তিনটে দিনও তাকে বেকার হয়ে ঘরে বসে থাকতে হয় না।
স্বয়ং রবার্টসন তাকে ডেকে পাঠায়।
চাকরি দেবার জন্যে!
সুখে এসে বসে, পান বিড়ি চেয়ে নিয়ে খায়, খানিকক্ষণ আলগা এলোমেলো কথা চালিয়ে যাবার পর বলে, সায়েব তোকে একবার ডেকেছে ঈশ্বর। কাল সকালে সায়েবের বাংলোয় গিয়ে দেখা করিস।
কি মতলব?
মতলব ভালো। ভালো কাজ দেবে। তোর মতো একজন লোকের দরকার হয়েছে। মাইনে কত পাবি শুনলে পিলে তোর চমকে যাবে ঈশ্বর!
ভালো মাইনে দিয়ে কাজে লাগিয়ে জব্দ করার মতলব নয় তো?
সুখেন্দু হেসে বলে, পাগল নাকি? একটা ব্যাপার হয়ে গিয়েছে, ফুরিয়ে গিয়েছে। দু-চার শ টাকার মামলা–সায়েব কি কেয়ার করে?
ঈশ্বর দু ভাঁড় চা আর দুটো সিগারেট আনায়। একটা দেশলাইয়ের কাঠি জ্বালিয়ে সুখের সিগারেট ধরিয়ে দিয়ে অন্যটা নিজে ধরায়।
জিজ্ঞাসা করে, কি ধরনের কাজ শুনেছ কিছু?
সুখেন্দু বলে, তোমার যা কাজ। বন্দুক ধরতে, তাক করতে শিখেছ–তোমার যেটা গুণ।
সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে সুখে বলে, সকাল মানে সাড়ে আটটা। ঘড়ি ধরে যেও আগেও নয় পরেও নয়।
ঘড়ি কোথা পাব রে বাবা!
আরে বোকারাম! একটু আগে থেকে যাবে খানসামা আর্দালিকে জানিয়ে রাখবে, সায়েব সাড়ে আটটায় তোমায় মোলাকাত করতে হুকুম দিয়েছে। ঠিক সময়ে সায়েব ডেকে পাঠাবে।
সুখে একটু হাসে। তোমার যে ঘড়ি নেই সায়েব তা জানে না? অত বোকা অত বেহিসেবী ভেব না সায়েবকে। সুখে বিদায় নেয়।
ঈশ্বর আশ্চর্য হয়ে ভাবে যে, মধ্যস্থ হয়ে মোটা বেতনের চাকরি জুটিয়ে দিতে এসেও সুখে দশ-বিশ টাকা দাবি করল না!
দু-একটা ঘড়ি কি আর পাড়ায় নেই!
দু-চারজন বাবু কি আর বাস করে না তার এই নোংরা ডোবা পুকুর বাঁশবনের এলাকায়!
কিন্তু মুশকিল এই যে, ঘড়ি কটাকে বিশ্বাস করা যায় না।
কোনোটা এগিয়ে আছে, কোনোটা পিছিয়ে আছে।
সাড়ে আটটার ঘণ্টাখানেক আগেই ঈশ্বর রবার্টসনের বাংলোর গেটে হাজির হয়।
আলগা পাতলা নিচু গেট, একটা ছিটকিনি তুলেই খোলা যায়।
গেটে জমাদারও নেই।
খানিকক্ষণ অপেক্ষা করে ঈশ্বর সন্তৰ্পণে ছিটকিনি তুলে গেট খুলে বাংলোর সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।
প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ফর্সা ধোপ-কাচা উর্দি পরা খানসামা জিলাই শেখ এসে জানায়, রবার্টসন তাকে অপেক্ষা করতে বলেছে।
সায়েবের ব্রেকফাস্ট শেষ হবার পর মোলাকাত হবে।
ঈশ্বর অপেক্ষা করে।
কয়েক মিনিটের মধ্যে জেলি মাখানো এক পিস্ টোস্ট আর এক কাপ চা তার কাছে পৌঁছে যায়।
নোংরা চটা ওঠা পুরোনো বাতিল কাপ ও প্লেটে।
ঈশ্বর ওসব ছোঁয় না।
বলে, জাত যাবে ভাই। কোনোমতে টের পেলেই আপনজনেরা এসে হামলা করবে মাথা মুড়িয়ে ঘোল ঢেলে বদর নাচাবে।
জিলাই বলে, পুলিশ ডাকবে।
ঈশ্বর বলে, পুলিশে হয় না রে ভাই, বললেই হয় নিজের খুশিতে জাত ছেড়েছি, বেশ করেছি। কেউ তার কিছু করবে না, শুধু জাত থেকে ঠেলে দেবে।
ঈশ্বরকে রবার্টসন ড্রয়িং রুমেই ডেকে পাঠায়। হালকা সুশ্রী আসবাবে সাজানো ঘরখানা দেখে ঈশ্বরের খুব ভালো লাগে।
রবার্টসন একটা বেতের সোফায় বসে আছে। পরনে শুধু পায়জামা আর মোটা রঙিন সুতোর গেঞ্জি।
ওপাশের সোফার কোণে বসে ইভা উলের কিছু একটা বুনছে।
রবার্টসন ভণিতা করে না। এলোমেলো কথা বলে না।
বাঘ মারার ব্যাপার নিয়ে তাকে ঠকানোর অপরাধ সে যে ক্ষমা করেছে সে প্রসঙ্গও তোলে না।
সোজাসুজি কাজের কথা বলে।
বলে, ফ্যাক্টরিমে কাম করে গা? তুম বহুত আচ্ছা শিকারি হ্যায়, হাম আচ্ছা আদমিকো মাতা।
কি চাকরি?
