তবে একজনকেও ভালোভাবে ভোজন করতে পারে নি।
গায়ের চাষীরা দল বেঁধে হৈ হৈ করে গিয়ে উদ্ধার করে এনেছে আকে খাওয়া, সিকি খাওয়া, খানিক খাওয়া দেহগুলি।
খবর ঈশ্বরও পেয়েছে।
সাধে কি প্ৰাণ আফসোসে গুলিয়ে যায়!
স্বাধীন হলে, নিজের একটা গাদা বন্দুক, দেশী বন্দুক থাকলেও ঈশ্বর বেরিয়ে পড়ত। বড় একটা গাছের ডালে সারারাত বসার ব্যবস্থা করে মারত বাঘটাকে।
ঘুম?
একটা মানুষখেকো বাঘ মারতে একরাত একদিন না ঘুমোলে কী এসে যায়?
হয়তো মারতে পারবে, হয়তো পারবে না।
ইস, তার যদি একটা বিলিতি রাইফেল বন্দুক থাকত।
এগারজন মানুষ মেরেছে, ওই বাঘটাকে আর কি সে দু-চারদিনের জন্যেও বাঁচতে দিত।
প্রভাসের বন্দুকটা ঘরেই আছে–যে বন্দুক নিয়ে সে ভাসের সদর গেট পাহারা দেয়, রাত্রে টহল দেয়। কিন্তু এ বন্দুক নিয়ে বাঘ শিকারে যাবার কথা ভাবতেও ঈশ্বরের মন আত্মধিক্কারে কুঁকড়ে গিয়েছে।
বাঘ শিকারের ব্যাপার নিয়ে একবার সে ঠকিয়েছে প্রভাসকে। তার জের আজো মেটে নি।
ওই বন্দুক থাকতেও একটা শেয়ালকে সে ঠেকাতে পারে নি তার বাচ্চাটাকে টেনে নিয়ে। গিয়েছে।
প্রভাসকে সে কাজের শর্ত হিসাবে কথা দিয়েছে যে, সুযোগ সুবিধামতো বড় একটা বাঘ শিকারের ব্যবস্থা করে দেবে।
তাকে না জানিয়ে কোন লজ্জায় তার বন্দুক তার কার্তুজ নিয়ে সে বাঘ মারতে যাবে?
ঈশ্বর অনুমান করে যে, বাঘটার খবর শুনেই প্রভাস তাকে এমন জরুরি তাগিদ দিয়ে ডেকে পাঠিয়েছে, নইলে বনানীর কৃপায় আরো দু-একদিন ছুটি তার কপালে জুটে যেত।
ছুটি দরকার ছিল।
গৌরীর জন্যে।
বাচ্চার শোকে গৌরী যেন কেমন হয়ে গিয়েছে। তাকে চব্বিশ ঘণ্টা চোখে চোখে রেখে সামলে চলা জরুরি ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কিন্তু উপায় নেই। কাজ না করলে তাদের কারো পেটই চলবে না।
কাজে যোগ দেবার ঘণ্টাখানেক পরে প্রভাস তাকে ডেকে পাঠিয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে ওই বাঘটার কথাই বলে। বলে, রবার্টসন অনেক চেষ্টা করেছে বাঘটার পাত্তাই পায় নি। আমি চেষ্টা করব ভাবছি, তুই আমার সঙ্গে থাকবি।
ঈশ্বরের মুখের ভাব লক্ষ করে প্রভাস তাড়াতাড়ি যোগ দেয়, আমি তোকে ভালো বন্দুক দেব। ওসব নিয়ে ভাবিস না। ওসব ব্যবস্থা আমি করব। বাঘটা নাকি একজন শিকারিকেও মেরেছে–দেশী বন্দুক নিয়ে গিয়েছিল।
একজন কি বাবু? তিনজনকে মেরেছে। ওরা অবিশ্যি বাঘটাকে মারতে যায় নি, অন্য শিকারের খোজে গিয়েছিল। পিছন থেকে এসে ঝাপিয়ে পড়ে ঘায়েল করেছে। ভারি চালাক বাঘ। মানুষ মারতে শুরু করার পর এমনি চালাকই হয়ে যায়। সহজ ব্যবস্থায় এসব বাঘ মারা যায় না বাবু। মারতে গেলে বিপদ ঘটে।
প্রভাস মিষ্টি সুরে বলে, তাই তোকে সঙ্গে নিতে চাইছি। তুই আমার পেছনটা বাঁচাবি।
ঈশ্বর ধীরকণ্ঠে বলে, ভালো বন্দুক হাতে থাকলে পেছনটা কেন সামনেটাও বাঁচাতে পারব বাবু।
খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে প্রভাস বলে, বাঘটা মারলেই পঞ্চাশ টাকা পাবি। শুধু তাই নয়, বাঘটাকে যদি আমি মারতে পারি, তোর মাইনেও কিছু বাড়িয়ে দেব।
শিকারের ব্যবস্থা সব প্রভাসেরই করার কথা–পাকা একজন দেশী শিকারি হিসাবে ঈশ্বর কেবল তার সঙ্গে থাকবে।
কোনো অঘটন ঘটার সম্ভাবনা দেখা দিলে সামাল দেবে।
বাঘ মারার আসল দায় তার নয়। শিকারের প্ল্যান ঠিক করার দায়ও নয়।
কিন্তু যতই সমারোহের সঙ্গে শিকারের আয়োজন করা হোক, শুধু বন্দুক কেন, আধুনিক কামান থেকে এটম বোমা পর্যন্ত সমস্ত রকম অস্ত্র নিয়ে অভিযান করা হোক, শিকারকে যদি না অস্ত্রশস্ত্রের পাল্লার মধ্যে পাওয়া যায়, কি হবে ওই অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে।
রবার্টসনের অনেক আয়োজন অনেক সমারোহময় প্রচেষ্টার ব্যর্থতার তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে জ্ঞান সঞ্চয় করেছে প্রভাস।
ঈশ্বরের কাছে সব বিষয়ে সে পরামর্শ চায় রবার্টসন পারে নি, যদিও মানুষখেকো বাঘটাকে মারার ইচ্ছা তার আন্তরিক।
ইচ্ছাপূরণের উপায়টা তার জানা নেই।
বাঘটা সত্যই যেন শয়তান।
গাছের গুঁড়িতে তারই জন্যে ছাগল বেঁধে দিলে সে ছাগলের ত্রিসীমানায় ঘেঁষে না, খানিক। দূরের ডোবার ঘাটে ছেলের-মা সধবা বৌটাকে ঘায়েল করে টেনে নিয়ে গিয়ে ছাগল-বাঁধা গাছটার খানিক তফাতে বাঁশবনটার আরেক প্রান্তে দেহটার হয়তো সামান্য অংশ খেয়েই ভেগে যায়।
ছাগল বেঁধে রেখে যে সব শিকারিরা আড়ালে লুকিয়ে ছিল, তারা টেরও পায় না।
এ বাঘ মারতে ঈশ্বরের পরামর্শ দরকার বৈকি!
ঈশ্বর বলে, হৈচৈ সমারোহ করলে কিছু ফল হবে না বাবু। বললাম তো, ভারি চালাক বাঘ, এগারটা মানুষ মেরেছে, মাংস খেয়েছে, রক্ত খেয়েছে, ছাগল দিয়ে এ বাঘকে ভুলানো যায়? যতই পুষ্ট ছাগল দেন, ধারেকাছে ভিড়বে না।
ঈশ্বরের মনে অসীম কৌতূহল ছিল যে, বাঘ শিকারে যাবার সময় প্ৰভাস তাকে কিরকম বন্দুক দেবে। শেষ মুহূর্তে প্রভাস তার হাতে অবিকল তার নিজের মতোই দামি রাইফেল ও কার্তুজ তুলে দিলে সমস্ত ব্যাপারটা তার কাছে জল হয়ে যায়।
ভিন্নরকম বন্দুক নয়, ভিন্নরকম কার্তুজ নয়। ঈশ্বরের গুলিতে বাঘটা ঘায়েল হলেও তার কোনোরকম চালাকি করার পথ খোলা রইল না।
প্রভাস অনায়াসে বলতে পারবে তারই রাইফেলের গুলি বাঘটাকে মেরেছে।
ঈশ্বর মনে মনে হাসে। তাকে অত্যন্ত চালাক মানুষ মনে করে কত সতর্কতার সঙ্গে কত হিসাব করে প্রভাস আটঘাট বেঁধেছে আন্দাজ করে একটু গর্ব বোধ করে।
এমনিতেই বাঘ মেরেছি বলার উপায় তার ছিল না। তার লাইসেন্স নেই, বন্দুক নেই। ভাড়াটে শিকারি নয়, খানসামা হিসাবে তাকে সঙ্গে নেওয়া হয়েছিল বলা হলেও সেটা মেনে নেওয়া ছাড়া তার গতি ছিল না।
