তেমনি বাবু বেশধারী কম বয়সী আরেকজন উঠে আসতে আসতে কাচের গ্লাসে হোঁচট খেয়ে সামলে নিতে নিতে বলে, কি শুরু করেছেন প্রভাসবাবু? বললাম তো আমরা চলে যাচ্ছি!।
প্রভাস চিৎকার করে ঈশ্বরকে হুকুম দেয়, এ শালাকে আগে গুলি করে মার। তারপর ওই ব্যাটাকে মারবি। তোল বলছি বন্দুক–
শাড়ি গয়নায় সুশোভিতা মোটাসোটা ফর্সা বনানী পাগলিনীর মতো নেমে আসে দোতলা থেকে। এমনভাবে সিঁড়ি বেয়ে নামতে গিয়ে সে যে আছাড় খায় না সেটাই আশ্চর্য মনে হয়।
কোনোদিকে তাকায় না, কারো সাহায্য চায় না, দুহাতে প্রভাসকে জড়িয়ে ধরে একরকম গায়ের জোরেই টানতে টানতে ছোট বৈঠকখানায় নিয়ে যায়, একরকম আছড়ে ফেলে দেয় বড় চওড়া সোফাটাতে।
প্রভাসের জন্মদিনের আনন্দের আসর দেখতে দেখতে ফাঁকা হয়ে খ খ করতে থাকে। দু-চারজন যারা যে কোন মুহুর্তে ফরাসে কাত হয়ে ঢলে পড়ে এখানেই বাকি রাতটা কাটিয়ে দেবার অবস্থায় পৌঁছেছিল, তাদেরও অন্যেরা ধরাধরি করে নিয়ে গিয়ে নিজেদের গাড়িতে তোলে।
গাড়িগুলি একে একে চলতে শুরু করলে ঠিক যেন প্রভাসের জন্মদিনে তাদের ফুর্তি করার পরিণামকে টিটকারি দিয়েই ওদিকের আমবাগানে একদল শিয়াল আনন্দে সমস্বরে পেঁচিয়ে ওঠে।
কতক্ষণই বা কাটে তারপর। পাঁচ-দশ মিনিটের বেশি নয়। বনানী ছায়ার মতো একেবারে সদর গেটে এসে দাঁড়ায়।
কদিন আগে তোর না একটা বাচ্চা হয়েছে ঈশ্বর?
হ্যাঁ, মা! দুটো পুরোনো কাপড় মেগে নিলাম?
তুই বাবা বাড়ি যা, আজ তোর ছুটি। বন্দুকটা নিয়েই চলে যা। বাবুর যেমন মাথা গরম হয়েছে, কখন তোকে ডাকবে কে জানে আমাকে গুলি করতে হুকুম দিয়ে বসবে। ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে থাকগে যা।
বন্দুক নিয়ে যাব গিন্নিমা?
নিয়ে যেতেই তো বলছি। তোর কোনো ভয় নেই। আমি দায় নিলাম।
যাবার জন্যে প্রস্তুত হয়ে ঈশ্বর সসঙ্কোচে জিজ্ঞাসা করে, গিনিমা, বাবুর ঘোট বন্দুকটা–?
সন্ধ্যার পরেই সেটা লুকিয়ে ফেলেছি রে, ওটুকু বুদ্ধি তোর গিন্নিমার আছে।
এত রাত্রে এমন অসময়ে তার ঘরে ফেরা নিয়ে মৃদু একটু হৈচৈ বাধার উপক্রম ঘটলে এক ধমকে ঈশ্বর সেটা থামিয়ে দেয়।
বন্দুকটা উঁচিয়ে বলে, জ্বর এসেছে, ঘুম পেয়েছে, ঘুমোতে এয়েছি! যে চেঁচামেচি করবে তাকে গুলি করে মেরে ফেলব।
বন্দুকটা পাশে নিয়ে শুয়ে পড়ার পাঁচ মিনিটের মধ্যে তার নাক ডেকে ওঠে!
মশার কামড়ও কি আরো কিছুক্ষণ ঠেকাতে পারে না তার গাঢ় ঘুম?
গৌরী প্রথমে জাগে, পাশে হাত দেয়, তারপর পাগলের মতো বিছানা হাতড়াতে হাতড়াতে চেঁচায়, এ কি সব্বেনাশ!
পিসি বলে, হয়েছে কি?
বাচ্চাটা গেল কই গো?
