মরাও তাই। ক্ষতিপূরণ দিতেই হবে।
মেঘনাদ এসে নিচুস্বরে প্রভাসকে বলে, বাবু একটু আড়ালে আসবেন? একটা মুশকিল হয়েছে।