ফ্যাক্টরির পাহারাদারি।
প্রভাসের গেটে পাহারা দেওয়ার জন্যে যে মাইনে পেত তার ডবলেরও বেশি।
টুকিটাকি অন্য পাওনাও কিছু আছে!
ছুটকো কাজ নয়, সনদপত্র দিয়ে তাকে নিয়োগ করা হবে, খাতাপত্রে লেখা থাকবে যে তাকে এই কাজে লাগানো হয়েছে।
সাধারণ উর্দি নয়, তাকে বিশেষ পোশাক দেওয়া হবে সৈনিকের পোশাক। খাকি প্যান্ট কোট মোজা বুট জুতো।
ঈশ্বর জানে যে, আখেরে কপাল তার পুড়বেই।
কিভাবে পুড়বে সেটা টের পেতে দেরি হবে কিছুদিন।
চোখ-কান বুজে সে ভাঙা বকা অক্ষরে নাম সই করে চাকরিটা স্বীকার করে নেয়।
তারপর যা থাকে কপালে।
কারখানা থেকে ইউনিফর্ম ইত্যাদি নিয়ে যাবে। পরদিন সকালে একেবারে সেজগুজে তৈরি হয়ে কারখানায় আসবে।
তখন তাকে দেওয়া হবে বন্দুক। সে কারখানা পাহারা দেবে।
সুখে বাইরে বসে পান চিবোতে চিবোতে সিগ্রেট ফুঁকছিল।
সে ঈশ্বরকে বলে, সেলুনে চুল হেঁটে এস। স্মার্ট পোশাক হবে, ঝকঝকে বন্দুক হবে, উষ্কখুষ্ক চুল দাড়ি মানাবে না।
তারপর সে হেসে জিজ্ঞাসা করে, চা টোস্ট নাকি খাও নি দাদা? আজো ওসব আঁকড়ে আছ?
ঈশ্বর হালকা সুরে বলে, আরে না। শিকারে গিয়ে খ্রিস্টান মোছলমান বাছবিচার রেখেছি?–বনে শিকারে গিয়ে কতবার একসাথে ভাগাভাগি করে খানা খেয়েছি। ভাবলাম কি, আগেই কেন সায়েবের নুন খাব–কাজটা আগে থোক।
বটে নাকি, অঃ।
রবার্টসনের দেওয়া সনদ কারখানা আপিসে দাখিল করে, যথারীতি কাগজে পত্রে কাজে বহাল হয়ে উর্দি, জুতো, মোজা ইত্যাদি বুঝে নিতে গিয়ে ঈশ্বরের মাথা ঘুরে যায়।
সৈনিকের পোশাক? এ তো সেনাপতির সাজ।
গৌরী দেখে বলে, মা গো মা, এই সাজে সংটি সেজে তুমি কাজে যাবে!
একটি ভাঁজও যাতে নষ্ট না হয় এমনিভাবে সন্তৰ্পণে ঈশ্বর উর্দিটা বিয়েতে পাওয়া টিনের বাক্সটায় তুলে রাখে।
বেতন আর বাড়তি পাওনার হিসাবটা মনে মনে কষে আর ভাবে, সত্যই কি ভাগ্য তার এতদিনে ফিরল?