পিসি ওয়েছিল কুনোকে পাশে নিয়ে, তিন পুরুষের আমকাঠের সাদামাটা সেকেলে শক্ত চৌকিতে। তাড়াতাড়ি পাশের কুনের গায়ে হাত দিয়ে সে সর্বাগ্রে একটা বিষয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে নেয়–মাঝরাতে তিন মাসের বাচ্চটাকে কুনোর মা হাতড়ে খুঁজে না পাক অন্ধকার ঘরে, খাটের বিছানায়, তার বড় বাচ্চাটা ঠিকই আছে।
উঠে আলো জ্বালে। সত্যই তো কোথায় গেল কুনোর মার কচি বাচ্চাটা?
তিন মাসের শিশু নিজে থেকে কোথাও নড়েচড়ে সরে যেতে পারবে না, তবু পিসি সুপ্রাচীন চৌকিটার তলাটা প্রদীপ নিয়ে খুঁজে দেখতে যায়। পিছনের বেড়ার গায়ের ফোরটার দিকে তাকিয়ে তার হয়ে যায় চক্ষুস্থির।
দেখেই টের পাওয়া যায়, সিঁদকাঠি দিয়ে মানুষচোরের কাটা ফাঁক নয়, শিয়ালের থাবায় পাঁতে কাটা ফাক।
দাঁত লাগাবার কষ্ট স্বীকার করতে হয়েছে কিনা সে জানে! জীর্ণ বেড়াটাকে এ বছরের বর্ষা পচা ঝুরঝুরে করে দিয়েছে।
কপাল চাপড়ে পিসি বলে, মা হয়ে তুই এমন ঘুম ঘুমোস হতচ্ছাড়ি মাগীঃ শ্যাল এসে পাশ থেকে ছেলে তুলে নিয়ে যায়, টের পাস না?
শ্যাল নিয়ে গিয়েছে কি গো?
তবে কি পাখা গজিয়ে উড়ে গিয়েছে?
ঈশ্বরকে ঠেলা দিতেই সে ধড়মড় করে উঠে বসে, পাশ থেকে বন্দুকটা তুলে নিয়ে পেঁচিয়ে ওঠে, কে? কে?
কুনোর পিসি কপাল চাপড়ে বলে, কেউ না রে, কেউ না–শ্যাল।
শ্যাল কি গো, শ্যাল?
কপালের কথা বলিস কেন বাবা, শ্যালে তার ছেলেটাকে নিয়ে গিয়েছে।
ঈশ্বরের হাত থেকে বন্দুকটা খসে পড়ে যায়। বিহ্বলের মতো সে জিজ্ঞেস করে, শ্যালে নিয়ে গিয়েছে?
তিনদিন ঈশ্বর কাজে যায় না। গৌরীকে সামলায়।
মেঘনাদ এসে খবর জেনে যায়।
তার লাইসেন্স আর বন্দুকটা যে আবার বাজেয়াপ্ত হয় না, সে কি বনানী তাকে অভয় দিয়েছিল বলে?
বন্দুকটা প্রভাসের।
কিন্তু কাজ না করলে চলবে না।
বন্দুক পাশে নিয়ে ঘরে শুয়েছিল, শেয়াল এসে ঘর থেকে বাচ্চাটাকে টেনে নিয়ে গিয়েছে। বাঘমারা জাত শিকারি ঈশ্বরের বাচ্চাটাকে!
দুঃখ লজ্জা ঘৃণায় মরে যেতে ইচ্ছা হলেও সত্যিই তো আর মারা যায় না।
মেঘনাদ এসে খবর দেয়, বাবু ডেকেছে ঈশ্বর। ঈশ্বর বলে, আসছি।
বাবু জানে তোমোর ছেলেটা মারা গিয়েছে?
জানে, জানে। তোর ভাগ্যি ভালো, গিন্নিমার নজরে পড়েছিল। বাবু রেগে আগুন হয়ে গিয়েছিল, হয়তো বা তোকে পুলিশে দিত। গিনিমা বলল যে, উনিই তোকে দু-চারদিনের ছুটি দিয়েছেন–তাই বেঁচে গেলি। এ বেলাই যাস কিন্তু।
যাব।
ঘটনাচক্র আর কাকে বলে।
একটা বড়মিঞা বড়ই উৎপাত আরম্ভ করেছিল ওপারের বনের লাগাও গ্রামে মানুষখেকো মস্ত বড় বাঘ।
যে বাঘটার গর্জন শোনা যায় না। যে বাঘটা নীরবে বুদ্ধিমান শিকারির মতোই তাকে তাকে থেকে সুযোগ সুবিধামতো লাফিয়ে পড়ে কয়েকদিনের মধ্যে এগারটা মানুষ মেরেছে।
